‘শেখ কামালের স্বপ্ন ছিল ফুটবলে এশিয়ায় শক্তিশালী হবে বাংলাদেশ’

রফিকুল ইসলাম
রফিকুল ইসলাম রফিকুল ইসলাম , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৫:৫৯ পিএম, ১৫ আগস্ট ২০১৯

আজ ১৫ আগস্ট। বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কময় একটি দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে জাতি হারিয়েছে তার পিতা, সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি ও স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। সে দিন ঘাতকরা নির্মমভাবে হত্যা করে বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী এবং তিন পুত্রসহ পরিবারের আরো ১৮ জনকে। আজ জাতি গভীরভাবে স্মরণ করছে বঙ্গবন্ধুসহ সেদিন শহীদ হওয়া সবাইকে।

বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামাল ছিলেন দেশের ক্রীড়াঙ্গনের প্রাণপুরুষ। তার গড়া প্রতিষ্ঠান আবাহনী ক্রীড়া চক্র দেশের ক্রীড়াঙ্গনে রেখে যাচ্ছে অনন্য অবদান। কেবল আবাহনী নয়, দেশের ক্রীড়া, বিশেষ করে ফুটবল নিয়ে শেখ কামালের স্বপ্ন ছিল আকাশ ছোঁয়া।
জাতীয় শোক দিবসে বঙ্গবন্ধু এবং শেখ কামালকে স্মরণ করে আবাহনীর প্রতিষ্ঠাতার সেই স্বপ্নের কথা বললেন দেশের ফুটবলের সর্বকালের সেরা তারকা, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অন্যতম সদস্য এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি কাজী মো. সালাউদ্দিন।

দুপুরে মতিঝিলস্থ বাফুফে ভবনে জাতীয় শোক দিবসের কর্মসূচির অংশ হিসেবে দুস্থদের মাঝে খাবার বিতরণের পর বাফুফে সভাপতি বলেন, ‘প্রথমেই আমি বলবো বঙ্গবন্ধুর কথা। এই দিনে জাতির পিতাকে হত্যা করা হয়েছে। আজকের এই দিনটা বাঙালি এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে কালো দিন। আমি মনে করি, পৃথিবী যতো দিন থাকবে বাঙালি এবং বাংলাদেশের মানুষের জন্য এরচেয়ে বড় কালো দিন আর আসবে না। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে, এই দিনটা আমাদের জীবনে এসেছে। আমাদের যে কতটা ক্ষতি হয়েছে তা বর্ণনা করে বোঝানো যাবে না।’

শেখ কামালকে স্মরণ করে বাফুফে সভাপতি বলেন, ‘শেখ কামালের সঙ্গে আমরা শেষ কথা হয় ১৯৭৫ সালের ৮ আগস্ট, বিমানের মধ্যে। আমরা তখন মালয়েশিয়া যাচ্ছিলাম মারদেকা কাপ খেলতে। শেখ কামালেরও আমাদের ম্যানেজার হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। তার একটা রাজনৈতিক অনুষ্ঠান পড়ে যাওয়ায় যেতে পারেনি। যাওয়ার সময় আমাকে একটা কথাই বলেছিল, “তুই এবার যা। ক্যাপ্টেইন হয়ে যাচ্ছিস, যতদিন ভবিষ্যতে খেলবি আমি ম্যানেজার থাকবো আর তুই ক্যাপ্টেনই থাকবি। আমাদের চোখ এশিয়ায়। আমরা এশিয়াতে বাংলাদেশকে পাওয়ারফুল ফুটবল দল হিসেবে গড়ে তুলবো।” ওই কথাটি ৪০/৪৫ বছর পরও মনে পড়ে। মনে হয় কালকেই যেন আলাপ হয়েছে।’

শেখ কামালকে হারানো ক্রীড়াঙ্গনের জন্য বিশাল ক্ষতি উল্লেখ করে কাজী মো. সালাউদ্দিন বলেন, ‘কামালকে হারিয়ে দেশের স্পোর্টস অঙ্গনের বিরাট ক্ষতি হয়েছে। এখনো প্রাইম মিনিস্টার বলেন, মিনিস্টার বলেন আমাদের সাপোর্ট দেন; কিন্তু কামাল সবকিছু দেখতেন গভীরভাবে, সে আমাদের সব কিছু বুঝতো। আমাদের প্রচুর সময়ও দিতো। সব কিছু জানতো বলে কোনো সমস্যা হলে দ্রুত সমাধানও দিতে পারতো। এখন এটা তো সম্ভব না যে, রোজ রোজ প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাওয়া এবং গিয়ে সবকিছু বলা। কামাল ছিল প্র্যাকটিক্যাল। ওর বয়স যখন ২৩/২৪ বছর, তখন আবাহনীর মতো একটা ক্লাব গড়ে গেছে। আবাহনী এখন বাংলাদেশের একটা ইনস্টিটিউট। সুতরাং ওখানেই বোঝা যায় কামালের ভিশনটা কোথায় ছিল।’

