ক্রিকেটের মহাযজ্ঞে শামিল হলাম আমরাও

ইমাম হোসাইন সোহেল
ইমাম হোসাইন সোহেল ইমাম হোসাইন সোহেল , স্পোর্টস এডিটর
প্রকাশিত: ০১:৫৭ পিএম, ২৭ মে ২০১৯

নারকেলের খোল দিয়ে ব্যাট বানিয়ে ক্রিকেট খেলতাম তখন। দোকান থেকে কিনে আনা ব্যাটের চিন্তা! সে তো তৈরিই হয়েছিল অনেক অনেক বছর পর! বড়দের কাছে শুনতাম- ইমরান খান, ওয়াসিম আকরাম, জাভেদ মিয়াঁদাদ আর ইনজামামদের বিশ্বকাপ জয়ের গল্প। আজহারউদ্দিনের কথাও শুনতাম তখন, আর ভাবতাম, ইস! তাদের খেলা যদি একবার দেখতে পারতাম!

একেবারে অজ-পাড়া গাঁ। পুরো তিন গ্রাম খুঁজে হয়তো একটি টেলিভিশনের দেখা মিলতো তখন। তাও আবার সেখানে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্রিকেট দেখা! অলিক কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। আর হাটে গিয়ে চায়ের দোকানে বসে ১ টাকার বিনিময়ে খেলা দেখা! বাড়ি ফেরার পর বাবার হাতের পিটুনি খাওয়ার ভয় মাথায় আসলে সে চিন্তা অকালেই মারা পড়ত।

ক্রিকেটের সঙ্গে এভাবেই ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে উঠেছি। কৈশোরের গণ্ডি তখনও পেরোয়নি। ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফির ধারাভাষ্য শুনতাম বাংলাদেশ বেতারে, ‘কুয়ালালামপুরের কিলাত ক্লাব মাঠ থেকে আমি..... বলছি। দৃষ্টি নন্দন চার, দেখার মত মার, হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মত মার...।’

এমনই ধারাভাষ্য শুনতাম আর মানসপটে এঁকে নিতাম একটি ক্রিকেট মাঠ, সেখানে খেলছে বাংলাদেশ। খেলছে আকরাম খান, বুলবুল, পাইলট, শান্ত, রফিকরা। যেন আমি নিজ চোখে দেখতে পাচ্ছিলাম কিলাত ক্লাব মাঠের সেই খেলাটি।

স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জণ করার পর কেনিয়ার বিপক্ষে ফাইনালের ধারাভাষ্য শুনতে রেডিওর সামনে বসে থেকেছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। খেলার মাঝে বৃষ্টির ভাগড়ায় যখন ২৫ ওভারে নির্ধারণ করা হলো ১৬৬ রানের লক্ষ্য। তখন কতটা হতাশ হয়েছিলাম, তা আজও মনে পড়ে আর ভাবি ওই অতটুকুন বয়সেই ক্রিকেটের প্রতি কেমন আকর্ষণ জন্মে গিয়েছিল আমার!

শেষ মুহূর্তে যখন এক বলে এক রান প্রয়োজন এবং পাইলট আর শান্ত মিলে সেই অবিশ্বাস্য রানটি নিয়ে নিলেন আর ২ উইকেটে কেনিয়াকে হারিয়ে আইসিসি ট্রফি চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেল বাংলাদেশ, তখন সেকি আনন্দ! মনে পড়ে, এক দৌড়ে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছিলাম সেদিন। দেখি, আমার মত অনেকেই খুশিতে আত্মহারা। গ্রামের বাজারে মিছিল বেরিয়েছে। রঙ মাখামাখিও করছে কেউ কেউ। পরে শুনেছিলাম, আমার সেই গ্রামের বাজারের মত সারা দেশও নাকি এমন আনন্দ-উচ্ছাসে উদ্বেল হয়ে পড়েছিল। রঙয়ের বণ্যা বয়ে গিয়েছিল সেদিন।

