মানিকগঞ্জে ৯০ কোটি টাকার গাজর বিক্রির সম্ভাবনা

মো. সজল আলী মো. সজল আলী মানিকগঞ্জ
প্রকাশিত: ১২:১৯ পিএম, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
উপজেলায় মোট ৯০৫ হেক্টর জমিতে গাজর চাষ হয়েছে, ছবি: জাগো নিউজ

>> হিমাগারের অভাবে ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত চাষিরা
>> উপজেলায় মোট ৯০৫ হেক্টর জমিতে গাজর চাষ
>> গাজর বিক্রির সম্ভাবনা ৯০ কোটি টাকা
>> গাজর চাষে খরচ কম লাভ বেশি

মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় গাজর চাষে ঘটেছে নীরব বিপ্লব। অল্প সময়ের মধ্যে বেশি লাভজনক হওয়ায় এ অঞ্চলে গাজর এখন শুধু ফসল নয় বরং অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি। গাজর চাষ করে এ উপজেলার কৃষকেরা ভাগ্যের পরিবর্তন করে চলেছেন। দেশের অন্যতম প্রধান গাজর উৎপাদনকারী এলাকা হিসেবে পরিচিত সিংগাইর বর্তমানে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা ও বড় শহরের সবজি বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

কৃষক, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সিংগাইরের গাজর চাষ এখন সফল কৃষি অর্থনীতির মডেলে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়ভাবে এলাকাটি এখন অনেকের কাছে ‘গাজর গ্রাম’ নামে পরিচিত।

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে সিংগাইর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ৯০৫ হেক্টর জমিতে গাজর চাষ হয়েছে। পাইকারি বাজারে গাজরের বর্তমান গড় মূল্য কেজিপ্রতি ২০ টাকা ধরলে এ বছর সিংগাইর উপজেলায় প্রায় ৯০ কোটি টাকার গাজর বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে।

gazar

স্থানীয়দের দাবি, মৌসুম শেষে এই অঙ্ক ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এ চাষের মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার ৮০০ কৃষক সরাসরি লাভবান হচ্ছেন। পাশাপাশি অসংখ্য গাজর ব্যবসায়ী ও শত শত শ্রমিকের জন্য তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ। গাজরের পাতা এবং তৃতীয় গ্রেডের গাজর গরু-ছাগলের খাদ্য হিসেবেও বড় ধরনের জোগান দিচ্ছে।

বেলে-দোঁআশ মাটির কারণে সিংগাইর গাজর চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। আশ্বিন-কার্তিক মাসে বীজ বপনের পর মাত্র ৯০ থেকে ১২০ দিনের মধ্যেই গাজর পরিপক্ব হয়। জয়মন্টপ, ধল্লা, সিংগাইর সদর, শায়েস্তা, জামির্ত্তা, তালেবপুর ও বায়রা ইউনিয়নসহ উপজেলার প্রায় সব এলাকায়ই এ বছর ব্যাপক চাষ হয়েছে।

স্থানীয় কৃষকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বিঘা জমিতে গাজর চাষে খরচ পড়ে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। ভালো ফলন হলে প্রতি বিঘা জমি থেকে ১২০ থেকে ১৫০ মণ পর্যন্ত গাজর উৎপাদন হয়। বর্তমানে জমি থেকেই প্রতি বিঘা গাজর ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এতে খরচ বাদ দিয়ে বিঘাপ্রতি ৪০ থেকে ৬০ হাজার টাকা লাভ থাকছে, যা অন্য যে কোনো শীতকালীন ফসলের তুলনায় অনেক বেশি।

জয়মন্টপ ইউনিয়নের চরদুর্গাপুর এলাকার গাজর চাষি মো. শামিম বলেন, ‌‘দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে গাজর চাষ করছি। এ বছর নিজের ও ভাড়া জমিসহ প্রায় ১৫০ বিঘা জমিতে গাজর আবাদ করেছি। মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৭৫ লাখ টাকা। বাজারদর ঠিক থাকলে প্রায় ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকার গাজর বিক্রি করতে পারবো। গাজরই আমার অবস্থার পরিবর্তন এনেছে।’

gazar

একই এলাকার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমি ৩৫ বিঘা জমিতে গাজর চাষ করেছি। খরচ হয়েছে প্রায় ২১ লাখ টাকা। নিজে শ্রমিক নিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে ঢাকার বিভিন্ন পাইকারি বাজারে বিক্রি করি। বিক্রি ভালো হলে প্রায় ৩২ লাখ টাকা আয় হবে।’

দেওলী গ্রামের চাষি মো. ইদ্রিস বেপারী বলেন, ‘এ মৌসুমে ২৮ বিঘা জমিতে গাজর করেছি। খরচ হয়েছে প্রায় ১৩ লাখ টাকা। বিক্রি করতে পারলে ২৬ থেকে ২৮ লাখ টাকা পাওয়ার আশা করছি। তবে বীজ ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ও সার-কীটনাশকের উচ্চমূল্য আমাদের লাভ কমিয়ে দিচ্ছে।’

চরআজিমপুরের কৃষক বাবুল হোসেন বলেন, ‘অন্য ফসলের তুলনায় গাজরে লাভ অনেক বেশি। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে গাজর পরিষ্কার ও বাজারজাতকরণে এসেছে বড় পরিবর্তন। মেশিনের মাধ্যমে আগের তুলনায় একই সময়ে তিনগুণ বেশি গাজর পরিষ্কার করা সম্ভব হচ্ছে।’

ভূমদক্ষিণ গ্রামের ব্যবসায়ী মো. আজমত আলী বলেন, ‘কৃষকের জমি থেকেই গাজর কিনে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করি। দাম স্থিতিশীল থাকলে লাভ ভালো হয়, তবে মৌসুমীর শেষের দিকে বৃষ্টির ঝুঁকি থাকে।’

gazar

সিংড়ায় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাবিবুল বাশার চৌধুরী বলেন, ‘সিংগাইরের মাটি ও জলবায়ু গাজর চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহারে উৎপাদন ও গুণগত মান বেড়েছে। পরিকল্পিত বাজার ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো গেলে এ অঞ্চলের গাজর দেশের সবজি অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখবে।’

এসইউ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।