এক সময় নির্বাচন মানেই ছিল দেওয়ালজুড়ে পোস্টার, রশির সঙ্গে পোস্টার লাগিয়ে খুঁটি ও গাছে গাছে টানানো, ব্যানার-ফেস্টুনে ঢাকা শহর থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটা গ্রাম কিংবা মহল্লার মোড়ে ভরে যেতো। ভোরের আলো ফোটার আগেই পোস্টার লাগানোর দৌড়, আবার গভীর রাতে প্রতিপক্ষের পোস্টার ছিঁড়ে ফেলার নীরব যুদ্ধ। নির্বাচনি মৌসুম এলেই বদলে যেত শহরের চেহারা পরিকল্পনাহীন রং, কাগজ আর প্লাস্টিকের ভারে ক্লান্ত হয়ে পড়ত চারপাশ। তবে এবার নেই আর সেই চেনা দৃশ্য।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের নির্বাচনি ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। প্রথমবারের মতো নির্বাচন কমিশনের কঠোর নির্দেশনায় পোস্টারবিহীন প্রচারণা বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে দেয়ালে নয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেই হবে ভোটের লড়াই। যা যথাযথভাবেই পালন করছেন প্রতিটি দলের নেতাকর্মীরা। এই পরিবর্তন শুধু নির্বাচনি কৌশলের নয়; এটি একটি মানসিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরের গল্প। একই সঙ্গে এটি পরিবেশ রক্ষার এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী আন্দোলন।
দেশের প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে কয়েক কোটি পোস্টার ব্যবহার করা হতো, যার বেশিরভাগই একবারের জন্যই। এসব পোস্টার রশি দিয়ে টানানো হতো এবং বাসাবাড়ি, অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন দেওয়ালে লাগানো হতো। ফলে দেওয়ালের রং নষ্ট হয়ে যেত এবং তার সৌন্দর্য হারিয়ে যেত, কারণ এই পোস্টারগুলো বছরের পর বছর একই দেওয়ালে লেগে থাকত।
ভোটার আইডি কার্ড অনলাইন কপি ডাউনলোড করবেন যেভাবে
এছাড়া নির্বাচন শেষ হওয়ার পর সেই পোস্টার ও ব্যানারগুলো পরিণত হতো আবর্জনায় এবং নালা-নর্দমা ভরে যেত। বিশেষ করে লেমিনেটেড পোস্টার পরিবেশের জন্য দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতো। এক কথায় নির্বাচনি পোস্টার শুধুই দৃষ্টিদূষণ নয়, এটি পরিবেশ দূষণেরও একটি বড় উৎস।
এবারের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে পোস্টার নিষিদ্ধ হওয়ায় যেন হঠাৎ করেই শহর-গ্রাম হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। দেয়ালগুলো আবার নিজের রঙে ফিরেছে, গাছগুলো আর দড়ির বোঝা বইছে না। নির্বাচন এলেও প্রকৃতি আর আতঙ্কিত নয়।
তবে এই শূন্যতা পূরণ করেছে সোশ্যাল মিডিয়া। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, এক্স ও ইনস্টাগ্রাম এখন নির্বাচনী প্রচারণার মূল ময়দান। প্রার্থীদের বক্তব্য, কর্মসূচি, প্রতিশ্রুতি ছড়িয়ে পড়ছে লাইভ ভিডিও, গ্রাফিক্স, শর্ট ভিডিও আর পোস্টের মাধ্যমে। মাঠের সভার পাশাপাশি চলছে ফেসবুক লাইভ, প্রশ্নোত্তর সেশন, ভার্চুয়াল জনসংযোগ। তরুণ ভোটারদের জন্য এটি একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা, রাজনীতি এখন তাদের হাতের মুঠোয়।
ঘরে বসেই ৪ উপায়ে জেনে নিন ভোটার নম্বর
এই ডিজিটাল প্রচারণা শুধু আধুনিকই নয়, এটি তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধবও। পোস্টার ছাপানোর জন্য যে অর্থ ব্যয় হতো, এখন তা ব্যবহার হচ্ছে কনটেন্ট তৈরিতে। এতে একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষা পাচ্ছে, অন্যদিকে রাজনীতিতে প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ছে।
বাংলাদেশের মোট ভোটারের একটি বড় অংশ তরুণ। পোস্টারনির্ভর প্রচারণা তাদের খুব একটা টানত না। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছানোয় তরুণদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। যেখানে তারা প্রশ্ন করছে, মন্তব্য করছে, সমালোচনা করছে এবং প্রার্থীরাও সরাসরি জবাব দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে রাজনীতির সঙ্গে জনগণের দূরত্ব কিছুটা হলেও কমছে। প্রচারণা আর একমুখী নয়; এটি এখন সংলাপ।
পরিবেশের জন্য পোস্টারের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির গবেষক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম। পরিবেশ রক্ষায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক স্বর্ণপদক ও জাতীয় পরিবেশ পদক লাভ করেন।
জালভোট দেওয়ার শাস্তি কী জানেন?
মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, নির্বাচন আসে, উৎসব শেষ হয়, কিন্তু প্রকৃতির বুকে রেখে যায় এক গভীর ক্ষত। আগে দেখতাম, কাগজের পোস্টারে ঢেকে যেত শহরের প্রতিটি দেয়াল ও অলিগলি। বৃষ্টিতে ভিজে সেই কাগজ রাস্তা নোংরা করত, ড্রেন বন্ধ করে জলাবদ্ধতা বাড়াত। কিন্তু এর চেয়েও ভয়াবহ ছিল পলিথিনে মোড়ানো লেমিনেটেড পোস্টার। দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কারণে এই পলিথিনযুক্ত বর্জ্য বছরের পর বছর পরিবেশের শ্বাসরোধ করেছে।
তিনি আরও বলেন, মাটি খুঁড়লে আজও বেরিয়ে আসে বিগত নির্বাচনের সেই প্লাস্টিক বর্জ্য। শত বছর ধরে নীরবে মাটির উর্বরতাশক্তি ধ্বংস করে যাচ্ছে এই অপচনশীল আবর্জনা। মাটির নিচে এদের অবস্থান যেন এক নীরব ঘাতকের মতো, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পরিবেশের ক্ষতি করে চলেছে।
আপনার ভোটকেন্দ্র কোথায় জানতে পারবেন এই অ্যাপে
এই পরিবেশ গবেষক বলেন, ‘সবচেয়ে বেশি কষ্ট লাগত, যখন দেখতাম জীবন্ত গাছের বুকে হাজার হাজার পেরেক ঠুকে বিলবোর্ড লাগানো হচ্ছে। বোবা গাছগুলোর সেই নীরব চিৎকার যেন শোনার কেউ ছিল না। আজকের দৃশ্যটা ভিন্ন। যা দেখে বুকটা শান্তিতে ভরে যায়। দেয়ালগুলো পরিষ্কার, গাছগুলো পেরেকের যন্ত্রণা থেকে মুক্ত। ডিজিটাল প্রচারণায় কাগজের অপচয় ও পলিথিনের দূষণ দুটোই কমেছে। আসুন, এই ইতিবাচক পরিবর্তনকে ধরে রাখি। প্রকৃতি হাসলে, তবেই হাসবে বাংলাদেশ।’
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ব যখন জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাব মোকাবিলা করছে, তখন বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ শুধু বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন। নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্ত শুধু প্রশাসনিক নয়, এটি একটি নৈতিক বার্তাও বহন করে। যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, তবে ভবিষ্যতের নির্বাচনগুলো আরও পরিচ্ছন্ন, আরও পরিবেশবান্ধব এবং আরও প্রযুক্তিনির্ভর হতে পারে। পোস্টারহীন এই নির্বাচন সেই সাহসী পদক্ষেপেরই নাম যেখানে রাজনীতি ও পরিবেশ একসঙ্গে হাঁটছে, সবুজ ভবিষ্যতের পথে।
আরও পড়ুনইতিহাসে বিশ্ব নেতাদের আলোচিত উত্থান, পতন ও পরিসমাপ্তিভোটার আইডি কার্ড অনলাইন কপি ডাউনলোড করবেন যেভাবে
কেএসকে