মিডল অর্ডারে হৃদয়, ইমন আর শামীমের এমন ব্যাটিং মনে থাকবে বহুকাল
‘ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়।’ অনেক পুরোনো প্রবাদ। এ প্রবচনের সত্যতা খুঁজে পাওয়া গেছে অতীতে বহুবার। আজ তার সত্যতার দেখা মিলল চট্টগ্রামের বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান স্টেডিয়ামে।
শুধু ইচ্ছাশক্তির বলে বলীয়ান হয়ে প্রায় অসম্ভবকে সম্ভব করলো টাইগাররা। টপ অর্ডারে তানজিদ হাসান তামিম (২৫ বলে ২০) আর সাইফ হাসান (১৬ বলে ১৭) ও অধিনায়ক লিটন দাস (১৫ বলে ২১) সময়ের দাবি মেটাতে না পারায় লক্ষ্যে পৌঁছানোটা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছিল। ১৮৩ রানের টার্গেটটাকে তখন অনেক বড় আর কঠিন মনে হচ্ছিল।
১১ নম্বর ওভারের প্রথম বলে তানজিদ তামিম যখন মাত্র ৮০ স্ট্রাইক রেটে ২৫ বলে ২০ রান করে আউট হলেন, তখন বাংলাদেশের স্কোর ৩ উইকেটে ৭৭। পরের ৫৯ বলে দরকার ছিল ১০৬ রানের। এরকম অবস্থায় অতীতে বাংলাদেশের ব্যাটারদের বারবার বহুবার ভেঙে পড়তে দেখা গেছে। সাহস, উদ্যম হারিয়ে লক্ষ্যহীন ব্যাট চালানোর নজিরই বেশি। কিন্তু আজ ২৭ এপ্রিল বন্দরনগরীর সাগরিকায় তাওহীদ হৃদয়, পারভেজ ইমন আর শামীম পাটোয়ারীকে দেখা গেল অন্য রূপে।
তিন মিডল অর্ডারকেই দেখে মনে হলো সাহস, আস্থার প্রতিমূর্তি। লক্ষ্য কঠিনই হয়ে গেছে। শুরুতে যেটা ছিল ওভারপিছু ৯.১৫, সেটা বেড়ে তখন ১০.৭০। কিন্তু তাওহিদ হৃদয়, পারভেজ ইমন আর শামীম পাটোয়ারীরা ওই অবস্থায়ও নির্ভীক, সাহসী। তিন তরুণের চোখ-মুখ আর শরীরী ভাষা বলে দিচ্ছিল, আমরা ম্যাচ জিতে বিজয়ীর বেশেই মাঠ ছাড়তে চাই। কোনোভাবেই সাহস হারানো যাবে না। লড়াই করতে হবে বুক চিতিয়ে। তিনজন করলেনও তাই।
হৃদয় প্রথমে উল্কার বেগে শুরু করে বেড়ে যাওয়া ওভারপিছু লক্ষ্যমাত্র ছোঁয়ার কাজটি করে একসময় গিয়ে একপ্রান্ত ধরে রাখায় মনোযোগ দিলেন। শেষ পর্যন্ত ম্যাচ জেতানো অর্ধশতক উপহার দিয়ে দল জিতিয়েই ফিরলেন সাজঘরে। আর পারভেজ ইমন ও শামীম খেললেন বেপরোয়া। কিউই বোলারদের নাভিশ্বাস তুলে উইকেটের সামনে ও দুদিকে ইচ্ছেমতো চার-ছক্কার ফুলঝুরিতে মাঠ গরম করে হিসাব সহজ করে ফেললেন ইমন ও শামীম। অফস্টাম্পের অনেক বাইরের বলকে টেনে মারতে গিয়ে তাও স্কোয়ারে না, লং অফের ওপর দিয়ে চালাতে গিয়ে আউট হলেন বাঁহাতি ইমন। আউট হওয়ার আগে ২ ছক্কায় ২০০ স্ট্রাইকরেটে খেলে গেলেন ২৮ রানের এক ক্যামিও ইনিংস।
