বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষে সফল কলেজছাত্র মামুন

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ঝালকাঠি
প্রকাশিত: ০১:৫৯ পিএম, ২৮ জুন ২০২০

ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার বারবাকপুর গ্রামের কলেজছাত্র মামুন বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষ শুরু করেছেন। বাড়ির আঙিনায় বৃত্তাকারে বাঁশের বেড়া দিয়ে ত্রিপল বিছিয়ে ট্যাংকি স্থাপন করে এপ্রিল মাসে তেলাপিয়া মাছের রেণু পোনা দিয়ে প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করেন। বর্তমানে সেখানে ২-৩ ইঞ্চি মাপের ১০ হাজার তেলাপিয়া পোনা রয়েছে। মো. আল মামুন ঝালকাঠি সরকারি কলেজের বিএসসি ২য় বর্ষের ছাত্র এবং রাজাপুর উপজেলার বারবাকপুর গ্রামের সাইদুল হক মাঝির ছেলে।

মো. আল মামুন জানান, তিনি ইউটিউবে বিভিন্ন ভিডিও দেখে উদ্বুদ্ধ হন। এরপর ঝালকাঠি যুব উন্নয়নে মৎস্য চাষের উপর ১ মাস ব্যাপী প্রশিক্ষণ নেন। এ সময় ঝালকাঠি জেলা মৎস্য অধিদফতরের খামার ব্যবস্থাপক মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের সাথে কথা বলে উদ্যোগ বেড়ে যায়। তাদের পরামর্শ ও সহায়তায় গত এপ্রিল মাসে বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষের কার্যক্রম শুরু করেন। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বাবুল কৃষ্ণ ওঝা এবং খামার ব্যবস্থাপক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন প্রকল্প পরিদর্শন করেন। ওই বাড়ির আঙিনায় স্থানীয়দের মাছ চাষ বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেন মৎস্য কর্মকর্তারা।

মাছ চাষের পদ্ধতি হিসেবে মামুন জানান, আঙিনায় নিজস্ব অর্থায়নে ১৩ ফুট বৃত্তাকারে ভেতরের মাপ রেখে বাইরে বাঁশের খুঁটির বেড়া দেওয়া হয়। এর মধ্যে ত্রিপল বিছিয়ে নিজস্ব পুকুর থেকে ১০ হাজার লিটার পানি দিয়ে মাছ চাষের ক্ষেত্র তৈরি করে চুন ছিটিয়ে পানিকে জীবাণুমুক্ত করা হয়। ঝালকাঠি মৎস্য অধিদফতরের খামার ব্যবস্থাপকের কাছ থেকে ১০ হাজার তেলাপিয়া মাছের রেণু পোনা এনে চাষের কার্যক্রম শুরু করা হয়। আবদ্ধ স্থানে মাছের অক্সিজেন সংকট পড়তে পারে এ জন্য সেখানে কৃত্রিম অক্সিজেনেরও ব্যবস্থা করা হয়।

Mamun-1

মামুন আরও জানান, বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষের জন্য পানির কিছু গুণাবলি দরকার-
১. তাপমাত্রা ২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস
২. পানির রং হবে সবুজ, হালকা সবুজ, বাদামি
৩. দ্রবীভূত অক্সিজেন ৭-৮ মিলিগ্রাম বা লিটার
৪. পিএইচ ৭.৫-৮.৫
৫. ক্ষারত্ব ৫০-১২০ মিলিগ্রাম বা লিটার
৬. খরতা ৬০-১৫০ মিলিগ্রাম বা লিটার
৭. ক্যালসিয়াম ৪-১৬০ মিলিগ্রাম বা লিটার
৮. অ্যামোনিয়া ০.০১ মিলিগ্রাম বা লিটার
৯. নাইট্রাইট ০.১-০.২ মিলিগ্রাম বা লিটার
১০. নাইট্রেট ০-৩ মিলিগ্রাম বা লিটার
১১. ফসফরাস ০.১-৩ মিলিগ্রাম বা লিটার
১২. এইচটুএস ০.০১ মিলিগ্রাম বা লিটার
১৩. আয়রন ০.১-০.২ মিলিগ্রাম বা লিটার
১৪. পানির স্বচ্ছতা ২৫-৩৫ সেন্টিমিটার
১৫. পানির গভীরতা ৩-৪ ফুট
১৬. ফলকের ঘনত্ব ৩০০ গ্রাম বা টন
১৭. টিডিএস ১৪,০০০-১৮,০০০ মিলিগ্রাম বা লিটার
১৮. লবণাক্ততা ৩-৫ পিপিটি।

