চাকরি না পাওয়ায় কটূক্তি, সুমির খামারে এখন কৃষকের ভিড়

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক বগুড়া
প্রকাশিত: ০৯:৫৮ এএম, ০১ মে ২০২৬
গ্রামের মাটিতে দাঁড়িয়ে এখন সুমি নতুন এক বাস্তবতার উদাহরণ, ছবি: জাগো নিউজ
  • প্রতিদিন কৃষকেরা আসেন তার খামারে
  • গ্রামের তরুণ ও নারীদের কর্মসংস্থানেরও কেন্দ্র হয়ে উঠেছে
  • জৈব সারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ
  • ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সামনে বড় বাধা মূলধন সংকট
  • পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স ডিগ্রিটা ঘরে থাকার পরও রাজিয়া সুলতানা সুমিকে নিয়ে গ্রামে কম হাসাহাসি হয়নি। কেউ বলেছেন, ‌‘এত পড়াশোনা করে শেষমেশ কেঁচো চাষ?’ কেউ আবার তাচ্ছিল্যের সুরে বলেছেন, ‘চাকরি পায়নি, তাই এখন গোবর নিয়ে পড়ে আছে।’ আত্মীয়-স্বজনের অনেকেই পরিবারের সামনে প্রশ্ন তুলেছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়ে শেষ পর্যন্ত লাভটা কী হলো? কিন্তু কয়েক বছর পর সেই একই গ্রামের চিত্র বদলে গেল। এখন বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার গড়িয়ারপাড়ায় প্রতিদিন কৃষকেরা আসেন তার খামারে। কেউ জৈব সার কিনতে, কেউ শিখতে, কেউ আবার নিজের সন্তানকে স্বচক্ষে দেখাতে যে, পড়াশোনা করে এভাবেও কিছু করা যায়।

ঢাকার চাকরির বাজার ছেড়ে গ্রামে ফিরে আসা এই তরুণী এখন শুধু একজন উদ্যোক্তা নন, স্থানীয়দের কাছে তিনি বদলে যাওয়া এক বাস্তবতার নাম। তার গড়ে তোলা ‘শামিমা এগ্রো ফার্ম’ এখন জৈব সার উৎপাদনের পাশাপাশি গ্রামের তরুণ ও নারীদের কর্মসংস্থানেরও কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি গ্রামীণ উদ্যোক্তা তৈরির ছোট্ট আন্দোলনের কেন্দ্রও এটি।

যে বয়সে বেশিরভাগ তরুণ-তরুণী বিসিএস কোচিং, করপোরেট চাকরি কিংবা বিদেশে যাওয়ার স্বপ্নে ব্যস্ত; সেই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করা সুমি বেছে নিয়েছেন গ্রামের মাটি। শুরু করেছিলেন ছোট্ট জৈব সার প্রকল্প দিয়ে। শিবগঞ্জ উপজেলার গড়িয়ারপাড়া গ্রামের কৃষক পরিবারে জন্ম সুমির। ছোটবেলা থেকেই দেখেছেন বাবার মাঠে ঘাম ঝরানো শ্রম। ধান, গম, শাক-সবজি সবকিছুর সঙ্গেই পরিচয় ছিল তার। তবে পরিবারের স্বপ্ন ছিল মেয়েকে উচ্চশিক্ষিত করা। সেই স্বপ্নপূরণ করেই তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগে। ২০২০ সালে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করেন।

bogra

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তারও স্বপ্ন ছিল ভালো চাকরি করার। বন্ধুদের মতো তিনিও চাকরির প্রস্তুতি নিয়েছেন, পরীক্ষাও দিয়েছেন। কিন্তু একসময় বুঝতে পারেন, শহরের চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা শুধু কঠিনই নয়, অনিশ্চিতও। দীর্ঘ অপেক্ষা, সীমিত সুযোগ আর ক্রমবর্ধমান হতাশা তাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে। সুমি জাগো নিউজকে বলেন, ‘একসময় মনে হলো, আমি যে গ্রাম থেকে উঠে এসেছি; সেই গ্রামের জন্যই তো কিছু করা যায়। কৃষি আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িত। অথচ এই খাতকে এখনো অনেকে পিছিয়ে থাকা পেশা মনে করেন।’

