টি-২০ বিশ্বকাপ

দলে ট্যাক্সিচালক থেকে শিক্ষক! অভিষেকের অপেক্ষায় ফুটবলের দেশ ইতালি

স্পোর্টস ডেস্ক
স্পোর্টস ডেস্ক স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:১৫ পিএম, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

সোমবার সকালে কলকাতার ইডেনের পাশ দিয়ে যেতে গিয়ে কেউ ভাবতে পারেন, ভারতে কি ফুটবল বিশ্বকাপ চলছে? কারণ, সকাল গড়িয়ে দুপুর নামার আগেই সেখানেই খেলতে নামছে চারবারের ফুটবল বিশ্বকাপ জয়ী ইতালি! না, ফুটবল নয়, ক্রিকেটের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে নামছে ইতালিয়ানরা। প্রথমবার ক্রিকেটের কোনও বড় প্রতিযোগিতায় দেখা যাবে আজ্জুরিদের।

যদি ভাবেন, ইতালিতে ক্রিকেটের প্রচলন কয়েক বছর আগের, তাহলে ভুল ভাববেন। সে দেশে ক্রিকেটের পা পড়েছিল ফুটবলেরও আগে। ব্রিটিশ নাবিক, আমলা, ব্যবসায়ীদের হাত ধরে ইউরোপের দেশে ক্রিকেট পৌঁছেছিল।

কিন্তু দেশটিতে এই খেলা জনপ্রিয়তা পায়নি। ফুটবলের কাছে পিছিয়ে পড়েছিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী তা সীমাবদ্ধ ছিল মাত্র কয়েকটি এলাকায়; কিন্তু কোনওদিন হারিয়ে যায়নি। ক্রিকেটের যে সলতে সেখানে পাকানো হয়েছিল, তাতেই আগুন ধরেছে।

৯ ফেব্রুয়ারি ইডেনে স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলতে নামবে ইতালি। ঘটনাচক্রে তাদের প্রথম ম্যাচ ছিল বাংলাদেশের বিপক্ষে; কিন্তু বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়ায় স্কটল্যান্ড সুযোগ পেয়ে যায়। ফলে স্কটিশদের বিপক্ষেই খেলতে নামবে ইতালিয়ানরা। এ দুই দল ছাড়া গ্রুপ ‘সি’তে রয়েছে ইংল্যান্ড, নেপাল ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

ইতালির এই দলে নানা সংস্কৃতির মেলবন্ধন। বিভিন্ন দেশের ক্রিকেটার রয়েছেন সেখানে। যেমন ইতালিতে জন্ম নেওয়া ক্রিকেটার রয়েছেন, তেমনই রয়েছেন ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলীয় বংশোদ্ভূত ক্রিকেটার। তাদের প্রতিজনের পেশা যে ক্রিকেট, তেমনটাও নয়। কেউ কেউ সারা বছর ক্রিকেট খেললেও অনেকে অন্য পেশার সঙ্গে যুক্ত। তালিকায় শিক্ষক থেকে ফিজিওথেরাপিস্ট, হোটেলকর্মীরাও রয়েছেন।

দলের অধিনায়ক ৪২ বছর বয়সি ওয়েন ম্যাডসন। ১৫ জনের দলে সবচেয়ে বড় তারকা জেজে স্মাটস। এর আগে দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন তিনি। রয়েছেন দু’জোড়া ভাই হ্যারি ও বেঞ্জামিন মানেনতি এবং অ্যান্থনি ও জাস্টিন মস্কা।

প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে নামলেও তারা যে শুধু নামকা ওয়াস্তে খেলতে আসেননি তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন ম্যাডসন। বলেন, ‘আমরা ম্যাচ জিততে চাই। ভাল ক্রিকেট খেলতে চাই। দলের ছেলেরা বেশ কিছুদিন ধরে একসঙ্গে খেলছে। বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে। আমরা আত্মবিশ্বাসী।’

