লিগ বন্ধে হতাশা-ক্ষোভ

‘মনে হচ্ছে ক্রিকেটার হওয়া ভুল হয়েছে, চাকরি করলেই ভালো হতো’

সৌরভ কুমার দাস
সৌরভ কুমার দাস সৌরভ কুমার দাস , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪:১৮ পিএম, ০৩ এপ্রিল ২০২৬

গত বছরের ৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় বিসিবির সবশেষ নির্বাচন। তবে স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান একাধিক প্রার্থী। এরপর নির্বাচন হলেও নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে তখন থেকেই ঘরোয়া লিগ বয়কট করে আসছে ঢাকার শীর্ষ ক্লাবগুলো। যে অবস্থা এখনো অপরিবর্তিত।

প্রথম, দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেট দায়সারা হলেও আসন্ন প্রিমিয়ার লিগ ও তৃতীয় বিভাগ ক্রিকেট আয়োজন নিয়ে রয়েছে বড়সড় অনিশ্চয়তা। ঘরোয়া ক্রিকেটারদের আয়ের অন্যতম উৎস প্রিমিয়ার লিগ। এই টুর্নামেন্ট মাঠে গড়ানো নিয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় ক্রিকেটারদের মধ্যে বাড়ছে অস্থিরতা ও ক্ষোভ।

সামাজিক যোগাগোগমাধ্যমে কয়েকদিন ধরেই ক্রিকেটাররা প্রিমিয়ার লিগ নিয়ে পোস্ট দিচ্ছেন। সরাসরি ক্ষোভ না ঝাড়লেও তাদের স্ট্যাটাসে স্পষ্ট, কতটা হতাশ ও ক্ষুব্ধ তারা। ব্যাটার জাকের আলি আক্ষেপ প্রকাশ করে স্ট্যাটাস দিয়েছেন, ‘আগে আমরা ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ (ডিপিএল)খেলতাম।’ এর সঙ্গে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে খেলার সময়ে তার কিছু ছবিও দিয়েছেন পোস্টে।

লিগ নিয়ে এই অনিশ্চয়তায় ক্রিকেটাররাও মানসিকভাবে অস্থির সময় কাটাচ্ছেন। জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপকালে ঘরোয়া ক্রিকেটের পরিচিত মুখ আবু হায়দার রনি শুনিয়েছেন তার মানসিক অবস্থার কথা। তিনি বলেন, ‘মানসিক অবস্থা তো ভালো না। বসে আছি বেকার বাসায়। কোনো খেলা নাই, কোনো প্র্যাকটিস নাই। ক্রিকেটার হিসেবে এখন কী বলব, এই প্রফেশনটাতে আসা মনে হয় ভুল হয়েছে—এখন এটা মনে হচ্ছে আরকি!’

বিপিএল এবং লিগের অব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ ঝেরে এই পেসার বলেন, ‘আমাদের তো অন্য কোনো কাজ নাই, আমাদের তো এটাই কাজ। বিপিএল হাতে গোনা কয়েকজন খেলে, তাও টাকা-পয়সা পায় না। আর বিপিএলের এখনকার যে খেলার ধরন, মাশাআল্লাহ!’

চুক্তিবদ্ধ টাকা না পাওয়া এবং আইনি প্রতিকারহীনতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রিমিয়ার লিগ নিয়ে গত তিন বছরে যে পরিমাণ টাকা-পয়সা দিচ্ছে ক্লাব অফিশিয়ালরা, সেটা কন্ট্রাক্ট থেকে ৫০ পারসেন্টও দেয় না। না দিলেও আপনি কিছু বলতে পারবেন না, এটার কোনো লিগ্যাল অ্যাকশনে যাওয়ার সুযোগ নাই।’

ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম শঙ্কিত রনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘এখন আমার কাছে মনে হচ্ছে যে ক্রিকেটার না হয়ে যদি পড়াশোনা করে একটা সরকারি চাকরি করতাম বা কিছু একটা চাকরি করতাম, তাহলে মাস শেষে একটা ফিক্সড স্যালারি আসতো। এখন তো আমাদেরটা আনসার্টেইন। আপনি টাকা পাবেন কি পাবেন না, আপনার সংসার চলবে কি চলবে না—এরকম একটা অবস্থা।’

