ঢাকায় নিবন্ধিত ট্রাকের চেয়ে কম বাস

সাঈদ শিপন
সাঈদ শিপন সাঈদ শিপন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১:৫৬ এএম, ০৩ মার্চ ২০২১
ফাইল ছবি

ঢাকায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে নানা ধরনের পরিবহন। মহামারির মধ্যেও পরিবহন বাড়ার হার অব্যাহত রয়েছে। ২০২০ সালে এক লাখের ওপর পরিবহন যুক্ত হওয়ায় বর্তমানে ঢাকা শহরে লাইসেন্সধারী বিভিন্ন পরিবহনের সংখ্যা ১৬ লাখ ছাড়িয়েছে।

এতো বিপুলসংখ্যক পরিবহন চলাচল করলেও নিবন্ধিত বাসের সংখ্যা বেশ কম। ঢাকায় নিবন্ধিত যে পরিমাণ ট্রাক আছে, বাসের সংখ্যা তার অর্ধেকেরও কম। এমনকি নিবন্ধিত ট্রাক্টরের সংখ্যাও প্রায় বাসের সমান!

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালে ঢাকায় নিবন্ধিত বিভিন্ন পরিবহনের সংখ্যা ছিল পাঁচ লাখ ৭৫ হাজার ৫০১টি। ১০ বছরে এ সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বেড়ে হয়েছে ১৬ লাখ ৩০ হাজার ৩৬।

প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা শহরে বর্তমানে নিবন্ধিত বাস ৩৬ হাজার ১২৯টি। এর মধ্যে ২০২০ সালে নতুন যুক্ত হয়েছে এক হাজার ৭৯২টি। অপরদিকে ঢাকায় নিবন্ধিত ট্রাক ৭৩ হাজার ৬৭৮টি। এর মধ্যে ২০২০ সালে নতুন যুক্ত হয়েছে তিন হাজার ৩২৭টি। অর্থাৎ করোনার মধ্যেই বাসের দ্বিগুণ ট্রাক যুক্ত হয়েছে ঢাকায়। মোট সংখ্যার দিক থেকেও ঢাকায় বাসের দ্বিগুণের বেশি ট্রাক রয়েছে।

এছাড়া ঢাকায় নিবন্ধিত ট্রাক্টর আছে ৩২ হাজার ৪০৩টি। এর মধ্যে ২০২০ সালে নতুন যুক্ত হয়েছে দুই হাজার ৪৪৫টি। অর্থাৎ ২০২০ সালে ঢাকা শহরে বাস থেকে ট্রাক বেশি এসেছে।

এদিকে ঢাকায় সবচেয়ে বেশি চলাচল করছে মোটরসাইকেল। ২০১০ সালে ঢাকায় নিবন্ধিত মোটরসাইকেল ছিল দুই লাখ ১০ হাজার ৮৭৯টি। ১০ বছরের ব্যবধানে ২০২০ সাল শেষে সেই সংখ্যা প্রায় চার গুণ বেড়ে হয়েছে সাত লাখ ৯৫ হাজার ১৯৬টি। এর মধ্যে ২০২০ সালে নতুন যুক্ত হয়েছে ৭৮ হাজার ৫৫১টি।

পরিবহনের এই চিত্র সম্পর্কে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘পুরো পৃথিবী বাসকে গণপরিবহনের মেরুদণ্ড হিসেবে চিন্তা করে। সেজন্য রাস্তায় সবচেয়ে বেশি জায়গা বাসের জন্য রাখা হয়। কিন্তু আমাদের দেশের বাসগুলো চলে না, বসে থাকে। সঠিক পরিকল্পনার অভাবে বাসের প্রকৃত সেবা পাচ্ছে না জনগণ।’

তিনি বলেন, ‘ঢাকা শহরে পরিবহন ক্ষমতা বাসের নেই বললেই চলে। কারণ যানজটে সবচেয়ে বেশি নাকাল এ বাস। আমাদের সিস্টেমের মধ্যে বিরাট গলদ আছে। বাসকে গুরুত্ব দিয়ে যে ভাবনাটা করার কথা ছিল, সেই ভাবনার কোনো দর্শন আমি দেখি না।’

ড. শামসুল হক আরও বলেন, ‘বাসের সংখ্যা বেশি থাকতে হবে তা না। বাস কী পরিমাণে ট্রিপ দিতে পারছে সেটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি বাস সারাদিনে দুটি ট্রিপ দিলে যত বাস লাগবে, সেই বাস যদি দুটির বদলে ১০টি ট্রিপ দিতে পারে তাহলে পাঁচগুণ কম বাস লাগবে।’

এই পরিবহন বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘মানুষ এখন সময়কে গুরুত্ব দিচ্ছে। যে কারণে বাসের বদলে মোটরসাইকেল গুরুত্ব পাচ্ছে। ঢাকায় যে ১৬ লাখ পরিবহন রয়েছে, তার প্রায় ৬০ শতাংশ (অনিবন্ধিত ধরে) মোটরসাইকেল। পরিবহন ব্যবস্থাপনায় অনেক দেশ অনেক জায়গায় বাদ দেয়। কিন্তু যেভাবেই হোক এখন আমাদের এখানে পরিবহন ব্যবস্থায় মোটরসাইকেল ঢুকে গেছে। সামনে মোটরসাইকেলের সংখ্যা আরও বাড়বে।’

