যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে, কে হবেন নতুন মন্ত্রী?
বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। অনিবার্যভাবে প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও আপসহীন নেত্রী তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বড় সন্তান তারেক রহমান। আগামী মঙ্গলবার তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি।
কে কোন মন্ত্রণালয় পাবেন, কে প্রেসিডেন্ট হবেন, নতুন স্পিকার কাকে করা হবে এসব নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা। ক্রীড়াঙ্গনের মানুষ যারা, তাদের চোখ ক্রীড়ামন্ত্রীর দিকে। কে হতে যাচ্ছেন নতুন ক্রীড়ামন্ত্রী? কাকে করা হবে যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী? সবার জানা, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় প্রায় এক সুতোয় গাঁথা। বাংলাদেশের বিগত সংসদ নির্বাচনের পর যতগুলো সরকার দায়িত্ব নিয়েছে, প্রায় সব সরকারের আমলেই একই ব্যক্তি বা একজন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন।
তার মানে ধরেই নেয়া যায় নতুন সরকারের যিনি ক্রীড়ামন্ত্রী হবেন তিনিই যুব মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও থাকবেন। এখন কে হতে পারেন বিএনপির নতুন সরকারের যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী? তা নিয়েও নানা হিসেব-নিকাশ, জল্পনা-কল্পনা। ক্রীড়ামোদীদের একটা বড় অংশের ধারণা ছিল জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক এবং দেশবরেণ্য সাবেক ফুটবল তারকা আমিনুল হক হতে পারেন ক্রীড়ামন্ত্রী বা তার কাঁধেই ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হতে পারে।
আওয়ামী লীগের শাসনামলে বারবার কারাবন্দী ছিলেন তিনি, সংগ্রাম এবং দুর্বার প্রতিরোধ আন্দোলনে সক্রিয় সৈনিক আমিনুল হক রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং বিএনপির প্রতি তার সর্বোচ্চ নিবেদন প্রদর্শন করে বিএনপির নীতিনির্ধারক মহলে আস্থাভাজন হয়ে উঠেছিলেন। এবং যেহেতু তার স্পোর্টস ব্যাকগ্রাউন্ড আছে, জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক এবং একজন দক্ষ ফুটবলার, সর্বোপরি ক্রীড়াঙ্গনের পরিচিত মুখ, ঢাকা তথা দেশের ক্রীড়াঙ্গনের অনেকের সঙ্গেই তার ব্যক্তিগত পর্যায়ের সখ্য আছে, তার ক্রীড়াবোধ, ক্রীড়াপ্রেম যথেষ্ট, সেই বিবেচনায় আমিনুলই ছিলেন প্রথম পছন্দ।
কিন্তু শেষ খবর, আমিনুল হক সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারেননি। বিএনপির ২১৩ জন বিজয়ী প্রার্থীর তালিকায় আমিনুল হকের নাম নেই। কাজেই সংসদ নির্বাচনে জিততে না পারা আমিনুল হককে শেষ পর্যন্ত যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে দেখা যাবে কিনা তা নিয়ে জোর সংশয় দেখা দিয়েছে। আবারও বলা আপাদমস্তক খেলা অনুরাগী আমিনুল হক হতে পারেন প্রয়াত সাবেক বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকার পর ঢাকাই ফুটবলের অন্যতম জনপ্রিয় ফুটবল ব্যক্তিত্ব ক্রীড়ামন্ত্রী।
কিন্তু যেহেতু তিনি সংসদ নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন, তাই তাকে নতুন মন্ত্রণালয়ের সদস্য করা হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। যদিও প্রশ্ন উঠেছে টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে আমিনুল হককে স্পোর্টসে দায়িত্ব দেয়ার কথা ভাবতে পারেন বিএনপির নতুন চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। তারপরেও আমিনুল হকের ক্রীড়ামন্ত্রী হওয়া নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
বরঞ্চ আমিনুলকে পাশ কাটিয়ে কয়েকটি নাম উঠে আসছে। তার মধ্যে একটা অভিনব ব্যাপার হচ্ছে সম্ভাব্য ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে দুটি ক্যাটাগরি আছে। একটা ক্যাটাগরিতে তিনজন সত্তোরোর্ধ্ব ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব আছেন। আছেন মনিরুল হক চৌধুরী, আলি আজগর লবি এবং নিতাই চন্দ্র রায়। মনিরুল হক চৌধুরী বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের অত্যন্ত পরিচিত মুখ। একসময়ের তুখোড় ছাত্রনেতা, অবিভক্ত ছাত্রলীগের শেষ সভাপতি, পরবর্তীতে বিএনপি ও জাতীয় পার্টির এমপি হওয়া মনিরুল চৌধুরী জীবনের বড় সময় ঢাকা মোহামেডানের মত দেশবরেণ্য ক্রীড়া শক্তির অন্যতম শীর্ষকর্তা হিসেবে ৭০, ৮০ এবং ৯০ দশকের প্রায় পুরো সময় নিয়োজিত ছিলেন। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সাবেক সহ-সভাপতি ছিলেন। ছিলেন ঢাকা মেট্রোপলিটন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন দামফার সভাপতিও।
