দেড় যুগেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই ধীরাশ্রমে আইসিডি নির্মাণ প্রকল্পে

সিরাজুজ্জামান
সিরাজুজ্জামান সিরাজুজ্জামান , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:২১ পিএম, ১৪ এপ্রিল ২০২২
কমলাপুর আইসিডিতে কনটেইনার হ্যান্ডলিং

গাজীপুরের ধীরাশ্রম রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন নতুন রেল ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপো (আইসিডি) নির্মাণে প্রায় দেড় যুগ আগে প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নিলেও কোনো অগ্রগতি নেই। মূলত, রাজধানী ঢাকার যানজট কমানো, বিপুল পরিমাণ কনটেইনার হ্যান্ডলিং এবং সারাদেশে পণ্য পরিবহন আরও সহজ করার লক্ষ্যে ঢাকার কমলাপুর থেকে ধীরাশ্রমে আইসিডি স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর থেকে আসা কনটেইনারসমূহ সংরক্ষণসহ পুরো দেশে রেলের মাধ্যমে কনটেইনার ভর্তি পণ্য পরিবহন সুবিধার জন্য প্রায় ১৬০ একর ভূমির ওপর এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয় ৩ হাজার ৭৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা।

বর্তমানে ঢাকার অদূরে গাজীপুরের আট শতাধিক পোশাক কারখানার তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য শিল্পপণ্য সড়কপথে পরিবহন হচ্ছে। সড়কের ওপর বাড়তি চাপ কমিয়ে রেলপথের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন সহজীকরণের লক্ষ্যেই চট্টগ্রাম বন্দর কতৃর্পক্ষের প্রস্তাবনা অনুযায়ী ২০০৩ সালে ধীরাশ্রমে নতুন আইসিডির পরিকল্পনা। কিন্তু দীর্ঘদিনেও প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় বিশেষত রপ্তানিকারকদের যেমন ব্যয় বাড়ছে, একইসঙ্গে সড়কপথসহ চাপ বাড়ছে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের ওপরও।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রথমে চীন আগ্রহ দেখালেও পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণের কারণে দেশটি পরবর্তী সময়ে সেদিকে আর চোখ রাখেনি। জাপান সরকারেরও ছিল অনাগ্রহ। এখন এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) আগ্রহ দেখাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ প্রকল্পের কাজ মাঠ পর্যায়ে শুরু করতে আরও অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে।

সম্প্রতি সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. গোলাম মোস্তফা স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে আইসিডি প্রকল্প সংক্রান্ত সর্বশেষ তথ্য তুলে ধরা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী (চট্টগ্রাম-৬) জাগো নিউজকে বলেন, সংসদীয় কমিটিতে এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন উপস্থান করা হয়েছে। কিন্তু আইসিডি নির্মাণ প্রকল্পের তেমন অগ্রগতি নেই। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে এটি দ্রুত শুরু করতে হবে। তাহলে দেশের পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে নতুন দিগন্তের সূচনা হবে।

দেড় যুগেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই ধীরাশ্রমে আইসিডি নির্মাণ প্রকল্পে

সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ধীরাশ্রম আইসিডি নির্মাণে জমি অধিগ্রহণ কাজ ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে প্রণীত ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজালের (ডিপিপি) ওপর গত বছরের ২৬ জুন প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। পিইসি সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ডিপিপি পুনর্গঠন করে চলতি বছেরর ৭ ফেব্রুয়ারিতে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ধীরাশ্রম আইসিডি নির্মাণে জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত এ প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী ১৬৮.২১ একর জমি অধিগ্রহণ, পুবাইল টেক অফ পয়েন্ট হতে ধীরাশ্রম পর্যন্ত লিংক রেলপথ নির্মাণের জন্য ৫৪.৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ, পুবাইল টেক অফ পয়েন্ট হতে ধীরাশ্রম পর্যন্ত ৬.০৯ কিলোমিটার রেলপথ সম্পূর্ণ নতুন নির্মাণ, ৫.৩২ কিলোমিটার লুপ এবং সাইডিং, তিনটি কালভার্ট ও একটি সেতু, দুটি বি শ্রেণির এবং পাঁচটি সি শ্রেণির লেভেল ক্রসিং গেট নির্মাণ করা হবে। এছাড়াও প্রয়োজনীয় সিংগন্যালিং-এর কাজসহ অন্যান্য কাজ সম্পাদিত হবে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রকল্পটির আওতায় আইসিডির ভেতরে ব্যালাস্টলেস রেলপথ নির্মাণ, আইসিডির প্রয়োজনীয় অপারেশন ভবন নির্মাণ এবং পূর্ত কাজসহ অন্যান্য কাজ সম্পাদন হবে। প্রকল্পের ব্যয় হবে ৩ হাজার ৭৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা।

পদ্মা সেতুতে রেললাইন স্থাপনের ফলে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর থেকে দেশের উত্তরাঞ্চলে কনটেইনার পরিবহনে আর ঢাকার বুক চিরে যেতে হবে না। এমনকি ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে ট্রানজিট চালু হলে সেসব দেশ থেকে আসা কনটেইনার ধীরাশ্রম আইসিডিতে রাখা যাবে। ডেমরা-জয়দেবপুর ইস্টার্ন বাইপাস ও ধীরাশ্রম রেল স্টেশনের নিকটবর্তী ১০০ একর জমি নিয়ে ধীরাশ্রম আইসিডি নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ধীরাশ্রম আইসিডি ঢাকা-চট্টগ্রাম সেকশনের পূবাইল রেলস্টেশন থেকে রেল লিংকের মাধ্যমে সংযুক্ত হবে। এটি নির্মিত হলে বছরে প্রায় ৩ লাখ ৬৮ হাজার কনটেইনার হ্যান্ডলিং সম্ভব হবে। কমলাপুর রেল স্টেশনের আইসিডিতে বছরে হ্যান্ডলিং হয় মাত্র ৯০ হাজার কনটেইনার।