এক বয়স্ক ব্যাক্তিকে বলতে শুনলাম, ‘বাংলাদেশ ২ গোলে জিতেছে।’ তখন তো ফুটবলেরই জয়জয়কার। গ্রামের মানুষ আসলাম, সাব্বির, মুন্না, আলফাজদের নামে পাগল। ক্রিকেট খেলা কি সেটা তখনও তারা খুব একটা জানতো না। এ কারণে, বিশ্বকাপে ওঠার আনন্দের সঙ্গে যখন চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আনন্দ যোগ হলো, এবং বাংলাদেশ জিতেছিল ২ উইকেটে, সেটা গাঁয়ের মানুষের কাছে পরিণত হয়েছিল ‘২ গোলের জয়ে।’

অজ পাড়া গাঁয়ে এমনই খুশির জোয়ার! মফস্বল কিংবা শহর এলাকাগুলোতে তাহলে কি? তখন না জানলেও পরে জেনেছি। আসলে, ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি জয়ের পর ওই যে সর্বব্যাপি ক্রিকেটের জোয়ার শুরু হয়েছিল, সেটাই মূলতঃ বাংলাদেশে এই খেলাটির মূল ভিত তৈরি করে দিয়েছে। জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করে এই চ্যাম্পিয়ন হওয়া।

সে থেকে হাঁটি হাঁটি পা পা করে বাংলাদেশের ক্রিকেট আজ বিশ্বের অন্যতম সমীহজাগানিয়া একটি দল। ১৯৯৭ সালে তৈরি হওয়া ক্রিকেট জোয়ারের সঙ্গে সামিল হয়ে গিয়েছিল পুরো বাংলাদেশ। পাড়া-মহল্লা, গ্রাম-ইউনিয়ন-শহর, স্কুল-কলেজ সর্বত্র ক্রিকেটের জোয়ার।

যেখানে ব্যাট-বল সহজলভ্য ছিল সেখানে তো কথাই নেই, যেখানে সহজলভ্য ছিল না, সেখানে নারকেল কিংবা তালের ডগার খোল দিয়ে ব্যাট এবং কাঁচা জাম্বুরা অথবা বাতাবি লেবু দিয়ে বল বানিয়েও ক্রিকেট খেলেছে তখনকার প্রজন্ম। একদিন ক্রিকেটার হবো, আকরাম-বুলবুল-রফিকদের মত আমরাও মাঠ দাপিয়ে বেড়াবো, সে স্বপ্ন যে ছিল না তা নয়।

কিন্তু সবার তো আর নিয়তি কিংবা ভাগ্য একই সূত্রে বাধা থাকে না। নানান বাস্তবতার কারণে সবার খেলোয়াড় কিংবা ক্রিকেটারও হওয়া হয়ে ওঠে না। কিংবা স্বপ্ন থাকলেও হয়তো সেই প্রতিভাও ছিল না। সে যাই হোক, ক্রিকেটার হতে না পারি, ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে তো অন্তত জাতীয় পর্যায়ে এই খেলাটির সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পেরেছি!

তবে একটা কথা চিরন্তন সত্য, ফুটবল বিশ্বকাপের যে আবেগ-উত্তেজনা তার ছিটেফোটাও কিন্তু নেই ক্রিকেট বিশ্বকাপে। এক কথায়ই এর উদাহরণ দেওয়া যায়, ফুটবল বিশ্বকাপ শুরুর অন্তত একমাস আগে থেকে যেভাবে আমাদের প্রতিটি পাড়া-মহল্লায়, বাড়ির ছাদে, ঘরের কোনায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা-জার্মানি-স্পেন কিংবা ফ্রান্সের পতাকা লাগানোর ধুম পড়ে, ক্রিকেট বিশ্বকাপে কি কখনও দেখা গেছে তেমন কোনো প্রিয় দলের পতাকা কেউ টানাতে?

