২০১৪ : আবারও ব্রাজিল, আবারও ট্র্যাজেডি

ইমাম হোসাইন সোহেল
ইমাম হোসাইন সোহেল ইমাম হোসাইন সোহেল , স্পোর্টস এডিটর
প্রকাশিত: ০৬:৪৪ পিএম, ১২ জুন ২০১৮

ব্রাজিল বিশ্বকাপের আয়োজক মানেই কী তাহলে এক একটা ট্র্যাজেডির নাম? প্রশ্ন জাগাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। ৬৪ বছরের ব্যবধানে দুটি বিশ্বকাপের আয়োজন করে ইতিহাসের অন্যতম বড় দুটি ট্র্যাজেডিরই জন্ম দিয়েছে ব্রাজিলিয়ানরা। যদিও ১৯৫০ সালের ট্র্যাজেডিটা ধারে ও ভারে ছিল অনেক বড়। ২০১৪ সালের ট্র্যাজেডির সঙ্গে জড়িয়েছে পুরো লাতিন আমেরিকাই। ব্রাজিলের সঙ্গে জড়িয়েছে আর্জেন্টিনার নামও।

১৯৭৮ সালের পর লাতিন আমেরিকার কোনো দেশ আর বিশ্বকাপের আয়োজক হতে পারেনি। অবশেষে ৩৬ বছর বিরতি দিয়ে লাতিন আমেরিকায় ফিরে এলো বিশ্বকাপ। আয়োজক ব্রাজিল। ১৯৫০ সালের পর আবারও বিশ্বকাপের স্বাগতিক তারা। ১৯৫০-এর পর সর্বোচ্চ ৫ বার বিশ্বকাপের শিরোপা ঘরে তুলে নিয়েছে তারা। ঘরের মাঠে হেক্সা মিশন। ৫০-এর ট্র্যাজেডি ভুলে নতুন ইতিহাস রচনা করতে চায় তারা।

jagonews24

বিশ্বকাপের ২০তম আসর। ১৯৩০ সাল থেকে শুরু হওয়ার পর ব্রাজিল ২০তম আসর আয়োজনের দায়িত্ব পায়। ২০০৩ সালেই ফিফা ঘোষণা করে, ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে লাতিন আমেরিকায়। রোটেশন নীতির কারণে ইউরোপ, এশিয়া এবং আফ্রিকার পর বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব লাতিন আমেরিকার ওপর।

যে কারণে বিশ্বকাপের আয়োজক হতে বিড করে কলম্বিয়া এবং ব্রাজিল। পরে কলম্বিয়া নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নেয়ায়, ২০০৭ সালে ফিফা অটোমেটিক্যালি ব্রাজিলকেই স্বাগতিক ঘোষণা করে। নিজেদের দেশে বিশ্বকাপ, ব্রাজিলিয়ানরাও আঁট-ঘাট বেধে মাঠে নামে, বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্যে। ২০০২ বিশ্বকাপজয়ী কোচ লুই ফেলিপে স্কলারিকে আবারও নিয়ে আসা হয় ব্রাজিল দলে। নেইমার, অস্কারদের নিয়ে শক্তিশালী দলই গড়ে তোলা হয়। যারা আগের বছরই স্পেনের মতো দলকে ফাইনালে হারিয়ে জিতে নিয়েছিল ফিফা কনফেডারেশন্স কাপের শিরোপা।

jagonews24

বিশ্বকাপ নিয়ে এত প্রস্তুতি। সবকিছু এগুচ্ছিল ভালোভাবেই। গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ড, এরপর কোয়ার্টার ফাইনাল। ব্রাজিল সব বাধা পেরিয়ে এলো অনায়াসেই। তবে, দ্বিতীয় রাউন্ড এবং কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলিয়ানদের সামনে পড়লো লাতিনেরই আরও শক্তিশালী দুটি দেশ, চিলি এবং কলম্বিয়া। চিলিকে পার হতে টাইব্রেকারে যেতে হয়েছিল। কলম্বিয়ার বিপক্ষে সব কিছু ঠিকঠাকভাবেই এগুচ্ছিল। কিন্তু ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে ব্রাজিলের স্বপ্ন সারথি, নেইমারের কোমার ভেঙে দিলেন কলম্বিয়ান ডিফেন্ডার জুনিগা। দেখে মনে হচ্ছিল, ব্যক্তিগত কোনো ক্ষোভ চরিতার্থ করতেই ইচ্ছে করে এমন কাণ্ড ঘটিয়েছেন তিনি। একেবারে হাঁটু দিয়ে চাপ দিয়ে কোমরটা ভাঙা হলো।