প্রায় একই ঢং, ছন্দ ও গতিতে ১৩ বলে দুই ছক্কা আর তিন বাউন্ডারিতে ৩১ রানের হার না মানা ইনিংস উপহার দিয়ে হৃদয়ের সঙ্গে দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে হাসিমুখে সাজঘরে ফিরলেন আরেক বাঁহাতি শামীম। ১৮৮.৮৮ স্ট্রাইক রেটে ৫১ রানের অপরাজিত থেকে ম্যাচসেরার পুরস্কার উঠল হৃদয়ের হাতে।
মাত্র ১২০ বলের খেলা। দুই ওপেনার আর ওয়ান ডাউন ব্যাটার বেশি বল খেলার সুযোগ পান। তাই টি-টোয়েন্টিকে ধরা হয় টপ অর্ডারদের খেলা। কিন্তু প্রথম তিনজন ব্যর্থ হওয়ার পর ১৮৩ রানের বড়সড় লক্ষ্য পূরণে মিডল অর্ডারের জ্বলে ওঠা ছাড়া আর পথ নেই।
আজ সোমবার চট্টগ্রামে হৃদয়, ইমন আর শামীম একসঙ্গে জ্বলে উঠে সেই অতি দরকারি কাজটি করেছেন বলেই শেষ অবধি বাংলাদেশ ৬ উইকেটে জিতেছে। সবচেয়ে বড় কথা, তিনজনই খেলেছেন হিসেব কষে। হৃদয় যখন নেমেছেন, তখন দল লক্ষ্যমাত্র থেকে খানিক পিছিয়ে। তাই শুরুতে একটু বেশি মেরে খেলে প্রথম ১৪ বলে করে বসেন ৩৩ রান। তারপর ইমন হাত খুলে খেলতে শুরু করলে খানিক গুটিয়ে নিয়ে অপর প্রান্তে নটআউট থাকার চিন্তায় মনোযোগী হৃদয় শেষ ১৭ রান করেন।
ইমন ১৪ বলে ২৮ রান করে ফেরার পর শামীম আরও হাত খুলে খেলতে শুরু করেন। ছয় নম্বরে ক্রিজে যাওয়া শামীমের ব্যাট থেকে ১৩ বলে ৩১ রান আসলে হিসাবটা হাতের মুঠোয় চলে আসে। প্রয়োজনে হাত খুলে খেলার পাশাপাশি অনেক হিসাব-নিকাশ করে ম্যাচ জেতার নজির হয়ে থাকবে এ ম্যাচটি।
সমালোচকরা হয়তো বলবেন , নিউজিল্যান্ড বোলিংটা অনেক কমজোরি। তাই হয়তো হৃদয় ১৮৮, পারভেজ ইমন ২০০ আর শামী ২৩৮ স্ট্রাইকরেটে পর পর তিনটি বিধ্বংসী ইনিংস সাজাতে পেরেছেন। তা মানা যেতো, যদি না ওপরে তানজিদ তামিম, সাইফ হাসান আর লিটন দাসও এভাবে হাত খুলে খেলতে পারতেন।
আসলে ভালো খেলার জন্য সবার আগে দরকার ইচ্ছে। দল জেতাতে চাই দৃঢ় সংকল্প। আর পরিবেশ-পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য প্রয়োজন হিসেব কষে খেলা। এই তিনটি কাজ একসঙ্গে হয় খুব কম। বাংলাদেশের ব্যাটাররা পারেন কালেভদ্রে। আজ ২৭ এপ্রিল বন্দর নগরীর সাগরিকায় তিন বাংলাদেশ মিডল অর্ডার হৃদয়, ইমন আর শামীম তা পেরেছেন। তাদের এই পজিটিভ অ্যাপ্রোচ আর ম্যাচ জেতার অদম্য ইচ্ছে টাইগার ভক্তদের মন কেড়েছে। তাদের এমন ম্যাচ জেতানো ব্যাটিং মনে থাকবে বহুকাল। তারা যত বেশি এমন ব্যাটিং করতে পারবেন, তত বেশি ম্যাচ জিতবে বাংলাদেশ।
এআরবি/এমএমআর