দলবদল রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিষয়টি নতুন নয়। এই দলবদল অনেক সময় বড় প্রভাবও ফেলে। সম্প্রতি বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠন থেকে একের পর এক নেতাকর্মীর জামায়াতে ইসলামীতে যোগদানের ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি করেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে দলবদলের এ ঘটনা কি কিছু ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত, নাকি তৃণমূল রাজনীতিতে কোনো গভীর আদর্শিক ও সাংগঠনিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত—সে প্রশ্ন ঘুরেফিরে সামনে আসছে।
আলোচনার কেন্দ্রে আখতারুজ্জামানদলবদলের ভিড়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছেন কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান। গত ১৩ ডিসেম্বর ঢাকার মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি প্রাথমিক সহযোগী সদস্য ফর্ম পূরণের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে যোগ দেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা আখতারুজ্জামান ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং একসময় কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তবে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ২০২২ সালে পঞ্চমবারের মতো বহিষ্কৃত হওয়ার পর তিনি কার্যত বিএনপির মূল রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন।
জামায়াতে যোগ দিয়েছেন বিএনপির বিভিন্ন জেলার নেতাকর্মীআখতারুজ্জামানের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের জামায়াতে যোগদানের খবর গণমাধ্যমে আসতে থাকে। ঢাকার কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক নেতা মিরাজুল আলম মাশরুর নেতৃত্বে তিন শতাধিক বিএনপি সমর্থক জামায়াতে যোগ দেন বলে দাবি করা হয়।
শিবগঞ্জে বিএনপির ৬০ নেতাকর্মী জামায়াতে যোগদানদুধ দিয়ে গোসল করে দলবলসহ জামায়াতে যোগ দিলেন বিএনপি নেতাবিএনপি-ছাত্রদল থেকে আসা ৩৬ জনকে সংবর্ধনা দিলো জামায়াতমেহেরপুরে জামায়াতে যোগ দিলেন বিএনপির তিন শতাধিক কর্মী-সমর্থকএছাড়া পটুয়াখালীর বাউফল, লালমনিরহাট, বরিশাল, পিরোজপুর, সিরাজগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুমিল্লা, বাগেরহাট, নরসিংদী, ঝালকাঠি, মেহেরপুর, নাটোর, নীলফামারীসহ বিভিন্ন জেলার বিএনপি-যুবদলের নেতাকর্মীদের দলবদলের তথ্য গণমাধ্যমে এসেছে।
গত ৬ ডিসেম্বর নরসিংদীতে বিএনপির ৭৫ নেতাকর্মী জামায়াতে যোগ দেন, ২৪ নভেম্বর বাগেরহাটে জামায়াতে যোগ দেন বিএনপির অর্ধশতাধিক কর্মী, ১৮ নভেম্বর ঝালকাঠিতে যোগ দেন ২০ নেতাকর্মী, কিশোরগঞ্জে ১৪ নভেম্বর ৬২ নেতাকর্মী যোগ দেন, কুমিল্লায় ১ ফেব্রুয়ারি জামায়াতে যোগ দেন বিএনপির ১৫ নেতাকর্মী, শিবগঞ্জে বিএনপির ৬০ নেতাকর্মী জামায়াতে যোগ দেন ৩১ জানুয়ারি। এভাবে দেশের অধিকাংশ জেলায় কমবেশি বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা বিচ্ছিন্নভাবে জামায়াতে যোগ দিয়েছেন।
কেন ছাড়ছেন বিএনপি?মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থেকে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা খুব কাছ থেকে দেখেছি। দেশ ও মানুষের কল্যাণে নৈতিক ও আদর্শভিত্তিক রাজনীতি প্রয়োজন। সেই বিশ্বাস থেকেই আমি জামায়াতে যুক্ত হয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপিতে নেতাকে বোঝাতে পারলে নেতা হওয়া যায়, আর জামায়াতে ইসলামীতে যোগ্যতার মূল্যায়ন করা হয়।’
