বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা দ্রুত কমে যাওয়ায় খুশি দুর্নীতিবাজ রাজনীতিকরা। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ভুলত্রুটি, পক্ষপাত বা অতিরঞ্জনের অভিযোগ থাকলেও গণতন্ত্র ও জবাবদিহির জন্য স্বাধীন সাংবাদিকতা যে কতটা জরুরি, তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ)-এর সূচক অনুযায়ী, ২০১৪ সালের পর থেকে বিশ্বব্যাপী সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার মান উল্লেখযোগ্যভাবে নেমে গেছে। এক সময় যেসব দেশের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের মতো ছিল, সেগুলোর অনেকটাই এখন সার্বিয়ার মতো অবস্থায়—যেখানে দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভ কাভার করা সাংবাদিকদের পুলিশি নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি শুধু বাকস্বাধীনতার প্রশ্ন নয়। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর একটি মৌলিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। যখন ক্ষমতাবানরা জানে যে তাদের অপব্যবহার প্রকাশ পাবে না, তখন সেই অপব্যবহার আরও বাড়ে।
আরও পড়ুন>>ইরান ইস্যুতে পশ্চিমা মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে বিতর্কের ঝড়এআই খাতে রেকর্ড বাজেট, কর্মী ছাঁটাইয়ের হিড়িক ওয়াশিংটন পোস্টেগাজায় ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের ৭০০র বেশি স্বজনকে হত্যা করেছে ইসরায়েল
সুইডেনভিত্তিক গবেষণা প্রকল্প ভি-ডেমের প্রায় ৮০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্য ইকোনমিস্ট দেখিয়েছে, সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্নীতি বৃদ্ধির মধ্যে একটি ‘ফিডব্যাক লুপ’ কাজ করে। রাজনীতিকরা যখন লুটপাট করতে চায়, তখন তারা প্রথমে সংবাদমাধ্যমকে চেপে ধরে। সংবাদমাধ্যম যত বেশি নিয়ন্ত্রিত হয়, দুর্নীতি তত সহজ হয়। আবার দুর্নীতি যত বাড়ে, সমালোচনামূলক প্রতিবেদন ঠেকানোর আগ্রহ তত বাড়ে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কোনো দেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা যদি কানাডার মতো ভালো অবস্থা থেকে ইন্দোনেশিয়ার মতো খারাপ অবস্থায় নেমে যায়, তাহলে দুর্নীতির মাত্রা আয়ারল্যান্ডের মতো তুলনামূলক স্বচ্ছ অবস্থা থেকে লাটভিয়ার মতো অস্বচ্ছ অবস্থায় পৌঁছানোর আশঙ্কা তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে ঘটে, ফলে ভোটাররা অনেক সময় পরবর্তী নির্বাচনের আগে তা টেরই পান না। বিশেষ করে জনতাবাদী সরকারগুলোর অধীনে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
গণতন্ত্রের মোড়কে নিয়ন্ত্রণউদ্বেগজনক দিক হলো, নিজেদের গণতান্ত্রিক বলে দাবি করা সরকারগুলোও এখন কর্তৃত্ববাদী শাসনের কৌশল অনুসরণ করছে। তারা সরাসরি সত্য প্রকাশ বন্ধ না করে গণমাধ্যমের জন্য এমন একটি পরিবেশ তৈরি করছে, যেখানে ক্ষমতাসীনদের প্রশংসা জোরালোভাবে শোনা যায়, আর ভিন্নমত কেবল ক্ষীণ ফিসফাসে সীমাবদ্ধ থাকে।
এ জন্য সরকারি সম্প্রচারমাধ্যমে অনুগত ব্যক্তিদের বসানো, রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞাপন অনুগত পত্রিকায় দেওয়া, কিংবা সরকারি কাজের ওপর নির্ভরশীল ধনকুবেরদের দিয়ে স্বাধীন সংবাদমাধ্যম কিনে নিয়ে কার্যত নিস্ক্রিয় করে দেওয়ার মতো কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় অনড় থাকা গণমাধ্যমগুলোর ওপর বাড়ানো হচ্ছে চাপ। সরকারি বিজ্ঞাপন তো বটেই, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখতে বলা হচ্ছে। নিয়মিত কর নিরীক্ষা, হয়রানিমূলক মামলা তাদের নিত্যদিনের বাস্তবতা। আরএসএফের জরিপে ১৮০ দেশের মধ্যে ১৬০টিতেই সংবাদমাধ্যম আর্থিকভাবে টিকে থাকার লড়াইয়ে আছে।
ব্যক্তিগত পর্যায়েও সাংবাদিকরা লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন। বিশেষ করে নারী সাংবাদিকরা অনলাইন হয়রানি ও হুমকির শিকার হচ্ছেন বেশি। জাতিসংঘের এক জরিপে দেখা গেছে, ৭৫ শতাংশ নারী সাংবাদিক অনলাইনে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং ৪২ শতাংশ সরাসরি হুমকি বা হয়রানির মুখে পড়েছেন। অনেক দেশে জাতীয় নিরাপত্তা বা ‘ভুয়া খবর’ দমনের আইনের মাধ্যমে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে।
প্রযুক্তি ও নতুন চ্যালেঞ্জডিজিটাল প্রযুক্তি একদিকে যেমন নতুন কণ্ঠকে সুযোগ দিয়েছে, অন্যদিকে সরকারগুলোকেও দিয়েছে নজরদারির নতুন অস্ত্র। কিছু দেশে বিক্ষোভের সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। আবার কোথাও সাংবাদিকদের ফোন হ্যাক করে সূত্র চিহ্নিত করা হচ্ছে, ব্যক্তিগত ছবি ফাঁস করে ভয় দেখানো হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও এখানে বদলে গেছে। একসময় বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে সক্রিয় থাকা যুক্তরাষ্ট্র এখন সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে। স্বাধীন আন্তর্জাতিক সম্প্রচারমাধ্যমে সহায়তা বন্ধ হওয়ায় বিভিন্ন দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসকেরা আরও সাহস পাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবাদমাধ্যমের জবাবদিহি থাকা দরকার—এ কথা সত্য। তবে সাংবাদিকদের কাজ করতে বাধা দিলে সমাজকেই তার মূল্য দিতে হবে। শক্তিশালী সংবাদমাধ্যম কাঠামো একবার ধ্বংস হলে তা পুনর্গঠন করা কঠিন। আর সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কমে গেলে বিশ্ব আরও দুর্নীতিগ্রস্ত ও আরও খারাপভাবে শাসিত হবে।
কেএএ/