ধীরাশ্রম আইসিডি নির্মাণ প্রকল্পটি চীন ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে “Strengthening Investment and Production Capacity Cooperation” বিষয়ক সমঝোতা স্মারকের রেলওয়ে সংক্রান্ত পাঁচটি প্রকল্পের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। সমঝোতা স্মারকটি বাংলাদেশ ও চীন উভয় দেশের সরকারপ্রধানদের উপস্থিতিতে চীনা বাণিজ্যমন্ত্রী ও বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর স্বাক্ষরিত হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য চীন সরকারের অর্থায়ন প্রাপ্তির লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ২০২০ সালের ৮ জুন রেলপথ মন্ত্রণালয় কর্তৃক অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে অনুরোধ করা হয়।

দেড় যুগেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই ধীরাশ্রমে আইসিডি নির্মাণ প্রকল্পে

এ প্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে ২০২০ সালের ১৭ জুন এক চিঠি মারফত জানানো হয়, প্রকল্পটি জি টু জি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির নীতিগত অনুমোদন প্রয়োজন। পরবর্তীকালে প্রকল্পটি চীনা অর্থায়নে জি টু জি ভিত্তিতে বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প ছাড়া জি টু জি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত প্রকল্পসমূহে অর্থায়নের বিষয়ে চীন সরকারের পক্ষ থেকে অনাগ্রহই লক্ষ্য করা গেছে।

ধীরাশ্রম আইসিডি নির্মাণ প্রকল্পটি পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) পদ্ধতিতে জি টু জি চুক্তিতে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাপান সরকারকে ২০১৮ সালে অনুরোধ করা হয়। ওই বছরের ৭ জুন জাপানে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় প্ল্যাটফরম সভায় এ প্রকল্প বাস্তবায়নের জাপানি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সোজিট করপোরেশনকে (Sojitz Corporation) চূড়ান্ত করা হয়। পরবর্তীকালে জাপানের ভূমি, অবকাঠামো, পরিবহন এবং পর্যটন মন্ত্রণালয় ২০১৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর এক চিঠিতে জি টু জি প্লাটফর্ম হতে ধীরাশ্রম আইসিডি নির্মাণ প্রকল্প প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের কথা জানায়।

গত বছরের ৭ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে, ধীরাশ্রম রেল আন্তর্দেশীয় কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) ও অন্যান্য কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ এবং এগুলোর সঙ্গে অটোমেশনের মাধ্যমে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপনসহ বন্দর সুবিধা উন্নীতকরণ বিষয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ড, দুবাইয়ের কাছ থেকে বিস্তারিত কারিগরি ও অর্থনৈতিক প্রস্তাব গ্রহণ করা যেতে পারে। এ লক্ষ্যে ওই বছরের ৬ মে রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে পিপিপি কর্তৃপক্ষ বরাবর অনুরোধ চিঠি পাঠানো হয়। গত ৩০ ডিসেম্বর ডিপি ওয়ার্ল্ড, দুবাইয়ের পক্ষ থেকে প্রাথমিক কারিগরি প্রস্তাব দাখিল হলেও অর্থনৈতিক কোনো প্রস্তাব আসেনি। ডিপি ওয়ার্ল্ড-এর কারিগরি প্রস্তাবের ওপর বাংলাদেশ রেলওয়ের মতামত পিপিপি কর্তৃপক্ষ বরাবর পাঠাতে অনুরোধ করে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়।

দেড় যুগেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই ধীরাশ্রমে আইসিডি নির্মাণ প্রকল্পে

এডিবির অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল প্রকল্প সুবিধার জন্য কারিগরি সহায়তা’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ধীরাশ্রম আইসিডি নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং বিস্তারিত খসড়া নকশা প্রণয়ন শেষ হয়েছে। এডিবি ধীরাশ্রম প্রকল্পে অর্থায়নে আগ্রহ প্রকাশ করে এর প্রাথমিক নথিও প্রস্তুত করছে। সংস্থাটির অর্থায়নের জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ে থেকে পাঠানো পিডিপিপি রেলপথ মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন।

এ বিষয়ে রেলমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন জাগো নিউজকে জানান, সর্বশেষ কোনো তথ্য তার হাতে নেই। আপডেট জানতে প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ মন্ত্রীর।

প্রকল্প পরিচালক মো. গোলাম মোস্তফা বুধবার (১৩ এপ্রিল) জাগো নিউজকে বলেন, ধীরাশ্রমে আইসিডি প্রকল্প বাস্তবায়নে চীন এবং পরে জাপানের অর্থায়নের কথা ছিল। কিন্তু তারা তা করেনি। ফলে প্রকল্পটি গতি হারায়। এখন এডিবি আগ্রহ দেখানোয় তাদের সঙ্গে কথাবার্তা চলছে। সবকিছু চূড়ান্ত হলে ডিপিপি করা হবে। পরবর্তী সময়ে দরপত্র আহ্বানের মধ্য দিয়ে শুরু হবে কাজ। তবে মাঠ পর্যায়ে এ প্রকল্পের কাজ শুরু করতে কমপক্ষে আরও দুই বছর লাগবে। এখন কমলাপুর আইসিডিতে গার্মেন্টস পণ্যের চাপ অনেক বেশি। এটি ধীরাশ্রমে স্থানান্তর হলে দেশের অভ্যন্তরে পণ্য পরিবহন যেমন সহজ হবে, গতি ফিরবে আমদানি-রপ্তানিতেও।

এইচএস/এমকেআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।