কেরানীগঞ্জে বিএনপি থেকে জামায়াতে যোগদানের বিষয়ে সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রদল নেতা মিরাজুল আলম মাশরুর জাগো নিউজকে বলেন, ‘৫ আগস্টের পর কেরানীগঞ্জে বিএনপির কিছু নেতাকর্মী ব্যাপক চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসে জড়িত ছিল। আমরা যারা সৎ রাজনীতি করি, তারা এই দায় নিতে পারি না। জামায়াতে ইসলামীতে কোনো চাঁদাবাজ বা সন্ত্রাসী দেখিনি। তাদের আদর্শ দেখে অনুপ্রাণিত হয়েই যোগ দিয়েছি।’
লালমনিরহাট যুবদলের সাবেক সদস্য রেজাউল করিম বলেন, ‘২০১৩ সালে ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলাম। বিএনপির বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান ও নীতির সঙ্গে আমি একমত নই। ন্যায় ও ইনসাফের রাজনীতিতে বিশ্বাস থেকেই স্বেচ্ছায় জামায়াতে যোগ দিয়েছি।’
তিনি জানান, তার নেতৃত্বেই ছাত্রদল ও যুবদলের ২৫ জন সদস্য জামায়াতে যোগ দিয়েছেন।
বানারীপাড়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি গোলাম মাহমুদ মাহাবুব বলেন, মা, মাটি ও মানুষের দল ছিল বিএনপি। সেই বিএনপি অর্ধেক জিয়াউর রহমানের মৃত্যুতে আর বাকি অর্ধেক খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শেষ হয়ে গেছে। এখন শুধু বিএনপির লেবেলটা আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামীতে কোনো চাঁদাবাজ, মাদকসেবী, দখলবাজ নেই। দেশের স্বাধীনতা ও ইসলামের জন্য তারা জীবন বাজি রাখে। সত্যের সৈনিক হতে আমি জামায়াতে যোগ দিয়েছি।’
যা বলছে জামায়াতজামায়াতের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া পোস্টে বলা হয়, মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান জামায়াতে ইসলামীর নীতি ও আদর্শ, দেশপ্রেম এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দলের অবিচল অবস্থানের প্রতি গভীর আস্থা প্রকাশ করেছেন। সংগঠনের নিয়মনীতি, দলীয় শৃঙ্খলা ও আনুগত্যের প্রতি সর্বদা অনুগত থাকার অঙ্গীকার করেন তিনি।
ঢাকা-২ আসনের জামায়াত প্রার্থী মো. আব্দুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঢাকা-২ আসনে ভোটে দাঁড়িপাল্লাকে বিজয়ী করতে যারা আজ আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন, তাদের অভিনন্দন জানাই। আমরা সবাই মিলে চাঁদাবাজমুক্ত ও সন্ত্রাসমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চাই।’
লালমনিরহাট জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট ফিরোজ হায়দার লাভলু বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ও ন্যায়ভিত্তিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী যে কোনো শক্তির জন্য জামায়াতের দরজা খোলা।’
যা বলছেন বিএনপি নেতারাবাউফল উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক তছলিম তালুকদার বলেন, ‘যারা জামায়াতে গেছে তারা আমাদের দলের ছিল না। তারা আওয়ামী লীগের সাবেক নেতার লোক। তাদের যাওয়ায় বিএনপি শুদ্ধ হয়েছে।’
কেরানীগঞ্জের আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি খোরশেদ বলেন, ‘বিএনপির কেউ জামায়াতে যোগ দেয়নি। সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’
পটুয়াখালী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মুজিবর রহমান টোটন বলেন, ‘৩০০ জন যোগ দিয়েছে—এ তথ্য সঠিক নয়। ১০-১৫ জন যোগ দিয়েছে, যারা আমাদের কোনো দায়িত্বশীল পদে ছিল না।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘এগুলোর বেশিরভাগই প্রোপাগান্ডা। কেউ রাগ করে এক জায়গায় যেতে পারে, পরে ঠিক হয়ে যায়।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন খান মোহন জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিএনপির ভেতরে দীর্ঘদিন থাকা কিছু ছদ্মবেশী সমর্থক এখন প্রকাশ্যে অবস্থান নিচ্ছেন। তবে স্থানীয় নেতৃত্বের প্রতি আস্থাহীনতাও দলত্যাগের বড় কারণ।’
কেএইচ/এএসএ