সত্যিই নেলসনকে টনটনে ফিরিয়ে আনলো টাইগাররা!

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা টনটন, ইংল্যান্ড থেকে
প্রকাশিত: ০২:১০ এএম, ১৮ জুন ২০১৯

স্বপ্ন নয় সত্যি। নিউজিল্যান্ডের নেলসন ফিরে এলো ইংল্যান্ডের টনটনে। ২০১৫ সালের ৫ মার্চের পর ২০১৯ সালের ১৭ জুন নিজেদের ছাড়িয়ে আরেক রেকর্ড গড়ে অবিস্মরণীয় জয় বাংলাদেশের।

চার বছর আগে নিউজিল্যান্ডের নেলসনে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপে ৩১৮ রান টপকে ৬ উইকেটের অবিস্মরণীয় জয় পেয়েছিল মাশরাফির দল। বলার অপেক্ষা রাখে না, এতকাল সেটাই ছিল বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ড।

আর আজ তার চেয়েও বেশি রান তাড়া করে ৭ উইকেটের এক ঐতিহাসিক জয়ের স্বাদ পেলো টাইগাররা। আজকের টার্গেটটা ছিল চার বছর আগে স্কটল্যান্ডের চেয়ে ৩ রান বেশি। কিন্তু শুনে হয়তো অবাক হবেন, চার বছর আগে নেলসনে ৩১৮ রানের জবাবে বাংলাদেশ করেছিল ৩২২ রান।

আজ ১৭ জুন সোমবার টনটনের সমারসেট কাউন্টি ক্লাব মাঠেও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টাইগারদের জয়ের টার্গেট ছিল ৩২২। লক্ষ্যের যখন এত মিল ছিল, শেষটায় তা মিলেও গেল। এরচেয়ে কাকতালীয় আর কী হতে পারে!

পার্থক্য একটাই- ২০১৫ সালে জয়ের নায়ক ছিলেন তামিম। আর আজ সাকিব। পার্থক্য আরও আছে। ওই ম্যাচে তামিম ম্যাচ জেতানো ব্যাটিং করেও ঠিক শতরানের দোরগোড়ায় গিয়ে ফিরে এসেছিলেন। ৫ রানের আক্ষেপ ছিল দেশসেরা ওপেনারের। ১০০ বলে ৯৫ রানে আউট হয়ে এসেছিলেন তামিম।

আর আজ সেঞ্চুরি করে অবিস্মরণীয় আর রেকর্ড জয়ের নায়ক সাকিব আল হাসান। ৯৯ বলে অপরাজিত ১২৪ রানের এক অনুপম ইনিংস খেলে দলকে জিতিয়ে রাজ্য বিজয়ীর মতো হাসতে হাসতে সাজঘরে ফিরলেন সাকিব।

২০১৫ সালের ৫ মার্চ নিউজিল্যান্ডের নেলসনে স্কটল্যান্ডের করা ৩১৮ রান টপকে ৬ উইকেটের জয়ে তামিম ছাড়াও আরও অবদান রেখেছিলেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ (৬২ বলে ৬২), মুশফিকুর রহীম (৪২ বলে ৬০), সাকিব (৪১ বলে ৫২) আর সাব্বির রহমান রুম্মন (৪০ বলে ৪২)।

আজ মাহমুদউল্লাহ ব্যাটিংয়েরই সুযোগ পাননি। তামিম দুর্ভাগ্যজনক রান আউটের শিকার হওয়ার আগে পর্যন্ত খেলেছেন ৫৩ বলে ৪৮ রানের সাহসী ও উদ্দীপক ইনিংস। মুশফিকুর রহীম আজ কিছু করতে পারেননি। ওই ম্যাচে রিয়াদ-সাকিব যে ভূমিকা রেখেছিলেন, আজ সেই ভূমিকায় লিটন দাস। চতুর্থ উইকেটে সাকিব আল হাসানের সাথে ১৮৯ রানের রেকর্ড পার্টনারশিপে লিটনের অবদান ৯৪ রান।

যারা ভেবেছিলেন স্কটিশ বোলিং আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলিং লাইনআপে বিস্তর ফারাক। অথচ স্কটিশদের তো ওশানে থমাসের মতো গতির বোলার ছিল না। সাথে কটরেলের মতো সুইং বোলার, হোল্ডার-গ্যাব্রিয়েল আর আন্দ্রে রাসেলের মানের একজন বোলারও ছিল না।