নেইমারকে সোজা নেয়া হলো হাসপাতালে। জানা গেলো কোমরের হাঁড়ে চিড় ধরা পড়েছে। বিশ্বকাপই খেলতে পারবেন না আর। এক নেইমারের ইনজুরিই কাঁদিয়ে ছাড়লো পুরো ব্রাজিলকে। হাসপাতালের সামনে সারারাত বসে বসে কেঁদেছেন সমর্থকরা। আবেগে ভেঙে পড়ার মত অবস্থা। যেটা পুরোপুরি ভর করেছে ব্রাজিল দলের বাকি খেলোয়াড়দের ওপরও। সেমিফাইনালে জার্মানির মুখোমুখি হওয়ার আগে নেইমারের শূন্যতা বিরাজ করছিল ব্রাজিলের প্রতিটি খেলোয়াড়ের চোখে-মুখে।

jagonews24

শুধু নেইমারই নয়, জার্মানির বিপক্ষে ওই ম্যাচে খেলতে পারেননি দলের নিয়মিত অধিনায়ক এবং সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার থিয়াগো সিলভা। নেইমারের চেয়েও সিলভার দলে না থাকাটা ছিল সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক। সব মিলিয়ে একটি দুঃখ-ভারাক্রান্ত ব্রাজিল দল নেমেছিল জার্মানির বিপক্ষে সেমিফাইনাল খেলতে। আর এই দলটিকে নিয়েই ছেলেখেলা করলো জার্মানি। ৭ বার বল জড়ালো তারা ব্রাজিলের জালে। বিপরীতে একটি হজম করলো।

বেলো হরাইজন্তের এস্টাডিও মিনেইরোয় ৭-১ ব্যবধানে জার্মানির কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল ব্রাজিলকে। ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে বড় লজ্জা। এত বড় ব্যবধানে এর আগে আর কখনও হারেনি ব্রাজিল। লজ্জার পরাজয় নিয়ে নিজের দেশের মাটি থেকেই বিদায় নিতে হয়েছিল স্বাগতিকদের। ৬৪ বছর আগে মারাকানায় যে ট্র্যাজেডি রচিত হয়েছিল, ৬৪ বছর পর মিনেইরোয় একই ট্র্যাজেডি রচিত হলো। মারাকানাজ্জোর পর তৈরি হয়ে গেলো মিনেইরোজ্জো ট্র্যাজেডি।

ব্রাজিলের ট্র্যাজেডির সঙ্গে যোগ হয়ে গিয়েছিল আর্জেন্টিনার ট্র্যাজেডিও। টানা ৫ বারের বিশ্বসেরা লিওনেল মেসির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য একটি বিশ্বকাপ প্রয়োজন। নিজ মহাদেশে সেই অধরা স্বপ্নটার কাছাকাছি চলে গিয়েছিল আর্জেন্টিনা। দলকে তিনি তুলে এনেছিলেন বিশ্বকাপের ফাইনালে।

jagonews24

কিন্তু সেই জার্মানির মুখোমুখিই হতে হলো তাদের। আগের দুই বিশ্বকাপে যাদের মুখোমুখি হয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল আর্জেন্টিনাকে। সেই জার্মানি এবার ফাইনালে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি। মেসির নিজেকে সর্বকালের সেরা হিসেবে প্রমাণ করার সবচেয়ে বড় মঞ্চ; কিন্তু রিও ডি জেনিরোর বিখ্যাত মারাকানা স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনাকে চরম হতাশ করলো জার্মানি।

নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষ হয় কোনো গোল ছাড়াই। শেষে খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। শেষ পর্যন্ত ১১৩ মিনিটে মারিও গোৎসের অসাধারণ এক গোলে বাজিমাত করে জার্মানি। ১৯৯০ সালের পর আবারও বিশ্বকাপের শিরোপা ঘরে তুলে নেয় জার্মানরা। তাদের এই ট্রফি জয়ের সবচেয়ে বড় মাহাত্ম্য হলো, ১৯৯০ সালে দুই জার্মানি এক হওয়ার পর এটাই তাদের প্রথম শিরোপা।

