রাজনীতিতে আঘাত ও ক্ষত তো সঙ্গী: রুমিন ফারহানা

সালাহ উদ্দিন জসিম
সালাহ উদ্দিন জসিম সালাহ উদ্দিন জসিম , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:১৮ এএম, ০৮ মে ২০২২

রুমিন ফারহানা। পেশায় আইনজীবী। আলোচিত রাজনীতিক। বাবা ভাষাসংগ্রামী অলি আহাদ রাজনীতিক হলেও মা রাশিদা বেগম পেশায় ছিলেন শিক্ষক। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান রুমিন ফারহানা রাজধানীর হলিক্রস স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিভাগে স্নাতক সম্পন্ন করেন। ব্যারিস্টারি ডিগ্রি অর্জন করেন যুক্তরাজ্যের লিংকনস্ ইন থেকে।

ছাত্রজীবনে অত্যন্ত নিরাপদ ও আদুরে পরিবেশে বড় হলেও পেশাগত জীবনে জড়িয়েছেন রাজনীতিতে। তাও আবার বাবার রাজনৈতিক আদর্শের বিরোধী শিবিরে। রুমিন ফারহানার রাজনীতিতে জড়ানো, ভবিষ্যৎ স্বপ্ন ও বিএনপিকে নিয়ে তার ভাবনা, জাগো নিউজের সঙ্গে একান্ত আলাপে উঠে এসেছে। খোলামেলাভাবেই বলেছেন, তার বাবার ও তার জীবনে আওয়ামী লীগের দেওয়া আঘাত এবং ক্ষত চিহ্নের কথা। পাশাপাশি বিএনপির কাছে টেনে নেওয়ার গল্প।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সালাহ উদ্দিন জসিম। সঙ্গে ছিলেন ফটোসাংবাদিক বিপ্লব দিক্ষিত

জাগো নিউজ: আপনি একজন রাজনীতিবিদ। আপনার বাবাও রাজনীতি করেছেন। তিনি রাজনীতি করেছেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে, ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাংগঠনিক সম্পাদক। অথচ তার একমাত্র সন্তান হয়ে আপনি রাজনীতি করছেন বিএনপির সঙ্গে। কারণ কী?

রুমিন ফারহানা: ওনার রক্তের উত্তরাধিকারী আমি নিশ্চয়ই। কিন্তু ওনার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী না। কারণ, উনি যে দল করেছেন ডেমোক্রেটিক লীগ, আমি সেটায় যুক্ত নই। আমাকে রাজনীতি শুরু করতে হয়েছে একেবারেই শূন্য থেকে। নিজের পরিশ্রম, যোগ্যতা, মেধা ও সততা দিয়ে আজকের এই অবস্থানে আসতে হয়েছে। কেউ আমার পথ তৈরি করে দেয়নি। আমার সংসদীয় আসন কিন্তু আমার বাবা গুছিয়ে যাননি, বাকি ৮-১০ জন যে সুবিধাটা পান, আমি মাঠে-পথে হেঁটে হেঁটে আমার আসন গোছাচ্ছি ।

জাগো নিউজ: বাবার তৈরি করা রাজনৈতিক পথে হাঁটলে তো আরও ভালো করার সুযোগ ছিল। সে পথে না গিয়ে নতুন করে রাস্তা তৈরির চিন্তা এলো কেন? আপনার কাছে কেন মনে হলো বিএনপির রাজনীতিই অপেক্ষাকৃত ভালো?