হ্যাঁ, ছিল না; কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা সেদিনও দেখিয়েছিলেন ৩০০ প্লাস রানের বড়সড় টার্গেট টপকে যাবার ক্ষমতা আর সামর্থ্য আছে আমাদের। আজ আবার দেখালেন, প্রতিপক্ষ- বোলিং লাইনআপে কে আছেন, কে নেই- সেটা বড় নয়। আমাদের দিনে আমরা যাকে তাকে হারাতে পারি। যেকোনো বোলিং শক্তিকে দুমড়ে মুচড়ে অসম্ভবকে সম্ভবও করতে জানি।

আর তাইতো ৩২২ রানের পাহাড় সমান লক্ষ্যে কত অনায়াসে পৌঁছে গেলেন সাকিব, তামিম আর লিটনরা। মাঠ ছোট না বড়, প্রতিপক্ষ বোলিং লাইনআপে কারা আছে, এসব নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে তামিম, সৌম্য শুরুতে আর তারপরে সাকিব আর লিটন খেললেন সাহসী বীরের মতো।

একবারের জন্য মনে হয়নি, এতটুকু ভয়-ডর আছে তাদের মনে, কিংবা বিশাল এক স্কোর তাড়া করতে নেমেছেন তারা। একদম স্বচ্ছন্দে নিজেদের খেলাটাই খেলেছেন সবাই।

নিজের দোষে আন্দ্রে রাসেলের বলে থার্ডম্যানে গলাতে গিয়ে আউট না হলে হয়ত সৌম্যও ঝড় তুলতে পারতেন। তারপরও ২৩ বলে সমান দুটি করে চার ও ছক্কায় ২৯ রানে আউট হবার আগে তামিমের সাথে প্রথম উইকেটে ৫২ (৮.২ ওভারে ) রানের জুটি গড়ে শুভ সূচনায় থাকলেন সৌম্যও।

তারপর শুরু হলো তামিম-সাকিব জুটি। বোলার কটরেলের ক্ষিপ্রতায় রান আউট না হলে হয়তো তামিম আর সাকিবও অনেক দূর যেতেন; কিন্তু তামিম ৪৮ রানে বোলার কটরেলের রিটার্ন থ্রো’-তে আউট হলেন। এরপর মুশফিক একটু বাজেভাবেই আউট হলেন ওশানে থমাসের লেগ স্ট্যাম্পের বাইরের বলতে ফ্লিক করতে গিয়ে। ব্যাটের ভেতরের কানা ছুঁয়ে বল চলে গেল কিপার শাই হোপের গ্লাভসে।

তারপর শুধু সাকিব আর লিটন দাসের বীরত্বের গল্প। গড়পড়তা প্রায় সাড়ে ছয় ফুট উচ্চতার ক্যারিবীয় ফাস্ট বোলারদের কী শাসনটাই না করলেন তারা দু’জন।

দু’একবার ভাগ্যগুণে ক্যাচ আউটের হাত থেকে বাঁচলেও সাহস, আত্মবিশ্বাস আর সামর্থ্যের ওপর আস্থা রেখে কী যে ভালো ব্যাটিং করলেন সাকিব আর লিটন- তার প্রশংসা করাও কঠিন। এমন সাহসী, বীরোচিত, আর বুক চিতানো ব্যাটিং বহুদিন মনে থাকবে বাংলাদেশের সমর্থকদের।

৯৯ বলে ১২৪ রানের হার না মানা ইনিংস খেলে জয়ের নায়ক সাকিব। আর পাঁচ নম্বরে নেমে শুরুতে সাকিবকে অনেকটা সময় সাপোর্ট দিয়ে তারপর খোলস ছেড়ে বেরিয়ে নিজের আসল রূপটা দেখিয়ে ৬৯ বলে ৯৪ রানের মনে রাখার মতো ইনিংস খেলে ম্যাচ সেরা না হলেও বাংলাদেশের মানুষের মন জয় করে নিলেন লিটন দাসও।

বাংলাদেশের এমন জয় ক্রিকেট বিশ্বও মনে রাখবে বহুদিন। কারণ শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ যে রান টপকে জিতলো সেটা বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়। এমন বীরোচিত জয়ের জন্য টাইগারদের জাগোনিউজ২৪.কমের পক্ষ থেকে অভিনন্দন।

জয়তু টাইগার্স।

এআরবি/আইএইচএস/বিএ

আপনার মতামত লিখুন :