শক্তির বিচারে ফুটবলে তো সবচেয়ে দুর্বল অঞ্চল এশিয়া! এর মধ্যে আরও দুর্বল উপমহাদেশ। অথচ, অজানা-অচেনা একটি দেশের পতাকাকে আমরা টানিয়ে দিই নিজের বাড়ির ছাদে। কখনও কখনও এমন দেখা যায়, কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত প্রিয় দলের পতাকা বানিয়ে নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করতে। এতটা আবেগ-উচ্ছাস আর উত্তেজনায় ফুটবল আমাদের ছুঁয়ে যায়। কিন্তু, কই ক্রিকেট বিশ্বকাপে তো এমন দেখা যায় না কখনও! এমনকি এবার নিয়ে টানা ছয়বার বাংলাদেশ বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে; কিন্তু আজও নিজ দেশের পতাকা টানাতে দেখা যায় না কোন ভক্ত-সমর্থককেই।

world-cup

তবুও, ক্রিকেটের প্রতি আমাদের টান কিংবা ভালোবাসা অফুরন্ত। সাকিব-তামিমরা যখন কোন একটি বড় দলকে হারিয়ে দেয়, তখন শতদা বিভক্ত এই দেশটির মানুষই সব দল-মত ভুলে গিয়ে এক কাতারে রাস্তায় নেমে আসতে পারে। যোগ দিতে পারে বিজয় মিছিলে। মিষ্টি মুখ করা কিংবা রঙ ছিটিয়ে আনন্দ-উল্লাস করতে পারে। ক্রিকেট এমনই একটি ফ্ল্যাটফরম, যেখানে বাংলাদেশের মানুষ ভুলে যায় রাজনৈতিক, ধর্মীয়, জাত-পাতের সকল ভেদাভেদ।

২০১১ বিশ্বকাপটি অনুষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশে। সেবার বিশ্বকাপ কাভার গৌরবময় অভিজ্ঞতা হয়েছিল। ভারতের বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচে বড় ব্যবধানে হারের পর যখন মিরপুরে আয়ারল্যান্ডকে হারিয়ে দিল সাকিব বাহিনী, তখন দেখলাম এক অভাবনীয় দৃশ্য। মিরপুর থেকে হোটেল শেরাটন (বর্তমানে ইন্টার কন্টিনেন্টাল) পর্যন্ত রাস্তার দু’ধারে মানুষের সারি, বাংলাদেশের টিম বাসকে অভ্যর্থনা জানাবে বলে দাঁড়িয়ে তারা। কী সুশৃঙ্খল, কী প্রাণবন্ত! দেখে মনে হয়েছিল, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দেখিনি আমি। কিন্তু আরেকটি বিজয় তো নিজ চোখে অবলোকন করছি! তখন খুব লিখতে ইচ্ছে করেছিল, ‘আমি বিজয় দেখেছি।’ ক্রিকেট ছাড়া আর কোন কিছুই কি পারে এভাবে বাংলাদেশের মানুষকে এক কাতারে এনে দাঁড় করিয়ে দিতে!

ক্রিকেটের সঙ্গে নাড়ির বন্ধন আমাদের এমনই। মাশরাফি-মুশফিকরা হারলে আমরা ব্যাথিত হই। তারা জিতলে আমরা আনন্দিত হই। একটি বহুজাতিক কোম্পানির বিজ্ঞাপনের ভাষাতেই বলতে ইচ্ছে করছে, ‘মাঠে খেলছো তোমরা ১১জন। পেছনে পুরো বাংলাদেশ।’ বাড়ির ছাদে পতাকা না টানাক, লন্ডনের লর্ডস, কার্ডিফের সোপিয়া গার্ডেন কিংবা লন্ডনের দ্য ওভালে গিয়ে যেন বসে আছে এ দেশের প্রতিটি ক্রিকেট পাগল মানুষের হৃদয়।

২ জুন লন্ডনের দ্য ওভালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষেই বিশ্ব অভিযানের সূচনাপর্ব টাইগারদের। এমন ম্যাচের আগে এক সময় দুরু দুরু বুক কাঁপতো বাংলাদেশের ক্রিকেট সমর্থকদের। এখন আর খুব একটা কাঁপে না। গত চারটি বছরে বাংলাদেশ যে ওয়ানডে ক্রিকেটে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছে!

