সহিংসতা-নিপীড়নে ম্লান হচ্ছে নারী ক্ষমতায়নের অর্জন

আলী ইউনুস হৃদয়
আলী ইউনুস হৃদয় আলী ইউনুস হৃদয়
প্রকাশিত: ১২:৩৮ পিএম, ০৮ মার্চ ২০২১
প্রতীকী ছবি

প্রতিবছর ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয়। সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকসহ সব ক্ষেত্রে নারীর অর্জন ও কৃতিত্ব তুলে ধরতেই নানান আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেশেও দিবসটি পালন করা হয়। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারীরা বলছেন, স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে নারী দিবস পালন নিঃসন্দেহে ভালোলাগার। দীর্ঘ এই সময়ে নারীর ক্ষমতায়ন ও সমতা প্রতিষ্ঠায় আমাদের অনেক অর্জন রয়েছে। তবে বিভিন্ন সময়ে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার কারণে অনেক অর্জন ম্লানও হয়ে যাচ্ছে।

নারীরা বলছেন, এটা খুব স্বাভাবিক যে শুধু সাফল্য অর্জনই নারীমুক্তি নয়। যখন সবক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠিত হবে তখনই নারীর লড়াই সংগ্রাম পূর্ণতা পাবে। আমাদের দেশের সরকারি-বেসরকারি সবক্ষেত্রে চাকরি ও ব্যবসায় নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে ব্যাপকভাবে। নারীরা পুলিশ, প্রশাসন, বিচারবিভাগ, সামরিক বাহিনীসহ চ্যালেঞ্জিং সব ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছেন। সব ক্ষেত্রেই তাদের উপস্থিতি ও প্রভাব বাড়ছে। তবে একইসঙ্গে নারীর প্রতি সহিংসতাও রয়ে গেছে।

নারী ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা কয়েকটি বেসরকারি সংগঠনের সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা গেছে, আইনের প্রয়োগ এবং শাস্তি বাড়লেও নারী-শিশুর প্রতি নির্যাতন-নিপীড়ন কমেনি। করোনা মহামারির মধ্যে আগের চেয়ে ধর্ষণ-নিপীড়নের ঘটনা বেড়েছে। আর এখানেই নারী দিবসের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হচ্ছে না বলে তারা দাবি করছেন।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৬২৬ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, ২০২০ সালে এক হাজার ৬২৭ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। দুই বছর আগের তুলনায় এ সংখ্যা দ্বিগুণ। ২০১৮ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন ৭৩২ জন নারী, ২০১৯ সালে এ সংখ্যা ছিল এক হাজার ৪১৩ জন।

সংশ্লিষ্টরা আশা করেছিলেন, ধর্ষণের সাজা মৃত্যুদণ্ড করায় এ ধরনের অপরাধ প্রবণতা কমবে। কিন্তু আসকের ওই সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ১৪ অক্টোবর অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আইন কার্যকরের পর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৬০টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, যা উদ্বেগজনক।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গত বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত পুরো বছরে মোট তিন হাজার ৬২ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হন। আর চলতি বছরের গত ফেব্রুয়ারি মাসেই ৩০৮ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু জাগো নিউজকে বলেন, ‘আসলে আমাদের অর্জন তো কম নয়। আমরা বছরের এ একটি দিন উদযাপন করতে চাই। কিন্তু যে পরিস্থিতি দেখি তাতে আমাদের কষ্ট হয়। কেননা নারী ও শিশুরা আজ কোথাও নিরাপদ নয়। প্রতিনিয়ত নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। তাহলে আমাদের অর্জন তো ম্লান হয়ে যায়। আমি মনে করি, আমাদের লড়াইটা অব্যাহত রাখতে হবে। যেকোনো ধরনের সহিংসতামুক্ত নারী-পুরুষের সমতার বাংলাদেশ আমরা দেখতে চাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘তথ্য-প্রযুক্তির মাধ্যমে নারী-শিশুদের হয়রানি করা হচ্ছে, যা উদ্বেগজনক। এজন্য পরিবারসহ তরুণ প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে অনিয়ন্ত্রিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার পরিহার করতে হবে। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকেও মনিটরিং করতে হবে এবং কঠোর নির্দেশনা প্রদান করতে হবে। একইসঙ্গে হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্তকে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় এনে শাস্তি দিতে হবে। তাহলেই তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে হয়রানি করা বন্ধ হবে।’

আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটের নির্বাহী সমন্বয়কারী জিনাত আরা হক মনে করেন, ‘নারীর জন্য প্রতিটি দিবসই গুরুত্বপূর্ণ। এই একটি দিনে নারী তার অগ্রযাত্রাকে জানান দিতে চায়। আমি মনে করি নারীকে এখনও ভোগ্য পণ্য মনে করা হয়। যে কারণে নারীর সম্মানহানি হয় বলে মনে করি। কিন্তু আমরা শুনি না পুরুষের সম্মানহানি হচ্ছে। এটা আমাদের তৈরি করা একটি বোঝাপড়া। এতে করে নারীরাও ঘরবন্দি হয়ে পড়ে। এর পেছনে তো আমাদের নেতিবাচক মানসিকতাই দায়ী।’

তিনি আরও বলেন, ‘নারীকে দেখার নেতিবাচক মানসিকতা পরিহার করতে হবে। আর আমাদের আকাঙ্ক্ষা নারী-পুরুষের সমান অংশীদারত্বের বাংলাদেশ দেখা, সেজন্য অবশ্য আমাদের আরও চেষ্টা করত হবে।’

১৯০৮ সালে জার্মানিতে প্রথম নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। এ সম্মেলনেই প্রথমবারের মতো প্রতি বছরের ৮ মার্চকে ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেয়া হয়। এ প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে ১৯১৪ সাল থেকে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ মার্চ নারী দিবস পালিত হয়। বাংলাদেশে ১৯৭১ সাল থেকে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। আর ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ ৮ মার্চ দিনটিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের আহ্বান জানালে বিশ্বব্যাপী দিনটি পালিত হয়ে আসছে।

এওয়াইএইচ/এমএইচআর/এসএইচএস/জেআইএম

আসলে আমাদের অর্জনতো কম নয়। আমরা বছরের এ একটি দিন উদযাপন করতে চাই। কিন্তু যে পরিস্থিতি দেখি তাতে আমাদের কষ্ট হয়। কেননা নারী ও শিশুরা আজ কোথাও নিরাপদ নয়। প্রতিনিয়ত নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। তাহলে আমাদের অর্জন তো ম্লান হয়ে যায়। আমি মনে করি, আমাদের লড়াইটা অব্যাহত রাখতে হবে। যেকোনো ধরনের সহিংসতামুক্ত নারী-পুরুষের সমতার বাংলাদেশ আমরা দেখতে চাই।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]