মো. মিজানুর রহমান জানেন তার টাকা আছে। কাগজে-কলমে, সরকারি হিসাবে সব ঠিকঠাক। কিন্তু বাস্তবে সেই টাকা তার হাতে আসছে না। কারণ একটাই, যে ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে তার সঞ্চয়পত্র যুক্ত ছিল, সেটি এখন আর নেই। আর নতুন হিসাব যুক্ত করার পথও বন্ধ। গত কয়েক মাস ধরে এমন অসহায় অবস্থায় আছেন মিজানুর রহমানের মতো অসংখ্য সঞ্চয়পত্র গ্রাহক।
জাতীয় সঞ্চয়পত্র নিরাপদ বিনিয়োগের প্রতীক। অবসর জীবনের ভরসা, অসুখ-বিসুখে শেষ আশ্রয়। কিন্তু সেই সঞ্চয়পত্রই এখন বহু গ্রাহকের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি জালিয়াতির ঘটনার পর নিরাপত্তা জোরদার করতে গিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ব্যাংক হিসাব ও মোবাইল নম্বর পরিবর্তনের প্রক্রিয়া। এতে বৈধ গ্রাহকদের বড় একটি অংশ পড়েছেন চরম দুর্ভোগে।
গত বছরের অক্টোবরে ঘটে যাওয়া একটি জালিয়াতির ঘটনা পুরো ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দেয়। এস এম রেজভী নামে এক গ্রাহকের মোবাইল নম্বর ও লেনদেনের সীমা কৌশলে পরিবর্তন করে ২৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রের অর্থ তুলে নেওয়া হয়। ঘটনায় চারজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের যে তিন কর্মকর্তার কাছে সঞ্চয়পত্র বিক্রির পাসওয়ার্ড ছিল, তাদের সরিয়ে দেওয়া হয় দায়িত্ব থেকে।
এ বিষয়ে আমার পক্ষে বলা সম্ভব না। মন্ত্রণালয় থেকে যেটা বলে, আমরা সেটাই করি। সেটাই আমাদের কাজ। মন্ত্রণালয় আমাদের যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছে, আমরা সে অনুযায়ী কাজ করবো।-জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. রওশন আরা বেগম
সমস্যার শুরু এখান থেকেই। নিরাপত্তার অজুহাতে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের ব্যাংক হিসাব নম্বর ও মোবাইল নম্বর পরিবর্তনের সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। অথচ বাস্তবে এর প্রভাব পড়েছে মূলত সাধারণ গ্রাহকদের ওপর।
মো. মিজানুর রহমান এমনই একজন ভুক্তভোগী। একটি ব্যাংকে তার চলতি ও সঞ্চয়ী—দুটি হিসাব ছিল। সঞ্চয়পত্র কেনার সময় চলতি হিসাবটি সংযুক্ত করা হয়। পরে ব্যবসায় মন্দা দেখা দিলে তিনি ব্যাংকে আবেদন করে চলতি হিসাবটি বন্ধ করেন। সম্প্রতি সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ পূর্ণ হলেও সংযুক্ত হিসাবটি বন্ধ থাকায় তিনি টাকা তুলতে পারছেন না। নতুন হিসাব যুক্ত করার চেষ্টা করেও কোনো সমাধান পাচ্ছেন না তিনি।
এই ভুক্তভোগী জাগো নিউজকে বলেন, ‘ব্যাংকেও গেছি, সঞ্চয় অধিদপ্তরেও গেছি- কেউই কিছু করতে পারছে না। আমার মতো আরও অনেক গ্রাহক এখন একই পরিস্থিতির শিকার। কেউ চিকিৎসা ব্যয়ের জন্য রাখা টাকা তুলতে পারছেন না, কেউ সংসারের জরুরি প্রয়োজনেও সঞ্চয়পত্রের অর্থ পাচ্ছেন না।
তিনি কিছুটা ক্ষোভ নিয়ে বলেন, একটি জালিয়াতির ঘটনায় নিরাপত্তা জোরদার করা প্রয়োজন, এ নিয়ে কারও দ্বিমত নেই। কিন্তু সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে যদি বৈধ গ্রাহকদের মাসের পর মাস ভোগান্তিতে পড়তে হয়, তবে তা নতুন করে ভাবার দাবি রাখে। এটা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
ব্যাংকে যোগাযোগ করার পর সঞ্চয় অধিদপ্তরে যাই হিসাব পরিবর্তনের জন্য। অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা আন্তরিকতা দেখিয়েছেন, কিন্তু হিসাব পরিবর্তনের ব্যবস্থা করতে পারেননি। তারা পরামর্শ দিয়েছেন বন্ধ ব্যাংক হিসাবটি আবার আবেদন দিয়ে চালু করতে। হিসাব পরিবর্তন করা নাকি এখন জটিল হয়ে গেছে।-ভুক্তভোগী