রুমিন ফারহানা: আমার কাছে মনে হয়েছে, চরিত্রগতভাবে আওয়ামী লীগ ভীষণ রকম ফ্যাসিস্ট একটা দল। দেখেন, ইয়াহিয়া ’৭০ সালে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন দিয়েছে, কিন্তু আওয়ামী লীগ ’৭৩ সালে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে পারেনি। তখন আমার বাবা তৎকালীন বিজয়নগর-সরাইল-আশুগঞ্জ-নাসিরনগর আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে জিতেছিলেন। বেসরকারিভাবে তাকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। পরের দিন আওয়ামী লীগের প্রার্থী তাহের উদ্দিন ঠাকুরকে সরকারিভাবে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। এটা আমার বাবার বিরাট একটা ক্ষতের জায়গা ছিল। উনি ভীষণ আঘাত পেয়েছিলেন। রাজনীতিতে আঘাত ও ক্ষত তো সঙ্গী। কিন্তু এই আঘাতটা ওনার মৃত্যু পর্যন্ত ছিল। এটা আমাকেও ভীষণভাবে আঘাত দেয় যে, একটা দল- অল্প কিছু আসনে স্বতন্ত্র, জাসদ ও ন্যাপের প্রার্থী জিতেছে, সেটাও মানতে পারেনি। অন্যদিকে আমি দেখেছি বিএনপি পরমসহিষ্ণু। বহুত্ববাদী একটি দল। এই দল গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে, মানুষের বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। মানুষের চিন্তা-মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে এবং বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করে। সংবাদপত্রগুলো প্রাণ ফিরে পায়। বাংলাদেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বিএনপির হাত ধরে। আজকের যে অর্থনীতির মূল ভিত্তি কৃষি, পরবাসী শ্রমিক, গার্মেন্টস শিল্প- সবই হয়েছে বিএনপির হাত ধরে। আমি মনে করি, বাংলাদেশের মানুষের মুক্তি বারবার বিএনপির হাত ধরে হয়েছে। আমার মনে হয়েছে- এই দলটিতে গিয়ে আমি স্বাধীন মত প্রকাশ করতে পারবো, এখানে গণতান্ত্রিক একটা আবহাওয়া আছে, সেখানে আমি মর্যাদা নিয়ে কাজ করতে পারবো।

জাগো নিউজ: আপনার বাবার যে ক্ষত, সেটা তো দেখেননি আপনি। গল্প শুনেছেন। সে দলে আপনি কোনো দিন না গিয়ে, ওই সংগঠন না করে, হুট করে সে দলের বিরোধিতা করাটা কেমন হলো?

রুমিন ফারহানা: আওয়ামী লীগ যারা প্রতিষ্ঠা করেছেন, তারা কেউই আওয়ামী লীগ করতে পারেননি। ভাসানী থেকে শুরু করে আমার বাবা অলি আহাদ পর্যন্ত। যারা আওয়ামী লীগ করেছেন, তারাও কেউ সম্মান নিয়ে যেতে পারেননি। তাদের স্মরণও করা হয় না। আমার কাছে মনে হয় অত্যন্ত কট্টর মানুষের সমাহার, সেখানে কাজ করা যাবে বলে আমি মনে করি না। দলটির মধ্যে তারা যতই গণতন্ত্রের কথা বলুক বা ভোট ও ভাতের অধিকারের কথা বলুক, মুখে তারা যতই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের কথা বলুক, বাংলাদেশে গণতন্ত্র যতবার হত্যা করা হয়েছে, মানুষের ভোটের অধিকার যতবার কেড়ে নেওয়া হয়েছে, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যতবার নষ্ট করা হয়েছে, তার সবই আওয়ামী লীগের আমলে হয়েছে।

জাগো নিউজ: আপনি তো পরিণত বা পরিপক্ব হয়ে রাজনীতিতে এসেছেন। এই সময়ে কে আপনাকে পথ তৈরি করে দিলো। কাকে দেখে এই রাজনীতিতে গেলেন? কে ছিল আপনার রাজনীতির পথপদর্শক?

রুমিন ফারহানা: আমার নেত্রী দেশনেত্রী খালেদা জিয়া। ওনার স্নেহ এবং উনি আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছেন, অল্প বয়সে আমার ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রেখেছেন, সেটাই আমার চলার একটা বিরাট শক্তি। এর বাইরে আমি ভীষণ রকম নিয়তি ও আল্লায় বিশ্বাস রাখি, সেটা আমাকে বিরাট শক্তি দেয়।

rumi1

জাগো নিউজ: কারও না কারও হাত ধরে তো রাজনীতিতে জড়িয়েছেন, সে লোকটি কে? ওই গল্পটা কী?