বিশ্বকাপে অভিষেকের আগেরদিন ম্যাডসন এটাও জানিয়ে দিয়েছেন, তারা ক্রিকেটের সাফল্য দিয়ে তাদের জাতীয় ফুটবল দলকে বিশ্বকাপের জন্য উজ্জীবিত করে তুলতে চান।

ইতালিতে ক্রিকেটের ইতিহাস

১৭৯৩ সালে নাপোলিতে পা রাখেন ব্রিটিশ সৈনিক অ্যাডমিরাল হোরাশিও নেলসন। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সেনা সংগ্রহের উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন তিনি। সফলও হন। তার সঙ্গে নাপোলি থেকে ৬ হাজারের বেশি সৈন্য ইতালি পাড়ি দেন। নাপোলিতে থাকাকালীন ফাঁকা সময়ে বাকিদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতেন নেলসন। সেই প্রথম ক্রিকেটের শুরু সে দেশে।

এক শতাব্দী পরে ১৮৯৩ সালে ইতালিতে ইংল্যান্ডের দূতাবাসের কর্মীরা জেনোয়া ক্রিকেট ও অ্যাথলেটিক ক্লাব শুরু করেন; কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই ক্রিকেটকে টেক্কা দিয়ে দেয় ফুটবল। জেনোয়াতে ফুটবল ক্লাব চালু করেন জেমস রিচার্ডসন। সেই ক্লাব ১৮৯৮ সালে ইতালির প্রথম ফুটবল প্রতিযোগিতা জয় করে।

১৮৯৯ সালে ইতালির প্রথম ফুটবলার হিসাবে বিদেশে খেলতে যান হারবার্ট কিলপিন। সেখানে কয়েকজন ব্যবসায়ী তাকে ইতালিতে ক্লাব তৈরির প্রস্তাব দেন। হারবার্ট তৈরি করেন মিলান ক্রিকেট ও ফুটবল ক্লাব। পরবর্তীকালে এই ক্লাবেরই নাম হয় এসি মিলান। ১৯১৯ সাল পর্যন্ত সেখানে ফুটবলের পাশাপাশি ক্রিকেট খেলাও হত; কিন্তু ১৯১৯ সালে তা বন্ধ হয়ে যায়।

১৯৬০-এর দশকে আবার ক্রিকেট শুরু হয় ইতালিতে। রোমে কয়েকটি প্রতিযোগিতাও হয়। ইতালি ক্রিকেট সংস্থার সিইও লুকা ব্রুনো মালাসপিনা জানিয়েছেন, ফুটবলের পর দ্বিতীয় কোনও খেলা সেখানে জনপ্রিয় হতে শুরু করেছিল। তারা স্কুলের ছেলেদের মধ্যে ক্রিকেটের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছিলেন। লুকা বলেন, ‘একেবারে তৃণমূল স্তর থেকে সবটা শুরু হয়েছিল। স্কুলগুলোর দিকে নজর দেওয়া হয়েছিল। তারপর পাড়ায় পাড়ায় ক্রিকেটের প্রসারের চেষ্টা হয়।’

ইতালি এবং ইন্টার মিলানের হয়ে খেলা ক্রিশ্চিয়ান ভিয়েরি ফুটবল মহলে অত্যন্ত পরিচিত মুখ। বিশ্বের অন্যতম সেরা সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসাবে বিবেচনা করা হয় তাকে। ছোটবেলায় তিনিও ক্রিকেট খেলতেন।

বাবার কর্মসূত্রে তার পরিবার বেশ কয়েক বছর সিডনিতে ছিল। সে সময় ফুটবলের পাশাপাশি ক্রিকেটও খেলতেন ভিয়েরি। প্রথম পছন্দ ছিল ক্রিকেট। ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত তার স্বপ্ন ছিল অ্যালান বর্ডারের মতো ব্যাটার হওয়ার। বাঁ-হাতে ব্যাট করতেন ভিয়েরি। প্রতিভাবান ক্রিকেটার হিসাবে পরিচিতি পেয়েছিলেন স্কুলজীবনে। ২০০১-০২ মৌসুমে ইন্টারের লন্ডন সফরের সময় নিজের ক্রিকেট প্রীতির কথা বলেছিলেন। তার পরিবার ইতালিতে ফিরে না এলে হয়তো অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ক্রিকেটই খেলতেন সাবেক এই ফুটবলার।