সব শ্রেণি মিলিয়ে ঢাকায় এক বছরে সবচেয়ে বেশি বৈধ পরিবহন যুক্ত হয়েছে ২০১৮ সালে। ওই বছর এক লাখ ৭১ হাজার ৩১২টি পরিবহন বিআরটিএ থেকে নিবন্ধন নেয়। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এক লাখ ৫৮ হাজার ৪০৭টি পরিবহন নিবন্ধন নেয় ২০১৯ সালে। তার আগে ২০১৭ সালে এক লাখ ৩৯ হাজার ৭১০টি পরিবহন বিআরটিএ থেকে নিবন্ধন নেয়।

মহামারির মধ্যে ২০২০ সালে বিআরটিএ থেকে নতুন নিবন্ধন নেয় এক লাখ ১৮ হাজার ২৫৪টি, যা এক বছরের হিসাবে চতুর্থ সর্বোচ্চ।

বিআরটিএ’র তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকায় যে কয়টি নিবন্ধিত পরিবহন আছে তার মধ্যে অ্যাম্বুলেন্স চার হাজার ৬১০টি। এর মধ্যে ৫৯৯টি ২০২০ সালে নতুন যুক্ত হয়েছে।

অটোরিকশা আছে ২০ হাজার ৫৫০টি। এর মধ্যে ২০২০ সালে নতুন যুক্ত হয়েছে ১১৪টি। অটো টেম্পো আছে এক হাজার ৪০৬টি। এর সবগুলো ২০১১ সালের আগে নিবন্ধিত।

নতুন একটি কার্গো ভ্যান যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে ঢাকায় এই পরিবহনের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে নয় হাজার ৬২টি। নিবন্ধিত কাভার্ড ভ্যান আছে ২৯ হাজার ৪১০টি। এর মধ্যে ২০২০ সালে নতুন যুক্ত হয়েছে এক হাজার ৬৮৮টি। ৯৬৭টি নতুন ডেলিভারি ভ্যান যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে ঢাকায় নিবন্ধিত এই পরিবহনের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৫২টি।

মোটরসাইকেলের পরই ঢাকা শহরে সবচেয়ে বেশি চলাচল করছে প্রাইভেটকার। ঢাকায় নিবন্ধিত প্রাইভেটকার আছে তিন লাখ ৪৬৪টি। এর মধ্যে করোনার বছর ২০২০ সালে নতুন যুক্ত হয়েছে ১১ হাজার ১৫০টি।

এরপরই রয়েছে পিকআপ। ঢাকায় নিবন্ধিত এই পরিবহনের সংখ্যা ৯৫ হাজার ৫৮৩টি। চতুর্থ স্থানে থাকা নিবন্ধিত মাইক্রোবাসের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮০ হাজার ১০৬টি। এর মধ্যে ২০২০ সালে যুক্ত হয়েছে দুই হাজার ৪০৭টি।

বিআরটিএ’র তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় নিবন্ধিত জিপ আছে ৪৯ হাজার ৮৫৭টি। এর মধ্যে ২০২০ সালে যুক্ত হয়েছে চার হাজার ৪৫০টি। ২০২০ সালে ১৩৩টি নতুন যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে মিনি বাসের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে নয় হাজার ৬৭০টি।

এছাড়া নিবন্ধিত হিউম্যান হলার চার হাজার ৭৫২টি, বিশেষ কাজে ব্যবহৃত পরিবহন দুই হাজার ৩১৭টি, ট্যাংকার দুই হাজার ৫৩৬টি, ট্যাক্সিক্যাব ৩২ হাজার ৪০৩টি এবং অন্যান্য পরিবহন ২৮ হাজার ১১৯টি।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঢাকায় পরিবহনের সংখ্যা বাড়লেও বাসের সংখ্যা বাড়ছে না। পরিবহনের যে সংখ্যা বাড়ছে তার বেশিরভাগই ব্যক্তিগত গাড়ি। ফলে সাধারণ যাত্রীরা সুফল পাচ্ছেন না। আমাদের দাবি ব্যক্তিগত গাড়ি কমিয়ে ঢাকায় বাসের সেবা বাড়ার উদ্যোগ নেয়া উচিত।’

এমএএস/জেডএইচ/এসএইচএস/এইচএ/জেআইএম

যানজটে সবচেয়ে বেশি নাকাল এ বাস। আমাদের সিস্টেমের মধ্যে বিরাট গলদ আছে। বাসকে গুরুত্ব দিয়ে যে ভাবনাটা করার কথা ছিল, সেই ভাবনার কোনো দর্শন আমি দেখি না

ঢাকায় পরিবহনের সংখ্যা বাড়লেও বাসের সংখ্যা বাড়ছে না। পরিবহনের যে সংখ্যা বাড়ছে তার বেশিরভাগই ব্যক্তিগত গাড়ি। ফলে সাধারণ যাত্রীরা সুফল পাচ্ছেন না

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]