রুমিন ফারহানা: খালেদা জিয়ার হাত ধরেই আমার রাজনীতিতে আসা। তিনিই আমাকে রাজনীতিতে টেনে নিয়েছেন। মজাটা এখানেই। ২০১২ সালে আব্বা মারা যাওয়ার আগে ম্যাডাম আমাদের বাসায় এসেছিলেন। ম্যাডামের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, পরিচয় হয়েছে। তারপর ২০১২ সালে আব্বা যখন মারা গেলেন, তখনও উনি হাসপাতালে দৌড়ে এসেছিলেন। এ বিষয়গুলো আমার মনে বিরাট রেখাপাত করে। তার পরপরই আমি বিএনপির অফিস থেকে ফোন পাই যে, দলটির আন্তর্জাতিক কমিটিতে আমাকে সদস্য করা হয়েছে। সে কমিটিতে গিয়ে আমি বোকা হয়ে যাই। দেখি সবাই আমার বাবার বন্ধু। উসমান ফারুক, এনাম আহমেদ চৌধুরী, রিয়াজ রহমান, সাবিহ উদ্দিন আহমেদ। প্রথম দিন মিটিংয়ে গিয়ে রুমে ঢুকে আমি ভেবেছিলাম আমি ভুল ঘরে এসেছি। বের হয়ে যাচ্ছিলাম। তখন আমাকে বলা হয়, আমাকে এই কমিটির সদস্য করা হয়েছে। তখন আমি অবাক হয়েছি, ম্যাডাম এই বিশ্বাসটা আমার ওপর রেখেছেন। ২০১৩ সালে যখন আমি বিএনপির কোনো কমিটিতে নেই, তখন তিনি আমাকে চায়না সফরে পাঠিয়েছিলেন। দেখা গেছে বিএনপির মধ্যমসারীর যারা নেতা, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, ডা. শাহাদাত, ব্যারিস্টার অসীম ভাই এদের সঙ্গে ডেলিগেট করে ম্যাডাম আমায় পাঠিয়েছেন। ম্যাডাম আমার ওপর আস্থা রেখেছেন ভীষণরকম। কোনো কিছু না জেনেই আস্থা রেখেছেন, আমি তার মর্যাদা দেওয়ার চেষ্টা করেছি।

জাগো নিউজ: আপনার রাজনৈতিক স্বপ্ন কী?

রুমিন ফারহানা: আমি একটা অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি। আমি এমন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, যেখানে মানুষের ভোটের জন্য মল্লযুদ্ধে নামতে হবে না, রক্তপাত হবে না। যার যার মত স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারবে। সেজন্য তাকে পুলিশ দিয়ে গুম করে নিয়ে তার ওপর নির্যাতন করা হবে না। আমি এমন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, যে বাংলাদেশ হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের বাংলাদেশ। যেখানে সব মানুষ সমান অধিকার ভোগ করবে এবং মানুষ হিসেবে তার যেটুকু মর্যাদা পাবে; ধর্ম-বর্ণ, জাতি-গোত্র নির্বিশেষে। সেই বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, যেখানে নারী-পুরুষের ভেদ থাকবে না। নারীরা তার যোগ্যতা বলে এগিয়ে আসতে পারবে।

জাগো নিউজ: আপনার স্বপ্নের এই বাংলাদেশ কাদের নেতৃত্বে হবে?

রুমিন ফারহানা: সেটা মানুষ ঠিক করবে। সেই সুযোগটাও যেন মানুষ পায়, তার নেতৃত্ব ঠিক করার।

জাগো নিউজ: আপনি যাদের নেতা মানেন বা যাদের নেতৃত্বে রাজনীতি করেন, তারা তো এরই মধ্যে আদালতের রায়ে অপরাধী। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে সাজার রায় হয়ে গেছে। আপনি কি মনে করেন, এই অপরাধীদের নেতৃত্বে আপনার এই স্বপ্নের বাংলাদেশ গঠন সম্ভব?

রুমিন ফারহানা: বাংলাদেশের রাজনীতিতে মামলা নতুন বিষয় নয়। রাজনৈতিক মামলা আরও পুরাতন বিষয়। আমরা তো শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধেও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দেখেছি। রাজনীতিবিদদের জন্য মামলা নতুন কিছু নয়। এগুলো একেবারেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। যে মামলায় তাকে (খালেদা জিয়া) সাজা দেওয়া হয়েছে, সেখানে টাকা দুই কোটি থেকে বেড়ে ছয় কোটি হয়েছে, টাকা ব্যাংকে আছে। একটা টাকাও তছরুফ করা হয়নি। বাংলাদেশে সত্যিকারার্থে গণমানুষের নেতা যদি কাউকে বলেন, সেটা দেশনেত্রী খালেদা জিয়া। জিয়া পরিবারের হাত ধরে বাংলাদেশের মানুষ বারবার মুক্তির স্বাদ পেয়েছে, এটা অস্বীকার করলে হবে না। এই যে রাজনৈতিক মামলা, যদি আজ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা থাকতো, যদি বিচার বিভাগ সত্যিকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারতো, তাহলে এই মামলা একদিনও টেকার কথা নয়। একজন আইনজীবী হিসেবে আমি বুঝি, এই মামলা টেকার মামলা নয়। তারপরও আমরা দেখছি, এই মামলায় একজন ৭৪ বছর বয়সী অসুস্থ নারী, যিনি বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনবার, তাকেও কারাবরণ করতে হয়েছে। সুতরাং এসব রাজনৈতিক অত্যাচার কালো কালিতে লেখা থাকবে বাংলাদেশের ইতিহাসে।

