সিকিমের ইয়ংথান ভ্যালি যেন বরফের স্তূপ

ভ্রমণ ডেস্ক
ভ্রমণ ডেস্ক ভ্রমণ ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫:৫৫ পিএম, ৩০ জুন ২০২০

লতিফুল হক মিয়া

ছুটে চলেছে আমাদের গাড়ি। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছিল ইয়ংথান ভ্যালির বরফময় পর্বত। লাচুং পৌঁছানোর ২০-২৫ কিলোমিটার দূর থেকেই রাস্তার দু’ধারে বরফের স্তূপ দেখা যাচ্ছে। এর মাঝ দিয়েই চলছে আমাদের গাড়ি। মনে হচ্ছিল, আমরা যেন ইউরোপের কোনো দেশে যাচ্ছি। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে আমরা পৌঁছলাম লাচুংয়ে। রাস্তার পাশেই একটি বাংলোতেই থাকার ব্যবস্থা করল আমাদের ড্রাইভার কাম গাইড কর্মা। হোটেলের চালে ও উঠোনে বরফ জমে আছে। আশেপাশে খালি জায়গায়ও সাদা বরফের স্তুপ। এবার সত্যিই মনে হচ্ছে, এ যেন ইউরোপের কোনো দেশে আমরা পৌঁছেছি। গাড়ি থেকে নামতেই অনুভূত হলো প্রচণ্ড শীত। তবে আবহাওয়া অত্যন্ত ভালো, যার কারণে গ্যাংটক ও লাচুংয়ে কোনো সর্দি, কাশি বা হাঁচি নেই কারোরই। গাড়ি থেকে লাগেজ নিয়ে গেলাম হোটেলে। ওখানকার প্রত্যেকটি টয়লেটেই রয়েছে গিজারের ব্যবস্থা। লাগেজগুলো হোটেলের দুই তলার কক্ষে রেখে আমরা সবাই নামলাম নিচে। কর্মা জানালেন, রাত ৮টার দিকে আমাদের রাতের খাবারের ব্যবস্থা হবে। রাতের খাবার খেয়ে পরের দিন ঘোরার জন্য ৫০ রুপিতে গামবুট ভাড়া নিলাম। অনেকেই জ্যাকেট ভাড়া নিলেন ১৫০ রুপিতে। এগুলো নিয়ে যে যার মতো কক্ষে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।

india-tour-1

১৬ ডিসেম্বর আমরা ঘুম থেকে উঠলাম ভোর ৫টার দিকে। কর্মাকে ডেকে তুললাম। এরপর ৬টার দিকে প্যাকেজের ভেতরেই নাস্তা করালেন কর্মা। নাস্তায় ছিল ব্রেড ও দুধ চা। তাপমাত্রা মাইনাসের নিচে হওয়ায় লাইনের পানি বরফ হয়ে গিয়েছিল। তাই সকালে আমরা খাবার পানি পাইনি। এরপর কর্মা আমাদের জানালেন, অত্যন্ত তুষারপাতের কারণে ইয়ংথান ভ্যালির রাস্তা বন্ধ। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কোনো পর্যটককেই যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে আমরা ‘কাটাও’ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। সকাল ৮টার দিকে শুরু হলো কাটাও যাত্রা। রাস্তার দু’ধারে বরফের মাঝ দিয়ে চলছে আমাদের জিপ। বাইরে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা। তিন থেকে চারটি করে মোটা কাপড় পড়ে শীত মোকাবেলার প্রস্তুতি প্রত্যেকের। ঘরের চালে বরফ। গাছে বরফ। কোথাও কোথাও রাস্তার উপরও বরফের স্তুপ। এমন চিত্রকে অনেকেই সুইজারল্যান্ডের সঙ্গেও তুলনা করেছেন। লাচুং থেকে কাটাও’য়ের দূরত্ব ২৫ কিলোমিটার। ৯টার দিকে আমরা পৌঁছলাম কাটাও।