পানিতে ফ্লক তৈরিতে প্রথম ডোজে ৫ পিপিএম প্রোবায়োটিক, ৫০ পিপিএম চিটাগুড়, ৫ পিপিএম ইস্ট, পানি প্রতি টনের জন্য ১ লিটার, একটি প্লাস্টিকের বালতিতে অক্সিজেন সরবরাহ করে ৮-১০ ঘণ্টা কালচার করে প্রয়োগ করতে হয়। ২য় দিন থেকে ১ পিপিএম প্রোবায়োটিক, ৫ পিপিএম চিটাগুড়, ১ পিপিএম ইস্ট, প্রতি টনের জন্য ১ লিটার পানি দিয়ে উপরের সময় ও নিয়মে কালচার করে প্রতিদিন প্রয়োগ করতে হচ্ছে।

পানিতে যথাযথ পরিমাণ ফ্লক তৈরি হলে-
১. পানির রং সবুজ বা বাদামি দেখায়
২. পানিতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা দেখা যায়
৩. পরীক্ষা করলে পানি অ্যামোনিয়ামুক্ত দেখায়
৪. প্রতি লিটার পানিতে ০.৩ গ্রাম ফ্লকের ঘনত্ব পাওয়া যাবে
৫. ক্ষুদিপানা দেওয়ার পর তাদের বংশ বিস্তার পরিলক্ষিত হয়।

Mamun-1

ইট-সিমেন্ট দিয়ে পাকা ট্যাংকি স্থাপন করলে তাতে মাছের বিচরণে সমস্যা সৃষ্টি হয়। একসময়ে মাছের মাথা, লেজ ও দেহে ক্ষত রোগের সৃষ্টি হয়। তাই বাঁশ ও ত্রিপল দিয়ে ট্যাংকি স্থাপনই মাছ চাষের জন্য উপযোগী। বায়োফ্লক ট্যাংকে সার্বক্ষণিক অক্সিজেন সাপ্লাই দেওয়ার জন্য একটি এরেটর পাম্প স্থাপন করা হয়েছে বলেও জানান মামুন।

কলেজছাত্র মামুন আরও জানান, মাছ চাষের শুরুতে যদি ৩ ইঞ্চি সাইজের পোনা পাওয়া যেত, তাহলে এখন মাছ বিক্রির উপযোগী হতো। রেণু পোনা দিয়ে বায়োফ্লক পদ্ধতিতে তেলাপিয়া মাছ চাষ করায় এখন ২-৩ ইঞ্চি সাইজের পোনা হয়েছে। মাছ যত বড় হচ্ছে ঘনত্বও তত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কয়েকদিনের মধ্যে অল্প কিছু মাছের পোনা বিক্রি করতে হবে। মাছকে বসবাসের উপযোগী করলে একসময়ে চাষে সফলতা আসবে। বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষ করতে গিয়ে অর্ধলক্ষাধিক টাকা ব্যয় হয়েছে বলেও জানান মামুন।

জেলা মৎস্য অধিদফতরের খামার ব্যবস্থাপক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষে উৎসাহ দেখে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শসহ আমরা তাকে যাবতীয় সহায়তা করেছি। এ পদ্ধতিতে মাছ চাষ করতে হলে বেশি পুঁজিরও দরকার হয় না। অল্প পুঁজিতে শুরু করে সঠিক পরিচর্যা করলে সফলতা আসবেই।’

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বাবুল কৃষ্ণ ওঝা বলেন, ‘মামুন বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষ শুরু করেছে। সে আমাদের সাথে যোগাযোগ করে সব ধরনের সহায়তা নিচ্ছে। আমরা তার প্রকল্প পরিদর্শন করেছি, তাকেসহ স্থানীয়দের প্রশিক্ষণও দিয়েছি। মামুনের এ ধরনের আগ্রহ নিয়ে কাজ শুরু করা অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।’

মো. আতিকুর রহমান/এসইউ/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]