একটি সিরিজে ৫ ম্যাচ হলে সেখানে সিরিজ জিততে না পারুক, ২টি ম্যাচ তো জেতেই বাংলাদেশ। ঘরের মাঠে তো দুর্বোধ্য। যে কোনো দলকে হোয়াইটওয়াশ পর্যন্ত করতে পারে। জয় এখন নিয়মিত হয়ে গেছে। এ কারণে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই দক্ষিণ আফ্রিকার মত শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি। তবুও বাংলাদেশের ক্রিকেট ভক্তদের চিন্তা নেই খুব একটা। মাশরাফিদের ওপর এখন আস্থা অনেক বেশি। নিজেদের সেরাটা দিয়ে খেলতে পারলে অনায়াসেই এসে জয় ধরা দেবে এখন।

তবও এটা বিশ্বকাপ। একটা উত্তেজনা তো থাকবেই। কেমন স্নায়ুবিক ব্যাপার-স্যাপার! শরীরের প্রতিটি শিরায় শিহরণ বয়ে যায়। প্রত্যাশার বেলুন তো অনেকই ফোলানো যায়। কতটা পূরণ হয় সেই প্রত্যাশা! গত বিশ্বকাপের আগে প্রত্যাশা ছিল ‘যতদুর যাওয়া যায়, যত ভালো করা যায়।’ শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে ভক্ত-সমর্থকদের আশা পূরণ করেছে।

এবারের বিশ্বকাপের আগে লক্ষ্য সেমিফাইনাল। ত্রিদেশীয় সিরিজ খেলতে যাওয়ার আগে অফিসিয়াল সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে মাশরাফি নিজেই বলেছিলেন, ‘সেমিফাইনালে যাওয়া সম্ভব; কিন্তু কাজটা খুব কঠিন। আমাদের দলের সামর্থ্য আছে চ্যাম্পিয়ন হওয়ারও। কিন্তু বিশ্বকাপের মত মঞ্চে সেটা কতটুকু অর্জন করা যাবে, সেটা তো বলা মুস্কিল।’

ঠিক চার বছর আগে লক্ষ্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে মাশরাফি উল্লেখ করেছিলেন, ‘লক্ষ্য তো অনেক কিছুই। অনেক বড় কিছু স্বপ্নও দেখা যায়। চাইলেই বলা যায় আমরা চ্যাম্পিয়ন হতে চাই। কিন্তু স্বাদ আর সাধ্যের মধ্যে তো সামঞ্জস্য থাকতে হবে!’ দেখুন চার বছরে মাশরাফির নিজের মুখের ভাষা, শারিরীকি উপস্থাপনাটাও কিন্তু অনেক বদলে গেছে।

স্বাদ এবং স্বপ্ন নিয়েই মানুষ বাঁচে। কখনও অর্জন হয়, কখনও হয় না। এভাবে এগুতে এগুতেই সম্ভবত একদিন মানুষ সাফল্যের শিখরে পৌঁছে যায়। বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশও একদিন পারবে এই শিখরে পৌঁছাতে। মাশরাফি সাকিবরা এবার দেশকে কতদুর এগিয়ে নিতে পারেন সেটাই দেখার বিষয়।

বিশ্বকাপের আগে ত্রিদেশীয় সিরিজের পারফরম্যান্স কিন্তু বিশ্বকাপে টাইগারদের নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের আশা-আকাংখার মাত্রা অনেক বেশি বাড়িয়ে দিয়েছে। এই প্রথমবার বাংলাদেশ হয়েছে চ্যাম্পিয়ন। এখন দেখার বিষয়, মাশরাফিরা এবার সেই আশার প্রতিফলন কতটুকু ঘটাতে পারেন!

স্বাদ আর স্বপ্ন আমাদেরও আছে। ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে খেলতে গেলো বাংলাদেশ। আর এ উপলক্ষে অনলাইনে আমাদের অগণিত পাঠককে উপহার দেবো ভিন্ন স্বাদের কিছু। ক্রিকেটের মহাযজ্ঞে সামিল হওয়ার লক্ষ্য এবং সেই স্বাদ আর স্বপ্ন থেকেই আমাদের ক্ষুদ্র প্রয়াস, ‘জাগো ক্রিকেট বিশ্বকাপ’।
আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন ছিল। সাধ্যের মধ্যে সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছি, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের। অনেক কিছু স্বপ্ন থাকলেও সব কিছু বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। তবুও আশা করি অনেকটাই সফল হয়েছি। বাকিটা পাঠকের বিচার্য।

আইএইচএস/এমকেএইচ

আপনার মতামত লিখুন :