শুধু মিজানুর রহমান নন, বর্তমানে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন সঞ্চয়পত্রের অনেক গ্রাহক। রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) সঞ্চয় অধিদপ্তরে গিয়ে বেশ কয়েকজন গ্রাহককে এ ধরনের অভিযোগ নিয়ে কর্মকর্তাদের টেবিলে টেবিলে ধরনা দিতে দেখা যায়।
মিজানুর রহমানের মতো একই ধরনের সমস্যায় পড়ে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরে আসেন মো. আরিফুল নামে একজন। তিনি বলেন, একটি ব্যাংকে আমার দুটি হিসাব ছিল। দুটি হিসাবেই একই নাম, সব তথ্য একই। আবেদন দিয়ে আমি একটি হিসাব বন্ধ করি। সঞ্চয়পত্রে আমার ওই হিসাবটিই সংযুক্ত। এখন সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও টাকা পাচ্ছি না।
আরও পড়ুন‘নীরবে’ বাড়ানো হলো সঞ্চয়পত্রের উৎসে করসঞ্চয়পত্র কেনার শর্ত কী, কারা কিনতে পারেন?মেয়াদের আগে সঞ্চয়পত্র ভাঙলেও মিলবে বাড়তি মুনাফাসঞ্চয়পত্র কেনায় সীমা তুলে দেওয়ার চিন্তা করছে সরকার: অর্থসচিবতিনি বলেন, ব্যাংকে যোগাযোগ করার পর সঞ্চয় অধিদপ্তরে যাই হিসাব পরিবর্তনের জন্য। অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা আন্তরিকতা দেখিয়েছেন, কিন্তু হিসাব পরিবর্তনের ব্যবস্থা করতে পারেননি। তারা পরামর্শ দিয়েছেন বন্ধ ব্যাংক হিসাবটি আবার আবেদন দিয়ে চালু করতে। হিসাব পরিবর্তন করা নাকি এখন জটিল হয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন মন্ত্রণালয় থেকে সীমিত আকারে হিসাব পরিবর্তনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে তা দুর্বল পাঁচটি ব্যাংক ও যেসব গ্রাহক মারা গেছেন তাদের ক্ষেত্রে। যারা হিসাব বন্ধ করে দিয়েছেন, তাদের হিসাব পরিবর্তনের সুযোগ এখনো দেওয়া হয়নি।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে হিসাব পরিবর্তন সংক্রান্ত কয়েক হাজার আবেদন জমে রয়েছে। কিন্তু প্রক্রিয়াটি বন্ধ থাকায় সেগুলোর কোনো নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা বলেন, গ্রাহকদের দুর্ভোগ আমরা বুঝি। কিন্তু অনুমোদন ছাড়া আমাদের কিছু করার নেই। তবে গত সপ্তাহে মন্ত্রণালয় থেকে হিসাব পরিবর্তন সংক্রান্ত একটি সীমিত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে দুর্বল পাঁচটি ব্যাংক (একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংক) এবং মারা যাওয়া গ্রাহকদের ক্ষেত্রে হিসাব পরিবর্তনের সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে। শিগগির এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে পারে।
তিনি জানান, হিসাব পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নতুন ব্যবস্থায় আরেকটি পরিবর্তন আসছে। আগে গ্রাহক যে ব্যাংক বা ব্যুরো অফিস থেকে সঞ্চয়পত্র কিনতেন, সেখানেই হিসাব বা মোবাইল নম্বর পরিবর্তন করা যেতো। এখন থেকে সে সুযোগ আর থাকবে না। এখন কেবল জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর থেকেই হিসাব পরিবর্তন করা যাবে। এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মাত্র তিনজন কর্মকর্তাকে।
আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, আমরাও চাপের মধ্যে আছি। গ্রাহকরা প্রতিদিন আসছেন, কিন্তু নিয়ম না থাকলে আমরা কিছুই করতে পারি না। আমাদের তো আইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঘটে যাওয়া এক জালিয়াতির কারণে এখন গ্রাহকদের এমন দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে।