গাড়ি থেকে নেমেই সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন ছবি তুলতে। শীতে জমে যাওয়ার মতো অবস্থায় হাত মোজা খুলে বেশিক্ষণ ছবি তোলাও বেশ কঠিন হচ্ছিল। আবার কেউ কেউ শীত থেকে বাঁচতে কিছুক্ষণ গাড়িতেও বসলেন। প্রায় ১৪ হাজার ফুট উপরের ভ্রমণ স্থান হলো এটি। তাই নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল সবার। চারপাশের দৃশ্যগুলো দেখে সবাই মুগ্ধ। এত কষ্ট করে আসাটা যেন সার্থক হলো সবার। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় দিবসে আমিও সেখানে উঠালাম বিজয়ের পতাকা। বরফময় পর্বতে সূর্যমামার আলোর ঝলকানি পর্বতকে অনেক রূপবতী করে তুলেছে। এমন অপার্থিব দৃশ্য সম্ভবত মিলবে শুধু কাটাও’য়েই। প্রচণ্ড শীতে দুই ঘণ্টা সময় ব্যয় করার পর আমরা ফিরতে শুরু করলাম লাচুংয়ের দিকে। ১২টার দিকে লাচুংয়ে ফিরে এলাম। লাচুংয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে রওনা দিলাম গ্যাংটকের দিকে। আসার পথে ‘সেভেন ফলস’-এ যাত্রা বিরতি দিলেন আমাদের গাইড কাম জিপ চালক কর্মা। সন্ধ্যা ৭টার দিকে ফিরলাম হোটেলে। এরপর বেড়িয়ে পরলাম রাতের খাবার আর কেনাকাটা করতে। গ্যাংটকেও রাত সাড়ে ৮টার পর সব কিছু বন্ধ হয়ে যায়। তাই দ্রুত কেনাকাটা ও মুসলিম হোটেলে রাতের খাবার খেয়ে ফিরলাম হোটেলে। দ্রুতই ঘুমিয়ে পড়লাম। কারণ পরের দিন রওনা দেবো ঢাকার উদ্দেশ্যে।

india-tour-1

১৭ ডিসেম্বর সকাল ৭টার দিকে আমরা সবাই প্রস্তুত হলাম। প্যাকেজের নির্ধারিত অর্থ হোটেলে পরিশোধ করা হলো। এদিন শিলিগুড়ি যাওয়ার গাড়ি অপেক্ষা করছিল হোটেলের নিচেই। লাগেজগুলো উপরে ক্যারিয়ারে তোলা হলো। সোয়া ৭টার দিকে শিলিগুড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হলো। ফেরার পথে রংপোতে পাসপোর্টে প্রস্থান সিল দেওয়া হলো। এরপর আরেকটি স্থানে যাত্রাবিরতি দিলো গাড়ি চালক। সেখান থেকে টিমের অনেকেই পাহাড়ি কমলা কিনলেন। এরপর শুরু হলো আবার যাত্রা। ১২টার দিকে আমরা পৌঁছলাম শিলিগুড়ির এসএনটি টার্মিনালে। গাড়ি থেকে সকালের নাস্তা করলাম সবাই। ওখান থেকে বোনসহ রানা ভাই গেলেন কলকাতার দিকে। বিশ্বজিৎ থেকে গেল ভারতে। হালকা কিছু কেনাকাটা করে টিমের বাকি ছয় জনকে নিয়ে ১টার দিকে রওনা হলাম চ্যাংড়াবান্দার দিকে। ১ হাজার ২০০ রুপি জিপ ভাড়ায় সাড়ে তিনটার দিকে পৌঁছলাম চ্যাংড়াবান্ধায়। ওখানে ফেরার পথে ভারতে পুনরায় জনপ্রতি ৫০ রুপি দিতে হলো উৎকোচ। পাসপোর্টে প্রস্থান সিলের জন্য ধরতে হলো লাইন। এরপর রুপি থেকে টাকা করে গেলাম বাংলাদেশে দিকে। বাংলাদেশে দিতে হলো আবার জনপ্রতি ১৫০ টাকা করে উৎকোচ। বাংলাদেশে পৌঁছে বাংলাদেশে ইমিগ্রেশনে প্রস্থান সিল দেওয়া হলো। এরপর গেলাম ঢাকার টিকিট সংগ্রহে। বিকাল ৫টা অতিক্রম করায় একসাথে ৬টি টিকিট আর পাওয়া গেল না। ডাবল দামে একসাথে ৩টি টিকিট কেটে ১৮ ডিসেম্বর ১১টার দিকে ঢাকায় পৌঁছলাম আমরা। মাথাপিছু ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে ঘুরে এলাম এক অপার্থিব শান্তি আর সৌন্দর্য উপভোগ করে।

এসইউ/এএ/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]