ইতালির ক্রিকেটে ঐতিহাসিক মুহূর্ত

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এমন এক বছরে ইতালি ক্রিকেট বিশ্বকাপ খেলতে চলেছে, যে বছরে তারা এখনও ফুটবল বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেনি। ১৯৫৮ সালের পর থেকে ২০১৮ ও ২০২২ সালে পর পর দু’বার ফুটবল বিশ্বকাপে খেলতে পারেনি আজ্জুরিরা। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপেও খেলার সম্ভাবনা ঝুলে রয়েছে। প্লে-অফ খেলতে হবে তাদের।

বিশ্বকাপে দল খেলতে নামলেও ইতালি ক্রিকেট সংস্থার মূল লক্ষ্য সে দেশে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা আরও বাড়ানো। ইতালির মানুষ খেলা ভালবাসেন। ফুটবলপ্রেমী জনতার মনে ক্রিকেটকে পাকাপাকিভাবে ঢুকিয়ে দিতে চাইছেন তারা। ইতালি ক্রিকেট সংস্থার সভাপতি লোরিয়া হাজ পাজ জানিয়েছেন, বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জন করা ইতালির ক্রিকেটের ঐতিহাসিক মুহূর্ত। তিনি বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে ত্যাগ ও পরিশ্রমের ফল পাচ্ছি। ১১ জুলাই দিনটা ভোলার নয়। সেদিনই আমরা বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন করেছিলাম। এটা গোটা দেশের ক্রিকেটপ্রেমী জনতার জয়। অনেক বছরের অপেক্ষার অবসান হয়েছে। এ বার চাই, দেশ জুড়ে ক্রিকেট জনপ্রিয়তা পাক।’

উত্থানের নেপথ্য নায়ক

ইতালির ক্রিকেট দলে যেমন বিভিন্ন দেশের ক্রিকেটারেরা রয়েছেন, তেমনই কোচিং দলেও রয়েছে বৈচিত্র্য। তাদের প্রধান কোচ জন ডেভিসন কানাডার হয়ে ২০০৩ সালের একদিনের বিশ্বকাপ খেলেছিলেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ৬৭ বলে শতরান করেছিলেন। দলের ব্যাটিং কোচ কেভিন ও’ব্রায়ান আয়ারল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপ খেলেছেন। ২০১১ সালের একদিনের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলেছিলেন তিনি। ৫০ বলে শতরান করেছিলেন।

দলের মিডিয়া ম্যানেজার রাকবির হাসান বাংলাদেশের ঢাকার বাসিন্দা। নিজের দেশ বাংলাদেশ বিশ্বকাপে না থাকলেও রাকবির থাকবেন। তিনি জানিয়েছেন, কিভাবে ডেভিসন, ও’ব্রায়ানরা ইতালিকে বিশ্বকাপের জন্য তৈরি করেছেন। রাকবির বলেন, ‘ওদের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ওরা বিশ্বকাপে খেলার কারণে জানে, কতটা পেশাদারিত্ব প্রয়োজন। পাশাপাশি খেলার খুঁটিনাটিও ওদের জানা। চাপ সামলে কিভাবে সফল হতে হবে সে শিক্ষা ওরা দিয়েছে। তাতে সকলের সুবিধা হয়েছে। ইতালি প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে নামলেও কেউ যদি আমাদের হালকা ভাবে নেয়, তারা ভুল করবে।’

২৩৩ বছর ধরে ইতালিতে ক্রিকেট বেঁচে থাকলেও এতদিন আইসিইউতে ছিল। এই প্রথমবার বিশ্বক্রিকেটের মানচিত্রে তারা। লুকা, ডেভিসন, ম্যাডসন, জসপ্রিতদের একটাই লক্ষ্য। এমন একটা সময় আসবে, যখন ইতালি বিশ্বকাপ খেলছে বললে ফুটবল নয়, ক্রিকেটের কথাই ভাববেন সবাই।

আইএইচএস/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।