দায়িত্ব পালন করেছেন মোহামেডানের গভর্নিং বডির সদস্য সচিবেরও। বিভিন্ন সময় মোহামেডানের অন্যতম শীর্ষকর্তা হিসেবে পরিগণিত ছিলেন। এদেশের ক্রীড়াঙ্গনে মনিরুল চৌধুরী প্রতিষ্ঠিত নাম, পরিচিত মুখ। এবং বর্তমান প্রজন্মের প্রায় প্রতিষ্ঠিত ক্রিকেট, ফুটবল, হকি সহ বিভিন্ন ক্রীড়াবিদ, সংগঠক সবাই প্রায় তার বয়সে ছোট এবং তার চোখের সামনেই প্রায় তারা পরিণত হয়েছেন। কাজেই মনিরুল হক চৌধুরী ক্রীড়া অঙ্গনকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখেন এবং তার ক্রীড়া প্রেম, ক্রীড়াবোধ যথেষ্ট। তিনি ক্রীড়া মন্ত্রণালয় চালানোর যথেষ্ট দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতাও দেখাতে পারবেন। সেই বিবেচনায় মনিরুল চৌধুরীকে পিছিয়ে রাখা যায় না।
মনিরুল চৌধুরী পর পরই আরেকটি নাম উঠে আসছে তিনি হচ্ছেন বিএনপির আরেক নেতা খুলনা থেকে বিজয়ী হয়ে আসা আলি আজগর লবি। যিনি এর আগে ২০০১ থেকে ২০০৬ খুলনার সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি পদে ছিলেন এবং দক্ষতার সঙ্গে, নিষ্ঠার সঙ্গে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড পরিচালনা করেছেন এবং ব্যক্তিগতভাবে তার দক্ষতা এবং সততা নিয়ে কোন বিতর্ক ওঠেনি। এবং একজন সৎ, নিষ্ঠাবান বোর্ড প্রধান হিসেবেই তাকে পরিগণিত করা হয় এবং তার বিরুদ্ধে সে অর্থে কোন ধরনের কোন অপবাদ বা কোন বিতর্ক নেই। কাজেই ব্যক্তিজীবনে খুব হাসিখুশি, বিনয়ী ভদ্রলোক আলিয়াজগর লবিকেও কিন্তু ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে দেখা যেতে পারে। পাশাপাশি আরেক বর্ষীয়ান নেতা নিতাই চন্দ্র রায়ের কথাও শোনা যাচ্ছে।
কিন্তু বিপরীত একটি ধারাও প্রবাহমান। ধারণা করা হচ্ছে তারেক রহমান তার মন্ত্রণালয়ে প্রবীণের সঙ্গে নবীনের সমন্বয় ঘটাতে পারেন। এবং ১৭ বছর পর সরকার পরিচালনা করতে এসে একটি দক্ষ এবং গতিশীল মন্ত্রণালয় তৈরি করতে গিয়ে তিনি বিএনপির পরীক্ষিত, অভিজ্ঞ ও ঝানু নেতৃবৃন্দের সঙ্গে তারুণ্যের সমন্বয় ঘটানোর চেষ্টা করতে পারেন এমন কথাও শোনা যাচ্ছে। সেদিক থেকে তরুণ কেউ যদি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। সেই ক্ষেত্রে কিছু নাম উঠে আসছে। বিএনপির প্রয়াত নেতা একসময়ের প্রায় জাতীয় নেতার মর্যাদায় থাকা তরিকুল ইসলাম মিয়ার ছেলে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত যশোরে বিএনপির একমাত্র নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ঢাকার বাইরে থেকে ক্রীড়ামন্ত্রী হবার নজির আছে অনেক। আহাদ আলী সরকার, বীরেন শিকদার, ফজলুর রহমান পটল তারা সবাই কিন্তু ঢাকার বাইরের সাংসদ। কাজেই প্রয়াত বিএনপি নেতা তরিকুল ইসলামের ছেলে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত যদি ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান সেটাতেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। পাশাপাশি বিএনপির সাবেক নেতা এবং হাসিনা সরকারের সময় ফাঁসিতে মৃত্যু হওয়া তুখোড় পার্লামেন্টারিয়ান এবং চট্টগ্রামের রাউজানের জাদরেল রাজনীতিবিদ সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরীও নাকি বিবেচনায় আছেন। পাশাপাশি পাশাপাশি বিএনপির সাবেক অন্যতম শীর্ষনেতা, ঢাকার সাবেক সফল মেয়র এবং ৯১ সালে বিএনপি সরকারের যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা প্রয়াত নেতা সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনেরও কথা শোনা যাচ্ছে সম্ভাব্য ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রি হিসেবে।
এদের বাইরে ৯০ এর আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে এবং ৯০ এর ছাত্রজনতার আন্দোলনের অন্যতম কন্ঠস্বর খায়রুল কবির খোকন, শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি তাদের নামও বলছেন কেউ কেউ। শেষ পর্যন্ত তারেক রহমান ও বিএনপির শীর্ষ নেতারা প্রতিষ্ঠিত ও অভিজ্ঞ কাউকে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেবেন নাকি তরুণদের মধ্য থেকে কাউকে বেছে নিবেন সেটাই দেখার বিষয়।
এআরবি/আইএন