জাগো নিউজ: আপনি যে দলে রাজনীতি করেন, গত ১৫ বছর ক্ষমতার বাইরে। এই নেতৃত্ব এতদিনে সরকারি দল আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারেনি। আপনি কি মনে করেন এই নেতৃত্ব আর পারবে?

রুমিন ফারহানা: এই নেতৃত্ব পারবে, এটা এরই মধ্যে প্রমাণ হয়ে গেছে। কীভাবে? আমরা কিন্তু কোনো গেরিলা পার্টি না। আমরা কোনো আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টি না বা আমরা সশস্ত্র দলও না যে, আমরা একটা গৃহযুদ্ধ দিয়ে এই দলের হাত থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করবো। কারণ একটা গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইটা যত সহজ, একটা অগণতান্ত্রিক সরকারে বিরুদ্ধে লড়াই অতটা সহজ নয়। গণতান্ত্রিক সরকার যাচ্ছেতাই করতে পারে না, তাদের জনগণের কাছে জবাব দিতে হয়, জনগণকে হিসাব দিতে হয়। কিন্তু অগণতান্ত্রিক সরকার- প্রশাসন পুলিশ বা অন্যান্য বাহিনীকে ব্যবহার করে বিরোধী দলের ওপর যে দমনপীড়ন চালায়। তাতে বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা হয়। সেটা একটা গণতান্ত্রিক সরকারের বেলায় হয় না। একটা অগণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে কিন্তু আমরা ১৫ বছর শক্তভাবে টিকে আছি। আমাদের কর্মসূচিতে যতদূর দেখা যায়- মানুষ আর মানুষ, জনসমুদ্র। এখানে মামলা খাওয়ার ভয় আছে, গ্রেফতার হওয়ার ভয় আছে, গুম হওয়ার ভয় আছে, উঠিয়ে নিয়ে মেরে ফেলার ভয় আছে। তারপরও তো কেউ একটুও পিছিয়ে নেই। মানুষ কীভাবে আমাদের পেছনে আসে, এটা তো আমার নিজের চোখে দেখা। সুতরাং বাংলাদেশে গণমানুষের দল বলতে বিএনপিই। এর কোনো বিকল্প নেই।

জাগো নিউজ: বিএনপি তো নির্বাচনেই যায় না, ক্ষমতায় যাবে কী করে?

রুমিন ফারহানা: বিএনপি নির্বাচনে যায় না, কথাটা ঠিক নয়। ২০১৮ সালে কিন্তু বিএনপি নির্বাচন করেছে। আপনারা দেখেছেন, কীভাবে দিনের ভোট রাতে হয়। ফলে আমরা একটা কথা পরিষ্কার বলে দিয়েছি, দলীয় সরকারের অধীনে আমরা আর কোনো নির্বাচনে যাবো না। ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন আওয়ামী লীগ বর্জন করেছিল, সেসময় বিএনপি বলেছিল- ‘এটি একটি নিয়ম রক্ষার নির্বাচন আমরা অচিরেই আরেকটি নির্বাচন দেবো।’ বিএনপি তার ওয়াদা রেখেছিল। একই ওয়াদা আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালে করেছে, সেই ওয়াদা আওয়ামী লীগ রাখেনি। এখানেই বিএনপি ও আওয়ামী লীগের পার্থক্য।

জাগো নিউজ: সামনে তো দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে মনে হচ্ছে, কী করবেন আপনারা?

রুমিন ফারহানা: সময় এলে মানুষের জোয়ারে এমনিতেই ভেঙে যাবে বাঁধ। ওটা দিনক্ষণ দিয়ে তো আর হবে না। আরও তো দু’বছর বাকি। দেখা যাক, কী হয়? আমরা এখনই কেন স্থির করছি, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে?

