দক্ষতা, যোগ্যতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছেন ৬ নারী বিচারপতি

মুহাম্মদ ফজলুল হক
মুহাম্মদ ফজলুল হক মুহাম্মদ ফজলুল হক , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:২০ পিএম, ০৮ মার্চ ২০২১

শুরুটা ২০০০ সালের ২৮ মে, উচ্চ আদালতে প্রথমবারের মতো নিয়োগ পান নারী বিচারপতি। সেই থেকে শুরু হয়ে আজ অবধি এ সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৯ জনে। তবে যিনি পথ দেখিয়েছেন সেই প্রথম নারী বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ থেকে ২০১৭ সালের জুলাই মাসে অবসর নেন। এর পরে ২০২০ সালের মার্চে অবসরে যান বিচারতি জিনাত আরা। তাই এখন উচ্চ আদালতে ৬ জন নারী বিচারপতি রয়েছেন। তারা সবাই হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি।

‘করোনাকালে নারী নেতৃত্ব, গড়বে নতুন সমতার বিশ্ব’ প্রতিপাদ্য নিয়ে এ বছর সারাবিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। যদিও নারীর সার্বিক ক্ষমতায়নে করোনা নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, তবু চাপিয়ে দেয়া প্রচলিত ধ্যানধারণা এবং সহিংসতামুক্ত একটি সমতাপূর্ণ আগামীই নারীরা চান।

এগিয়ে চলছে নারী, এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বর্তমান সমাজে নারী সেকালের বৃত্তের মধ্যে বন্দি নেই। সমাজ ব্যবস্থার আরোপিত শৃঙ্খল ভেঙে আত্মবিশ্বাসে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন তারা। শুধু ঘরেই নয়, এমন সব কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত থেকে আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ় মনোবলের পরিচয় দিয়ে তারা অগ্রগতি ও উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছেন, যা শুধু নারীর অগ্রগতি নয় দেশের অর্থনীতির ভীত শক্ত ও মজবুত করছে।

দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে দক্ষতা, যোগ্যতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন ছয় নারী বিচারপতি। এর আগে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে দায়িত্ব পালন করে ২০১৭ সালে কর্মস্থল থেকে বিদায় নিয়েছেন দেশের প্রথম নারী বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা। তার পরে আপিল বিভাগের অপর নারী বিচারপতি জিনাত আরা গত ২০২০ সালের ১২ মার্চ আপিল বিভাগ থেকে অবসরে যান।

ছয় নারী বিচারপতি হাইকোর্ট বিভাগে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তারা হলেন- বিচারপতি ফারাহ মাহবুব, বিচারপতি নাইমা হায়দার, বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ, বিচারপতি কাশেফা হোসেন, কাজী জিনাত হক ও ফাতেমা নজিব।

সর্বোচ্চ আদালতের শীর্ষ পর্যায়ে আসতে তাদের পার করতে হয়েছে নানা প্রতিকূলতা, বাধা-বিপত্তি। তবে সবকিছু জয় করে তারা এখন দেশের ও বিচার বিভাগের ইতিহাসের অংশ।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ইতিহাসে প্রথম নারী বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা ২০১৭ সালের ৬ জুলাই অবসরে যান। আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে শপথ নেয়ার পর তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘অনুভূতি অনেক ভালো। আমি আমার কাজের স্বীকৃতি পেয়েছি। প্রথম নারী বিচারক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলাম। হাইকোর্টেও প্রথম বিচারপতি হিসেবে এসেছিলাম। এবার আপিল বিভাগে প্রথম বিচারপতি হিসেবে এলাম। আমি মনে করি, আমার এই নিয়োগ দেশে নারীর ক্ষমতায়নে অবদান রাখবে।’

বিচারপতি ফারাহ মাহবুব

বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ১৯৬৬ সালের ২৭ মে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম মাহবুবুর রহমান। মায়ের নাম বেগম ফিরোজা বেগম। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ও এলএলএম পাস করেন।

১৯৯২ সালে তিনি জেলা আদালতে আইন পেশা শুরু করেন। তিনি ১৯৯৪ সালের ১৫ অক্টোবর হাইকোর্টে এবং ২০০২ সালের ১৫ মে আপিল বিভাগে আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন। ২০০৪ সালের ২৩ আগস্ট তিনি হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারপতি নিযুক্ত হন। ২০০৬ সালে তিনি হাইকোর্ট বিভাগে পূর্ণাঙ্গ বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান।

তিনি ২০১০ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দেন। এছাড়া ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, দুবাই, জার্মানি ও সৌদি আরব সফর করেন তিনি।

বিচারপতি নাইমা হায়দার

বিচারপতি নাইমা হায়দার সাবেক বিচারপতি মরহুম বদরুল হায়দার চৌধুরী ও বেগম আনোয়ারা চৌধুরীর মেয়ে। তিনি ১৯৬২ সালের ১৯ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন।

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। এছাড়া কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সাউদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কেল বিশ্ববিদ্যালয় ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন।

তিনি ১৯৮৯ সালে জেলা আদালতে আইন পেশায় যোগ দেন। ১৯৯৩ সালে হাইকোর্টে এবং ২০০৪ সালে আপিল বিভাগের আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন। ২০০৯ সালের ৬ জুন হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি। ২০১১ সালের ৬ জুন হাইকোর্টের পূর্ণ বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান।

নাইমা হায়দার দেশে-বিদেশে অন্তত ২০টি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দেন। এছাড়া তিনি যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, সুইজারল্যান্ড, সৌদি আরব, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, পর্তুগাল, অস্ট্রিয়া, পোল্যান্ড, তুরস্ক, চীন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা সফর করেন।

বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ

হাইকোর্ট বিভাগে বিচারপতি হিসেবে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল নিয়োগ পান কৃষ্ণা দেবনাথ। ২০১০ সালের ১৮ এপ্রিল অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। এর আগে তিনি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে লেখাপড়া করেন। তিনি বিচার বিভাগে মুনসেফ হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন ১৯৮১ সালে।

বিচারপতি কাশেফা হোসেন

হাইকোর্ট বিভাগে বিচারপতি হিসেবে ২০১৫ সালের ৫ আগস্ট নিয়োগ পান কাশেফা হোসেন। ২০১৩ সালের ৪ আগস্ট অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান তিনি।

এর আগে তিনি ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ক ডিগ্রি লাভ করেন। এছাড়া লন্ডনেও একই বিষয়ে পড়াশুনা করেন।

বিচারপতি কাশেফা হোসেন ১৯৯৫ সালে জজকোর্টের আইনজীবী হিসেবে নাম লেখান। তার বাবা সৈয়দ মোহাম্মদ হোসেনও বিচারপতি ছিলেন।

বিচারপতি ফাতেমা নজিব

২০১৮ সালের ৩০ মে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট অতিরিক্ত বিচারক থেকে স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় বিচারপতি ফাতেমা নাজিবকে।

বিচারপতি কাজী জিনাত হক

২০১৯ সালে হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান কাজী জিনাত হক। তিনি একুশে পদকপ্রাপ্ত ভাষাসৈনিক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি কাজী এবাদুল হক ও একুশে পদকপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. শরীফা খাতুনের মেয়ে। সর্বোচ্চ আদালতে বিচারিক দায়িত্ব পালনের আগে কাজী জিনাত দুই মেয়াদে সুপ্রিম কোর্টের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন।

এছাড়া বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী ২০০২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। দুই বছর পর ২০০৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি তিনি হাইকোর্টের স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। যদিও এখন বিচারিক দায়িত্বে নেই বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী।

এফএইচ/ইএ/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]