তিনি বলেন, গ্রাহকদের হিসাব পরিবর্তন করার সুযোগটি সহজ করা উচিত। এটি জটিল করা ঠিক না। কারণ চাকরিসূত্রে অনেককে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যেতে হয়। তখন তো স্থান ও ব্যাংক হিসাব নম্বর পরিবর্তন হতে পারে। একজন তো সব হিসাব সচল রাখবে না। প্রকৃত গ্রাহকরা যাতে সঠিক সেবা পায়, সেদিকে নজর দিয়েই সব নীতি করা উচিত।
হিসাব পরিবর্তন কার্যক্রম বন্ধ তিন মাসের বেশি সময় ধরে, কবে থেকে আপনারা কার্যক্রম চালু করতে পারবেন। এ বিষয়ে আপনাদের পরিকল্পনা কী? জাগো নিউজের পক্ষ থেকে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. রওশন আরা বেগমকে এমন প্রশ্ন করা হলে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার পক্ষে বলা সম্ভব না। মন্ত্রণালয় থেকে যেটা বলে, আমরা সেটাই করি। সেটাই আমাদের কাজ। মন্ত্রণালয় আমাদের যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছে, আমরা সে অনুযায়ী কাজ করবো।’
কী ঘটেছিল অক্টোবরে?হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের হিসাব নিরীক্ষণ কর্মকর্তা মঞ্জুর আলম তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এস এম রেজভীর আয়কর রিটার্ন পূরণ করতে গিয়ে দেখেন তার নামে কেনা ২৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ১৩ অক্টোবর তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু সঞ্চয়পত্র তুলে নেওয়ার কোনো আবেদন করেননি তিনি। পরে গ্রাহকের মোবাইল নম্বর, লেনদেনের সীমা পরিবর্তনসহ নানাভাবে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ২৩ অক্টোবর সঞ্চয়পত্রের ওই টাকা তুলে নেওয়া হয়।রেজভীর ২৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ভাঙিয়ে এনআরবিসি ব্যাংকের দিনাজপুরের রানীগঞ্জ উপশাখার মো. আরিফুর রহমান মিমের অ্যাকাউন্টে নেওয়া হয়। সেখানে টাকা জমা হওয়ার পরই ঢাকার দুটি শাখা থেকে তা তুলে নেওয়া হয়। আরিফের লেনদেন সীমা ২ লাখ টাকা হলেও জালিয়াতির মাধ্যমে সেই সীমা ১০ লাখ টাকা করা হয়।
এছাড়া জালিয়াতির মাধ্যমে মোহাম্মদ মারুফ এলাহী রনির ডাচ–বাংলা ব্যাংকের কারওয়ানবাজার শাখার ব্যাংক হিসাবে আরও দুই ব্যক্তির সঞ্চয়পত্রের ৫০ লাখ টাকা নেওয়া হয়। তবে অর্থ উত্তোলনের আগেই তা আটকে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের এনএসসি সিস্টেম জালিয়াতির মাধ্যমে সঞ্চয়পত্রের অর্থ আত্মসাতের এ ঘটনার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের যে তিনজন কর্মকর্তার কাছে সঞ্চয়পত্র বিক্রির পাসওয়ার্ড ছিল, তাদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নতুন করে অন্য তিনজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি চারজনের বিরুদ্ধে মামলাও করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
নিয়ম অনুযায়ী, যে অফিস থেকে সঞ্চয়পত্র কেনা হয়, কোনো তথ্য পরিবর্তন, সুদ বা আসল নেওয়ার জন্য অবশ্যই সে অফিসে আবেদন করতে হয়। আবেদন পাওয়ার পর গ্রাহকের দেওয়া মোবাইল নম্বরে একটি ওটিপি যায়। উপস্থিত গ্রাহক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মীকে তৎক্ষণাৎ সেই ওটিপি দেখানোর পর তা ব্যবহার করে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া মেনে তথ্য পরিবর্তন করা হয়। তবে সব ক্ষেত্রে সার্ভারে ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট বা প্রমাণ থাকে।
এমএএস/এএসএ