বাফুফে সভাপতি হওয়ার পর শেখ কামালকে বেশি মিস করেন উল্লেখ করে কাজী মো. সালাউদ্দিন বলেন, ‘আমি বাফুফে সভাপতি হওয়ার পর ওকে (কামালকে) খুব বেশি মিস করছি। সে থাকলে আমাদের অনেক সমস্যা হয়তো একদিনে সমাধান হয়ে যেতো। এখনো সমাধান হয়; কিন্তু কামালতো প্র্যাকটিক্যাল মানুষ ছিলেন। এখন যেটা সমাধান হতে লম্বা সময় লাগে, কামাল থাকলে হতো এক/দুই দিনেই হতো।’

salauddin

শেখ কামাল যে স্বপ্ন দেখেছিলেন ফুটবলে বাংলাদেশকে এশিয়ায় পাওয়ারফুল দল হিসেবে গড়ে তোলার, সে স্বপ্ন বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব, আপনি কতটা আশাবাদী?

‘আমি যখন এই ফেডারেশনের দায়িত্ব নেই ৮/১০ বছর আগে, তখন এখানে লিগ হতো না। ফুটবলটা মারাই গিয়েছিল। আমাকে অনেকে বলেছিল আমি পাগল নাকি? কেন এখানে এসেছেন? কারণ, একটা মরা হাতিকে বাঁচানো যায় না। ফুটবলতো একটা হাতি। কিন্তু কাউকে না কাউকে তো চেষ্টা করতে হবে। আজকে দেখেন, ১০ বছর ননস্টপ লিগ হচ্ছে। আমরা যখন এসেছিলাম তখন কয় টাকা পেতো ফুটবলাররা? এখন ৫০-৬০ লাখ টাকা পায়। লিগ হচ্ছে ৬টি জেলায়। আপনারা যত কিছুই বলেন, এগুলোই ডেভেলপমেন্ট। খেলোয়াড়রা বিদেশে ক্যাম্প করে। আমরা খেলতে গেছি একদিন আগে। এখন ১০ দিন আগে যায়, পাঁচ তারকা হোটেলে থাকে। সুতরাং মানসিকতা বদলাচ্ছে। ফুটবল একটা খেলা, যা ২১১ টি দেশ খেলে। ২১১টি দেশেরই এক নম্বর খেলা। সুতরাং এখানে সময়, পরিকল্পনা ও টাকার দরকার’- বলেন কাজী মো. সালাউদ্দিন।

দেশের ফুটবলে পাইপলাইনে খেলোয়াড় নেই- অনেকের এমন অভিযোগ মানতে নারাজ বাফুফে সভাপতি, ‘পাইপ লাইনে খেলোয়াড় নেই- এমন অভিযোগ আমি মানতে রাজী নই। আমরা যখন এসেছিলাম তখন আর এখন যদি তুলনা করেন, দেখবেন অনেক পরিবর্তন। একাডেমি শুরু হয়ে গেছে। বাংলাদেশ এখন সাউথ এশিয়া অনূর্ধ্ব-১৫ তে চ্যাম্পিয়ন। এটা বাস্তবতা। পাইপলাইনে প্লেয়ার নেই সেটা বললেই তো হবে না। এই খেলোয়াড়গুলো চার বছর পর বেরিয়ে আসবে। আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমি শেখ কামালের সঙ্গেও কাজ করেছি। তার ভিশন কি ছিল তাও আমি জানি। তবে এটা ঠিক, কামাল থাকলে আমরা ২৪ ঘন্টা সাপোর্ট পেতাম। এখন যে সরকার আছে, মন্ত্রী বলেন প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের যথেষ্ট সাপোর্ট দেন। কিন্তু বিশ্বে লড়তে গেলে আরো সাপোর্ট দরকার। আজকের পৃথিবীতে একটা প্লেয়ারের দাম হয়ে গেছে ২ হাজার কোটি টাকা। বেতন হয়ে গেছে সপ্তাহে ৩/৪ কোটি টাকা। এটা নিয়ে ফাইট করতে গেলে আপনাকে সে ধরণের সপোর্টই লাগবে। আশা করি, আমরা যে রাস্তায় আছি হয়ে যাবে।’

খেলাধুলা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর অনুপ্রেরণার একটি উদাহরণ টেনে বাফুফে সভাপতি কাজী মো. সালাউদ্দিন বলেন, ‘আমরা কলকাতায় আইএফএ শিল্ড খেলতে গিয়েছিলাম। সেমিফাইনালেও খেলছিলাম। বঙ্গবন্ধু ফোন করে কামালকে বলেছিলেন, তোরা যদি জিতিস, যদি চ্যাম্পিয়ন হতে পারিস, আমি বিমান পাঠিয়ে তোদের নিয়ে আসবো। আমি নিজে বিমান বন্দরে অভ্যার্থণা জানাবো। এর চেয়ে বড় আর কি অনুপ্রেরণা থাকতে পারে?’

আরআই/আইএইচএস/এমকেএইচ

আপনার মতামত লিখুন :