জাগো নিউজ: আপনি তো এলাকায় কাজ করছেন, আপনি কি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন?

রুমিন ফারহানা: নিশ্চয়ই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমি ২০২৪ এ নির্বাচন করবো, এই লক্ষ্য নিয়েই এগোচ্ছি।

জাগো নিউজ: রাজনীতিবিদরা তো দূর থেকেই রাজনীতির পথ দেখেন। আপনার কি মনে হয়, আপনারা যেটা চাইছেন, সেটা তৈরি হবে? বা কোনো লক্ষণ দেখেন?

রুমিন ফারহানা: পথ তো নিজে থেকে তৈরি হয় না, তৈরি করে নিতে হয়। আমাদের পথ আমরা তৈরি করে নেবো, ইনশাআল্লাহ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেখবেন সব। আমাদের দল উজ্জীবিত। বিভিন্ন জেলায় আমি সফর করেছি, আমি দেখেছি, মানুষ চাঙা হয়ে উঠছে। মানুষের মধ্যে ভীষণ ক্ষোভ আমি দেখতে পাই। এখন শুধু একটা নির্দেশনার অপেক্ষা মাত্র। মানুষ কীভাবে পথে নামে দেখতে পাবেন।

জাগো নিউজ: সারাবিশ্বের রাজনীতিতেই সিস্টেম দাঁড়িয়ে গেছে, একজন বড় নেতা, তার নেতৃত্বে দল। বিএনপির সে নেতা কে?

রুমিন ফারহানা: খালেদা জিয়া, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান- এ দুজনের নেতৃত্ব বাংলাদেশের মানুষ ভীষণভাবে গ্রহণ করেছে। তারেক রহমানও তাই। এখানে কোনো ঘাটতি দেখতে পাচ্ছি না।

জাগো নিউজ: খালেদা জিয়া অসুস্থ, অবসরে। তারেক রহমান দেশের বাইরে। আওয়ামী লীগ সব সময় এ প্রশ্ন করে- আপনারা ক্ষমতায় গেলে প্রধানমন্ত্রী হবেন কে?

রুমিন ফারহানা: বাইরে থাকলে দেশে আসবেন। খালেদা জিয়া সুস্থ হবেন। প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, দল ঠিক করবে। আওয়ামী লীগ তো অনেক প্রশ্নই করে। ২০২৪ এ আওয়ামী লীগের প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, সেটা আওয়ামী লীগ ঠিক করুক আগে। সময়ে কত কিছু পাল্টে যায়! এক মুহূর্ত পরে কী হবে, সেটা এক মুহূর্ত আগে বলা যায় না। সুতরাং ২০২৪ এ বিএনপি দেখা যাবে ঠিকই আছে। কার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে যাবে, সেটা নাও ঠিক থাকতে পারে।

জাগো নিউজ: গত ১৫ বছরে তো এমন ম্যাজিক দেখিনি। আপনি কোন কনফিডেন্স থেকে বলছেন?

রুমিন ফারহানা: ওই যে একটা কথা বলেছি, এক মুহূর্ত পরে কী হবে, সেটা এক মুহূর্ত আগে বলতে পারি না। সুতরাং আমি তো দেখছি, মানুষের মধ্যে যে আপরাইজিং, মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ এবং ঘৃণা সরকারি দলের প্রতি। আমার মনে হয় না, ২০১৪ বা ২০১৮-তে আওয়ামী লীগ যেটা করেছে, ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সেটা করে পার পাবে। মানুষ তাদের ধরবেই। এটা আমার হিসাব।

জাগো নিউজ: মানুষ তো দুই দলে বিভক্ত, কোন দলের মানুষ কোন দলকে ধরবে?