পড়াশোনা করার সময় পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে রাসায়নিক সারের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জানতে পারেন। কৃষি গবেষণা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্য ঘেঁটে তিনি দেখেন, দীর্ঘদিন অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারে অনেক জমির জৈব গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মাটির উর্বরতা কমছে, উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে জমির পানি ধারণক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। সেই ভাবনা থেকেই তার মাথায় আসে জৈব সার উৎপাদনের পরিকল্পনা।

মাস্টার্স শেষ করে ঢাকায় থেকে চাকরির পেছনে না ছুটে ফিরে আসেন গ্রামে। বাবার জমির এক কোণে বড় বোন শামিমা বেগমকে সঙ্গে নিয়ে শুরু করেন ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার উৎপাদন। শুরুটা ছিল খুব ছোট। কয়েকটি কংক্রিটের রিং, কিছু কেঁচো আর অল্প পুঁজিই ছিল সম্বল। কিন্তু কাজ শুরুর পরই শুরু হয় সামাজিক চাপ। গ্রামের অনেকেই অবাক হয়ে দেখতেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী মাঠে কাজ করছেন। কেউ কটাক্ষ করে বলতেন, ‘চাকরি না পেয়ে এখন এসব করছে।’ কেউ আবার পরিবারের সমালোচনা করতেন, ‘এত টাকা খরচ করে মেয়েকে পড়িয়ে লাভ কী হলো?’

সুমি বলেন, ‘প্রথম দিকে খুব কষ্ট হতো। আত্মীয়-স্বজন পর্যন্ত নানা কথা বলতেন। কিন্তু আমি ভাবলাম, কৃষি যদি দেশের মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, তাহলে এই পেশাকে ছোট করে দেখার কিছু নেই। শুরুতে প্রযুক্তিগত সমস্যাও কম ছিল না। কখনো কেঁচো মারা গেছে, কখনো উৎপাদন ঠিক হয়নি। আবার বাজার তৈরি করাও সহজ ছিল না। কৃষকেরা প্রথম দিকে জৈব সারের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতেন। অনেকেই মনে করতেন, রাসায়নিক সার ছাড়া ফলন সম্ভব নয়।’

bogra

তবে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। স্থানীয় কয়েকজন কৃষক পরীক্ষামূলকভাবে তাদের সার ব্যবহার করেন। পরে ফলাফল দেখে অন্যদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হয়। গড়িয়ারপাড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘আগে শুধু ইউরিয়া আর রাসায়নিক সার ব্যবহার করতাম। পরে সুমির কাছ থেকে জৈব সার নিয়ে জমিতে ব্যবহার করি। দেখি মাটি নরম হচ্ছে, গাছের অবস্থাও ভালো। এখন নিয়মিত ব্যবহার করি।’

বর্তমানে শামিমা এগ্রো ফার্মে একাধিক বেডে নিয়মিত জৈব সার উৎপাদন হচ্ছে। স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকেও কৃষকেরা সার নিতে আসছেন। অনেক কৃষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খামারের ভিডিও দেখে যোগাযোগ করছেন বলেও জানান উদ্যোক্তারা। তবে শুধু সার উৎপাদনেই থেমে থাকেননি সুমি। তিনি বুঝতে পারেন, গ্রামের তরুণদের কর্মসংস্থান তৈরি না হলে পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তাই স্থানীয় যুবকদের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন। পরে তাদের নিয়ে ‘চেতনায়ন’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। এ সংগঠনের মাধ্যমে এখন কয়েকজন তরুণ ছোট পরিসরে নিজস্ব জৈব সার উৎপাদন করছেন। কেউ আবার বাজারজাতকরণে যুক্ত হয়েছেন।

