সহায়তার টাকাও দেখে যেতে পারেননি ফুটবলার শামীম

বিশেষ সংবাদদাতা
বিশেষ সংবাদদাতা বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ১০:৪৫ এএম, ১১ আগস্ট ২০২০

অনেক স্বপ্ন নিয়ে ফুটবলকে ভালোবেসেছিলেন মোহাম্মদ শামীম রেজা। ঘরোয়া ফুটবলে বড় কোনো ক্লাবে না খেলেই বাফুফের বয়সভিত্তিক দলের কোচদের নজরে পড়েছিলেন। এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ দলে খেলেছিলেন। পরে জায়গা করে নিয়েছিলেন অনূর্ধ্ব-১৯ যুব দলের ক্যাম্পেও।

জাতীয় দলের খেলার স্বপ্নপূরণের সঠিক পথ ধরেই এগুচ্ছিলেন পাবনার এই গোলরক্ষক। কিন্তু তার স্বপ্ন থামিয়ে দেয় টাইফয়েড নামক এক অসুখ। কেবল ফুটবল থেকেই দুরে ঠেলে দেয়নি তাকে, পৃথিবী থেকেই ছিনিয়ে নিয়ে গেছে তাকে।

১৯৯৮ সালে নেপালের বীরগঞ্জে এএফসি অনুর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপের বাছাই পর্ব খেলেছিলেন শামীম রেজা। ফিরোজ মাহমুদ টিটো, রোকনুজ্জামান কাঞ্চন, মাসুদ খান জনিদের সঙ্গে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আনন্দও করেছিলেন হিমালয়ের দেশের মাটিতে। জুনিয়র দলের হয়ে লাল-সবুজ জার্সি গায়ে জড়ানোর পর তার চোখ ছিল জাতীয় দলের জার্সি গায়ে।

দুয়ে দুয়ে চার মিলিয়ে এগুচ্ছিলেন শামীম রেজা। অনূর্ধ্ব-১৬ দলে খেলার পর পেয়েছিলেন অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ক্যাম্পে ডাক। কিন্তু হঠাৎই সব স্বপ্ন শেষ। ঈদের ছুটিতে যাত্রাবাড়ির বাসায় ফেরার পর টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে আর ক্যাম্পে যোগ দেয়া হয়নি শামীম রেজার। এমন কি ফুটবল থেকেও দূরে থাকতে হয়েছিল তাকে।

টাইফয়েডের পর লিভারে সমস্যা হয়। অসুস্থ হয়ে বাসাতেই ছিলেন। কিছুদিন আগে অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে তাকে ভর্তি করা হয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালে। কিন্তু বাঁচানো যায়নি যুবদলের হয়ে গোলপোস্ট আগলানো শামীম রেজাকে। ২৫ দিন নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকার পর গত ৫ আগস্ট পৃথিবী ছেড়ে চলে যান শামীম।

বাসাবো তরুণ সংঘ, বাংলাদেশ বয়েজ ক্লাব ও আরমবাগ ক্রীড়া সংঘের হয়ে ঘরোয়া ফুটবল তৃতীয় বিভাগ, দ্বিতীয় বিভাগ ও প্রথম বিভাগে খেলেছেন। শামীম অসুস্থ, হাসপাতালে ভর্তি। চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছিল তার পরিবার। এমন খবর পাওয়ার পর সহায়তার হাত বাড়িয়েছিলেন কেউ কেউ।

বাংলাদেশ বয়েজ ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হাজী মো. রমজান বলেন, ‘শামীমদের পরিবারের অবস্থা মোটেও ভালো না। নারায়নগঞ্জের সাইবোর্ডে ওদের একটি বাড়ি ছিল। সেটা বিক্রি করে দিয়ে মাকে নিয়ে ভাড়া থাকত গোপীবাগে। ওর বড় ভাই থাকেন সাইনবোর্ডে একটি ভাড়া বাড়িতে। শামীমের মৃত্যুর পর তার মা এখন বড় ছেলের কাছে থাকছেন। হাসপাতালে ভর্তির পর বাংলাদেশ ফুটবল ক্লাব সমিতির সভাপতি তরফদার মো. রুহুল আমিন ২০ হাজার, ব্রাদার্স ইউনিয়নের ফুটবল ম্যানেজার আমের খান ১০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। আমের খান তার বন্ধু-বান্ধবদের কাছ থেকেও ১৭-১৮ হাজার টাকা এনে দিয়েছিলেন।’

শামীমকে আর্থিকভাবে সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছিলেন বাফুফের গ্রাসরুট ম্যানেজার হাসান মাহমুদ। বন্ধুবান্ধব মিলে ২০ হাজার ৫০০ টাকার ব্যবস্থা করেছিলেন। সেই সঙ্গে বাফুফের সদস্য সিলেটের মাহিউদ্দিন আহমেদ সেলিম দিয়েছিলেন ১০ হাজার টাকা। এই টাকা হাসপাতালে গিয়ে পৌঁছে দেয়ার কথা ছিল ৬ আগস্ট। কিন্তু তার আগেই মারা যান শামীম রেজা। শামীমের মৃত্যুর পর এই ৩০ হাজার ৫০০ টাকা গোপীবাগে তার মায়ের হাতে তুলে দিয়ে আসেন বাফুফের গ্রাসরুট ম্যানেজার হাসান মাহমুদ।

শামীম রেজার বড় ভাই আবু সাঈদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাবাকে হারিয়েছি আগেই। মাকে নিয়ে আমরা ছিলাম। এক বছর আগে আমার মেজো ভাই মারা গেছে। তার আগে আমার বড় বোনও মারা গেছেন। ছোট ভাইটাকেও বাঁচাতে পারলাম না।’

শামীমের বড় ভাই গাজীপুরে একটি কারখানায় দর্জির কাজ করেন। সপ্তাহে একদিন সাইনবোর্ডে আসেন। ভাইয়ের চিকিৎসায় টাকা-পয়সা খরচ হওয়ায় এখন চোখেমুখে অন্ধকার দেখছেন। তাও সান্ত্বনা পেতেন যদি ভাইকে সুস্থ করে বাসায় নিতে পারতেন। কিন্তু ভাইকে নয়, তাকে বাসায় নিতে হয়েছে ভাইয়ের লাশ। আর যারা সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিলেন সেই টাকাটাও দেখে যেতে পারেননি শামীম। লাল-সবুজ জুনিয়র দলের হয়ে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করা ফুটবলারের অকাল মৃত্যুতে ব্যথিত তার সতীর্থদের হৃদয়।

আরআই/এসএএস/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।