বিশ্বকাপের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মেসির ছবিটা আইকনিক হয়ে উঠেছিল পরবর্তী সময়ে। কারণ, বিশ্বসেরা তারকার এভাবে বিশ্বকাপের ট্রফির পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া, অথচ ট্রফিটাকে ছোঁয়ার একটুও সুযোগ নেই। এটা যে কতটা কষ্টকর! যদিও টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় গোল্ডেন বলের পুরস্কার উঠেছিল মেসির হাতেই। কলম্বিয়ান তারকা হামেশ রদ্রিগেজ টুর্নামেন্টের সেরা উদীয়মান ফুটবলারের পাশাপাশি সর্বোচ্চ গোলদাতা গোল্ডেন বুটের পুরস্কারও জেতেন।

জার্মানিই প্রথম কোনো দেশ, যারা লাতিন আমেরিকা থেকে বিশ্বকাপ জয় করে এলো। এর আগে লাতিন আমেরিকায় অনুষ্ঠিত হওয়া চারটি বিশ্বকাপেরই শিরোপা নিজ মহাদেশের বাইরে যেতে দেয়নি লাতিনরা। এবার আর ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনা- কেউ পারেনি জার্মানিকে থামাতে। আবার একই মহামেদেশ থেকে এই প্রথম টানা তিনটি বিশ্বকাপ জয় করলো ইউরোপীয়রা। ২০০৬ সালে ইতালি, ২০১০ সালে স্পেনের পর ২০১৪ সালে জার্মানি।

 

আগের বিশ্বকাপে যেমন গ্রুপ পর্ব থেকেই ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ইতালির বিদায় ঘটেছিল, ২০১৪ সালেও একইভাবে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় ঘটলো ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন স্পেনের। সবচেয়ে মজার বিষয়, যে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে ২০১০ বিশ্বকাপের শিরোপা জয় করেছিল স্প্যানিশরা, ২০১৪ সালের গ্রুপ পর্বে সেই নেদারল্যান্ডসেরই মুখোমুখি হলো তারা। ডাচদের কাছে প্রথম ম্যাচেই ৫-১ গোলে বিধ্বস্ত হলো স্প্যানিশরা। এই পরাজয়ের মধ্য দিয়েই স্প্যানিশদের বিখ্যাত তিকি-তাকার সমাপ্তি ঘটে গেছে বলে অনেকের ধারনা। ফেবারিটদের মধ্যে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয় ইতালি, ইংল্যান্ড।

ব্রাজিল বিশ্বকাপের ফাইনালেই বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম গোল লাইন টেকনোলজি ব্যবহার করা হয়। শুধু তাই নয়, পেনাল্টি কিংবা ফ্রি কিক নেয়ার সময় যে ভ্যানিসিং স্প্রে করা হয়, তারও প্রথম ব্যবহার হয় ব্রাজিল বিশ্বকাপের ফাইনাল থেকে। এবারই প্রথম ফিফা ফ্যান ফেস্টের আয়োজন করা হয় ব্রাজিলে এবং বিভিন্ন শহরে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ অংশ নেয় ফ্যান ফেস্টে। বিশ্বকাপের সময় ব্রাজিলে আগমণ ঘটে ১ কোটি বিদেশি দর্শক-সমর্থকের।

প্রচণ্ড গরমের কারণে, ব্রাজিল বিশ্বকাপেই কুলিং ব্রেক-এর নিয়ম চালু করা হয়। খেলার ৩০ মিনিট পর প্রচণ্ড গরমের কারণে রেফারি চাইলে কুলিং ব্রেক দিতে পারতেন। এমনকি দ্বিতীয় রাউন্ডে ফোর্তালেজার এস্টাডিও কাস্টেলাওয়ে মেক্সিকো এবং নেদারল্যান্ডসের মধ্যকার ম্যাচের ৩২ মিনিটের সময় প্রথম কুলিং ব্রেকের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন রেফারি। ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা উঠেছিল ওই ম্যাচে।

আইএইচএস/আরআইপি

আপনার মতামত লিখুন :