প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ শুরু করা তরুণ রফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আগে কাজের জন্য শহরে যেতে হতো। এখন গ্রামের মধ্যেই আয় করার পথ পেয়েছি। সুমির কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেও ছোট আকারে কেঁচো সার উৎপাদন করছি। গ্রামের নারীদের জন্যও এই উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। গৃহস্থালির কাজের ফাঁকে অনেক নারী এখন ছোট পরিসরে জৈব সার উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন।’

স্থানীয় গৃহবধূ রাশিদা বেগম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আগে শুধু ঘরের কাজই করতাম। এখন কয়েকজন মিলে সার তৈরি করি। এতে সংসারে বাড়তি আয় হয়।’ আরেক নারী নাসিমা খাতুন বলেন, ‘গ্রামে মেয়েদের কাজের সুযোগ কম। এই কাজ ঘরের কাছেই করা যায়। তাই অনেক নারী আগ্রহী হচ্ছেন।’

bogra

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষিত তরুণদের কৃষিতে যুক্ত হওয়া বাংলাদেশের কৃষিখাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। কারণ আধুনিক কৃষিতে এখন শুধু শ্রম নয়, প্রয়োজন প্রযুক্তি, পরিকল্পনা এবং বাজার ব্যবস্থাপনার জ্ঞানও। শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান বলেন, ‘জৈব সারের ব্যবহার এখন সময়ের দাবি। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করতে হলে রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। সুমির মতো শিক্ষিত উদ্যোক্তারা কৃষিতে এলে নতুন চিন্তা ও প্রযুক্তি যুক্ত হয়।’

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গবেষণায়ও দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদে মাটির জৈব গুণাগুণ ধরে রাখতে জৈব সারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের কৃষিপ্রধান এলাকাগুলোতে এখন মাটির উর্বরতা ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, জৈব সার ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতে উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়তে পারে। তবে সম্ভাবনা তৈরি হলেও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সামনে বড় বাধা মূলধন সংকট। চাহিদা বাড়লেও পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকায় উৎপাদন সম্প্রসারণ করা যাচ্ছে না।

উদ্যোক্তা সুমি বলেন, ‘অনেক জায়গা থেকে সার চাওয়া হয়। কিন্তু পুঁজি সীমিত হওয়ায় উৎপাদন বাড়াতে পারছি না। সহজ শর্তে ঋণ বা সরকারি সহায়তা পেলে আরও বড় পরিসরে কাজ করা সম্ভব।’ ভবিষ্যতে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তরুণ-তরুণীদের জৈব সার উৎপাদন, আধুনিক কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ব্যবস্থাপনা শেখানো তার একটি স্বপ্ন। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব কৃষি নিয়ে সচেতনতা তৈরিরও পরিকল্পনা রয়েছে।’

সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান (সুপ্র) বগুড়া জেলা সম্পাদক কেজিএম ফারুক মনে করেন, ‘সুমির গল্প শুধু একজন উদ্যোক্তার গল্প নয়, এটি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলেরও গল্প। সমাজে এখনো কৃষিকে অনেক সময় শেষ বিকল্প হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী যখন কৃষিকে উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন; তখন সেটি বড় বার্তা দেয়। সুমি দেখিয়ে দিয়েছেন, শিক্ষা মানেই শুধু চাকরি নয়। শিক্ষা দিয়ে নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি করা যায়। গ্রামের মাটিতে দাঁড়িয়ে এখন সুমি নতুন এক বাস্তবতার উদাহরণ। শহরমুখী তরুণ সমাজের ভিড়ে তিনি উল্টো পথে হাঁটছেন। সেই পথ কঠিন ছিল, এখনও আছে। কিন্তু সেই পথেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন নিজের পরিচয়।’

এলবি/এসইউ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।