রুমিন ফারহানা: না। মানুষ দুই দলে বিভক্ত নয়। কিছু মানুষ আছে, যে করেই হোক আওয়ামী লীগ করে। কিছু মানুষ আছে যে করেই হোক বিএনপি করে। আরেকটা আছে, সুইং ভোট; তারা কখনো আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়, কখনো বিএনপিকে ভোট দেয়। সেই সুইং ভোট কিন্তু আমি দেখি বিএনপির পক্ষে। এন্টি সরকার।

জাগো নিউজ: আপনার দলের বিরুদ্ধে সব সময় অভিযোগ হচ্ছে- আপনারা নিজেদের স্বার্থে যতটা সক্রিয় মানুষের স্বার্থে ততটা নয়। যেমন- খালেদা জিয়ার বাড়ি থেকে উচ্ছেদ ও মামলা এবং তারেক রহমানের মামলাগুলো নিয়ে আপনারা যেভাবে আন্দোলন করেছেন, ঠিক সেভাবে জনগণের স্বার্থ নিয়ে আন্দোলন করেন না- এটা জনগণের অভিযোগ।

রুমিন ফারহানা: এটা একদমই সত্য নয়। জনগণের যে কোনো ইস্যু যেমন- নিরাপদ সড়ক, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ যে কোনো ইস্যুতে বিএনপি মাঠে ছিল। আপনাকে ভুলে গেলে চলবে না যে, বিএনপিকে আড়াই লাখ মামলা ও ৩৫ লাখ আসামি নিয়ে চলতে হচ্ছে। একেকজনের বিরুদ্ধে শত শত মামলা। সেটা বিএনপি চেয়ারপারসন থেকে শুরু করে একেবারেই তৃণমূল পর্যন্ত। বিএনপির বহু নেতা গুম হয়েছে। বহু নেতা বিচারবর্হিভূত হত্যার শিকার হয়েছে। সুতরাং জ্বালাও-পোড়াওয়ের যে আন্দোলন আওয়ামী লীগ করে, বিএনপির চরিত্র কিন্তু সেটা নয়। লগি-বৈঠা নিয়ে মানুষ মারা বিএনপির চরিত্র নয়। বিএনপি একটা গণতান্ত্রিক দল। তাদের পক্ষে (জনগণ) গণতান্ত্রিকভাবে যে প্রতিবাদ করার সেটাই বিএনপি করেছে। গত ৩ মার্চ জেলাগুলোতে আমরা সম্মেলন করলাম, নাটোর-পটুয়াখালী জেলাসহ তিন-চার জেলায় ছাত্রলীগের কর্মীরা হামলা করেছে। এগুলো তো সব জনসম্পৃক্ত বিষয় নিয়ে (দ্রব্যমূল্য) আমাদের আন্দোলন। সুতরাং জনগণের প্রতিটি ইস্যু নিয়ে আমরা আন্দোলন করছি।

জাগো নিউজ: আপনারা বলছেন, আপনারা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে আন্দোলন করছেন। আর মানুষ মনে করছে, এ বিষয়ে কথা বলার লোক নেই। এই গ্যাপটা কেন?

রুমিন ফারহানা: আমার কিন্তু মনে হয় না, মানুষ তা মনে করছে। কারণ আমরা অল্প কজন যারা সংসদে আছি, আমরা কিন্তু সংসদে মানুষের সম্পৃক্ত বিষয়ে কথা বলছি। আমাদের যেটুকু সীমিত প্ল্যাটফর্ম আমরা পাচ্ছি, সেটুকুর বেস্ট ইউজ করছি কি না, সেটা দেখার বিষয়। আমরা কিন্তু সেটার বেস্ট ইউজ করছি। আমরা সংসদে কথা বলছি। গণমাধ্যমে কথা বলছি। মাঠে বলছি। আমরা জেলায় জেলায় যাচ্ছি। ৫০ হাজার হাট-বাজার ও চার হাজার ৫শ ইউনিয়নে যাচ্ছি। একেবারেই কেন্দ্র থেকে আমাদের পাঠানো হচ্ছে। আমরা কিন্তু বসে নেই।

জাগো নিউজ: আপনি রুমিন ফারহানা যেরকম সংসদ বা বাইরেও সরব, ৩০০ আসনে ২০ দলের ৩০০ নেতা সরব আছেন?

রুমিন ফারহানা: এটা তো জনগণ বলবে।

জাগো নিউজ: আপনি যে কনফিডেন্ট নিয়ে ২০২৪ সালের স্বপ্ন দেখছেন, নেতৃত্বের সেরকম মুভমেন্ট আছে কি না?

রুমিন ফারহানা: আমি মনে করি, আছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটা আরও জোরদার হবে।

জাগো নিউজ: আপনাকে ধন্যবাদ।

রুমিন ফারহানা: আপনাদেরও ধন্যবাদ।

এসইউজে/এএসএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]