দিনে নৌকা-ট্রলারে শীতলক্ষ্যা পাড়ি দেয় লাখো মানুষ
রপ্তানি শিল্পে পাট যখন বাংলাদেশের প্রধানতম পণ্য, তখন নারায়ণগঞ্জ ‘প্রাচ্যের ডান্ডি’ নামে খ্যাত ছিল। সময়ের বিবর্তনে ঢাকার নিকটবর্তী এই জেলা বর্তমানে নিট গার্মেন্টস ও হোসিয়ারি শিল্পের জন্য সুপরিচিত। অর্থনীতির বাঁকবদলে নারায়ণগঞ্জের অর্থনৈতিক পরিচয় বদলালেও যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি ক্ষেত্রে আগের অবস্থানেই রয়ে গেছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলার গুরুত্বপূর্ণ একটি উপজেলা বন্দর। এই উপজেলার বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডও পড়েছে সিটি করপোরেশনের ভেতরে। সিটি করপোরেশনের ভেতরে হলেও বন্দর উপজেলার বাসিন্দাদের নারায়ণগঞ্জ শহরে যেতে এখনো নৌকা বা ট্রলারে চেপে শীতলক্ষ্যা নদী পাড়ি দিতে হয়। প্রতিদিন প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ নৌকা অথবা ট্রলারে চেপে শীতলক্ষ্যা পাড়ি দেন।

নারায়ণগঞ্জের বন্দর অঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি মিনিটেই নৌকা অথবা ট্রলারে শীতলক্ষ্যা পাড়ি দিতে মানুষের এক প্রকার স্রোত নামে। একটির পর একটি ট্রলার ঘাটে ভিড়ে যাত্রী খালি না করতেই আবার পূর্ণ হয়ে যায়। ফলে এক মিনিটের জন্যও বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ পাননা ট্রলারকর্মীরা। একই অবস্থা বেশিরভাগ নৌকার মাঝির। এক পাড় থেকে যাত্রী এনে নামাতে না নামেই তারা অপর পাড়ে যাওয়ার যাত্রী পেয়ে যান।
ট্রলারে দু-এক মিনিটের মধ্যে পাড়ি দেওয়া যায় শীতলক্ষ্যা। আর নৌকায় শীতলক্ষ্যা পাড়ি দিতে সময় লাগে তিন-চার মিনিট। ট্রলারে যেতে যাত্রীদের ভাড়া গুনতে হয় দুই টাকা করে। আর নৌকায় জনপ্রতি ভাড়া নেওয়া হয় পাঁচ টাকা। তবে রিজার্ভ গেলে নৌকার ভাড়া দিতে হয় ৪০ টাকা। দরদাম করে ক্ষেত্রবিশেষে কিছু কম ভাড়ায়ও যাওয়া যায়।

একযুগের বেশি সময় ধরে শীতলক্ষ্যায় নৌকায় যাত্রী পারাপার করেন মো. লিয়াকত মাঝি। তিনি বলেন, আমার মতো এখানে ৪০০ জনের মতো মাঝি আছে। নৌকা আছে তিনশোর মতো। এখানে নৌকা চালিয়ে ছেলেমেয়ে বড় করেছি। দুই ছেলে বিয়ে দিয়েছি আগেই। বছরখানেক আগে মেয়ে বিয়ে দিয়েছি। বিয়ে দেওয়ার আগে মেয়েকে বিএ পাস করিয়েছি। এখন আর আগের মতো নৌকায় ভাড়া মারতে পারি না।
তিনি বলেন, আগে নৌকার ভাড়া ছিল দুই টাকা। এখন ভাড়া বেড়ে পাঁচ টাকা হয়েছে। কিন্তু আগের থেকে এখন আয় কম হয়। দিনে একজন মাঝি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করতে পারেন। ট্রলারের কারণে এখন নৌকার ভাড়া কম হয়। এখান দিয়ে প্রতিদিন সাড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ মানুষ শীতলক্ষ্যা পাড়ি দেয়। এর মধ্যে নৌকায় যাওয়া-আসা করে ৭০ থেকে ৮০ হাজার। বাকি সাড়ে তিন-চার লাখ যাতায়াত করে ট্রলারে।

এখানে নৌকা চলাতে কোনো অর্থ দেওয়া লাগে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, নৌকার ঘাট আমরা নিজেদের পকেটের টাকা দিয়ে বানাই। কাঠ, বাঁশ যা লাগে আমরা কিনে আনি এবং নিজেরাই ঘাট মেরামত করি। এ জন্য ঘাটে আমাদের কোনো টাকা দেওয়া লাগে না। এখানে যারা মাঝি আছেন তাদের মধ্যে অল্প কয়েকজনের নিজস্ব নৌকা আছে। বেশিরভাগ ভাড়া করা নৌকা চালান। ভাড়ায় চালানো মাঝিদের প্রতিদিন ১২০ টাকা করে মালিককে দিতে হয়। সে ক্ষেত্রে সারাদিন নৌকা চালিয়ে বেশিরভাগ মাঝির পকেটে চারশো টাকার বেশি থাকে না।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা হামেদুল হাসান বলেন, আমি কাপড়ের ব্যবসা করি। ব্যবসার কাজে প্রতিদিন নারায়ণগঞ্জ শহরে যেতে হয়। নৌকা বা ট্রলারে যাওয়া ছাড়া আমাদের উপায় নেই। আমার মতো লাখ লাখ মানুষ প্রতিদিন এভাবে যাতায়াত করে। আমাদের হিসাবে প্রতিদিন নৌকা ও ট্রলারে যাওয়া-আসা করা মানুষের সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ হবে। এভাবে নৌকা, ট্রলারে যাতায়াত করা ঝুঁকিপূর্ণ। যদি এখানে একটা ব্রিজ থাকতো তাহলে আমাদের জন্য অনেক সুবিধা হতো। শুধু বন্দর থানার বাসিন্দা না, এখান দিয়ে মেঘনার মানুষও যাতায়াত করে।
ট্রলারে শীতলক্ষ্যা পাড়ি দেওয়ার সময় কথা হয় মাজহারুল ইসলাম নামে একজনের সঙ্গে। তিনি বলেন, নৌকা বা ট্রলারে শীতলক্ষ্যা পাড়ি দেওয়া আমাদের কাছে স্বাভাবিক ঘটনা। আমরা প্রতিদিন এভাবেই যাতায়াত করি। নারায়ণগঞ্জ মূল শহরের অনেকের ব্যবসা আছে বন্দর থানার ভেতরে। আবার বন্দর অঞ্চলের অনেকে নারায়ণগঞ্জ শহরে গিয়ে ব্যবসা করে। প্রয়োজনের তাগিদেই প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ নৌকা বা ট্রলারে শীতলক্ষ্যা পাড়ি দেয়।
এমএএস/বিএ/এমএস