বোর্ড ও ক্লাবগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিয়ে খেলোয়াড়দের অবস্থান পরিষ্কার করে তিনি বলেন, ‘ক্লাব অফিশিয়ালরা বা ক্রিকেট বোর্ডের সাথে কী সম্পর্ক এটা দেখার থেকে আমাদের বড় কথা হচ্ছে-আমরা ক্রিকেটার, আমরা মাঠের খেলাটা মাঠে খেলতে চাই। কন্ট্রোভার্সি, তারপর যত ঝামেলা আছে এগুলা উনাদের টেক কেয়ার করা উচিত।’

ঘরোয়া লিগের আরেক ক্রিকেটারও জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপকালে হতাশা প্রকাশ করেছেন। যদিও নাম প্রকাশ করতে চাননি তিনি। লিগ শুরু হওয়া নিয়ে ক্রিকেটারদের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘প্লেয়ার যারা আছে, খেলার জন্য সবাই অস্থির হয়ে আছে। কিন্তু খেলা নেই। এটা তো দুঃখজনক অবশ্যই।’

ক্রিকেটারদের রুটি-রুজির প্রধান উৎস এই লিগ। খেলা না থাকলে এর প্রভাব যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটা প্লেয়ারদের ওপর... প্লেয়ারদের খেলা না থাকলে তাদের ফ্যামিলির ওপর প্রেশারটা পড়ে। এই ফ্যামিলির প্রেশারটাই হলো সবচেয়ে বড়। কারণ এই টাকা দিয়েই তো ফ্যামিলি চলে। তারা একটা প্ল্যান করতে পারে। কারণ এই খেলাটা না হলে প্রেশারটা কিন্তু শুধু এক জায়গায় না, অনেক জায়গায় এসে পড়ে। তারা অনেক কিছু প্ল্যান করতে পারে না।’

লিগ না হলে ক্রিকেটারদের ক্যারিয়ার হুমকির মুখে পড়বে উল্লেখ করে তিনি জানান, ‘না হলে আরকি এটা আমাদের জন্য তো বড় ক্ষতি হবেই। কারণ যদি এখন প্রিমিয়ার লিগ না হয়, এর পরে তো আর কোনো খেলা নাই। শুধু ন্যাশনাল টিমের খেলা থাকে। তো ন্যাশনাল টিমের বাইরে যে প্লেয়ারগুলো আছে এই হিউজ প্লেয়ার তারা কী করবে? এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যাবে।’

ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ আয়োজন নিয়ে ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াব অবশ্য শুরু থেকেই সোচ্চার। সংগঠনটি ইতিমধ্যে বিসিবি ও সিসিডিএম বরাবর চিঠিও দিয়েছে। ক্রিকেটাররাও নানা সময়ে বলেছেন এই টুর্নামেন্টটি মাঠে গড়ানো কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এতকিছুর মধ্যেও বিসিবি নিজেদের দিক থেকে ক্লাবগুলোর উপর দায় চাপাতেই ব্যস্ত। যদিও তারা আগামী ৮ এপ্রিল প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলোকে মিটিংয়ের জন্য চিঠি দিয়েছে। তবে ক্লাবগুলো সেই মিটিংয়ে যাবে না, এমনটাই সূত্রের খবর।

মূলত গত নির্বাচন কেন্দ্র করেই গত ৬ মাস ধরে ক্লাব ও বিসিবি মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে এরই মধ্যে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে তদন্তের দাবিতে চিঠিও দিয়েছেন ক্লাব ও বিভাগীয় ক্লাউন্সিলররা। ক্রীড়া পরিষদ এ নিয়ে তদন্ত কমিটিও গঠন করেছে। তার বিরুদ্ধে বিবৃতি দিয়েও সমালোচনার মুখে পড়েছে বিসিবি। সবমিলিয়ে দেশের ঘরোয়া ক্রিকেট ও ক্রিকেটাররা পড়েছেন বিপাকে।

এসকেডি/এমএমআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।