সীমিত বরাদ্দ দিয়েও ঢামেকে চিকিৎসার মান উন্নয়ন সম্ভব


প্রকাশিত: ০৪:০০ এএম, ২৮ মার্চ ২০১৬

‘সরকারি হাসপাতালে টাকার অভাব নেই! প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা ও ঘাটতির কারণে আর্থিক সংকটকে বড় করে দেখা হয়। সরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপ ও সামগ্রিক চাহিদার তুলনায় বরাদ্দকৃত বাজেট অপ্রতুল এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে পারলে ওই সীমিত বরাদ্দ দিয়েই চিকিৎসা সেবার মান উন্নত করা সম্ভব।’

সম্প্রতি জাগো নিউজের এ প্রতিবেদকের সঙ্গে এক সংক্ষিপ্ত আলোচনায় খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এসব কথা বলেন দেশের অন্যতম বৃহৎ সরকারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বর্তমান পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল ডা. মিজানুর রহমান।

ঢামেক থেকে এমবিবিএস পাশ করা সাবেক এই শিক্ষার্থী প্রায় এক বছর আগে হাসপাতালের পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। যোগদানের পর থেকে চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করে হাসপাতালের সার্বিক সেবার মান বাড়ানোর ব্যাপারে সবার সহযোগিতা কামনা করেন।

হাসপাতালে আগত সব রোগী যেন সন্তুষ্টি নিয়ে ও কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানিয়ে বাড়ি ফিরে যান এমনটাই স্বপ্ন তার। সবার সহযোগিতায় আগের তুলনায় চিকিৎসা সেবার মান বাড়াতে অনেকটাই সক্ষম হয়েছেন বলেও জোর দাবি করেন তিনি।

জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি বর্তমানে ২৬শ’ বেডের বৃহৎ এ হাসপাতালে (ঢামেক) দামি অ্যান্টিবায়োটিকসহ ওষুধ সরবরাহ, চারবেলা উন্নতমানের খাবার, অপেক্ষাকৃত কম খরচে অস্ত্রোপচারের সুযোগ দেশের আর কোন সরকারি হাসপাতালে নেই। মাত্র পাঁচজন দক্ষ কর্মকর্তা পেলে চিকিৎসাসেবার মান আরো তিনগুণ বাড়ানো সম্ভব।’

‘এক বছর আগে যোগদানের সময় ২৬শ’ বেডের হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা ২৮শ’ থেকে ২৯শ’ থাকলেও সম্প্রতি এ সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৮শ’ (সর্বোচ্চ) পর্যন্ত উঠেছে। বর্তমানে হাসপাতালে এমএসআর (ওষুধ, গজ, ব্যান্ডেজ ও তুলা) খাতে বার্ষিক বরাদ্দ ৩৫ কোটি টাকা। অতিরিক্ত সহস্রাধিক রোগীর জন্য পৃথক কোন বাজেট না থাকলেও প্রায় সবাইকে ওষুধপত্র ও খাবারসহ সার্বিক চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে।’

বিগ্রেডিয়ার জেনারেল ডা. মিজানুর রহমান বলেন, হাসপাতালে রোগীর মৃত্যু হতেই পারে। কিন্তু রোগীর স্বজনরা যদি অনুভব করে যে ডাক্তার, নার্স ও কর্মচারীদের রোগীর চিকিৎসা সেবার প্রতি আন্তরিকতার ঘাটতি ছিল না, তবে তারা কখনও অসন্তুষ্টি নিয়ে ফিরে যাবেন না।

কিভাবে সীমিত বাজেটের মধ্যেও হাসপাতালে পরিবর্তন আনতে সক্ষম হলেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘গত এক বছরে প্রশাসনিক ও হাসপাতালের সার্বিক চিকিৎসা সেবা কার্যক্রমের নিয়মিত মনিটরিং, সুপারভিশন, চেকিং ও মোটিভিশনের মাধ্যমে এ পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছি।’

তিনি জানান, প্রতিদিন ব্যক্তিগতভাবে হাসপাতাল রাউন্ড দিয়ে সমস্যা চিহ্নিত করার পাশাপাশি প্রতি সপ্তাহে ও প্রতিমাসে সমন্বয় সভা করছেন। সপ্তাহের সোমবার সকাল ৮টায় বহির্বিভাগে কর্মরত আরপি, আরএস, ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার, রেডিওলজি ও প্যাথলজি যারা প্রতিদিন প্রতিনিয়ত রোগীদের সেবা দিচ্ছেন তাদের সঙ্গে সভা করা হয়।

এছাড়া আউটডোর, ইমার্জেন্সি, রেডিওলজি ও প্যাথলজি বিভাগের চিকিৎসা সেবা প্রদানে কোন সমস্যা থাকলে তা জিইয়ে না রেখে তাৎক্ষণিকভাবে সমাধানের প্রচেষ্টা চালান। ইনডোরে রেজিস্টার, অ্যাসিস্টেন্ট রেজিস্টার, আইএমও যারা ওয়ার্ড চালায় তাদেরসহ বহির্বিভাগে কর্মরতদের সঙ্গে মাসে একবার সমন্বয় সভা করা হয়। উভয়ের কাছ থেকে সমস্যা জেনে তা সমাধান দেন বলেও জানান তিনি।

তিনি আরো জানান, হাসপাতালে কিছু কিছু খাত রয়েছে যেখানে বরাদ্দকৃত বাজেট খরচ হয় না। এসব অব্যয়কৃত খাত খুঁজে বের করে তালিকা তৈরি করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ওই অর্থ অন্য খাতে (যেমন- ওষুধসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য চিকিৎসা দ্রব্যাদি) ব্যয় করার অনুমতি নিয়েছেন। সরকারি হাসপাতালে স্যালাইন সরকারি জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট থেকে ক্রয় করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু তারা চাহিদার তুলনায় খুবই কম সরবরাহ করতে পারে। সেক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় থেকে চাহিদার অতিরিক্ত খোলা দরপত্রের মাধ্যমে ক্রয় করার অনুমতি নেয়া হয়েছে।

ডা. মিজানুর রহমান জানান, একইভাবে এমএসআর খাতের বরাদ্দকৃত অর্থের একটা বড় অংকের টাকার সরকারি ওষুধ অ্যাসেনশিয়াল ড্রাগ কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল) থেকে ক্রয়ের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু ওপেন টেন্ডার পদ্ধতিতে ওষুধের ক্রয় মূল্যের সঙ্গে অ্যাসেনশিয়াল ড্রাগের ওষুধের দাম দুইগুণ। ঢামেক হাসপাতালে বিপুল পরিমাণ অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ লাগে। ইডিসিএল থেকে কিনলে অনেক বেশি টাকা লাগে, তাই মন্ত্রণালয়ে যৌক্তিক তথ্য উপাত্ত জানিয়ে ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে ওষুধ কেনার অনুমতি নেয়া হয়েছে। ফলে সাড়ে ৮ কোটি টাকা সাশ্রয় করতে সক্ষম হয়েছি। বর্তমানে রোগীরা স্বল্পসংখ্যক জটিল রোগব্যাধির দামি ওষুধ ছাড়া প্রায় শতভাগ ওষুধ বিনামূল্যে পাচ্ছে।

ঢামেকের সাবেক এ শিক্ষার্থী জানান, বর্তমানে হাসপাতাল থেকে চারবেলা রোগীদের খাবার দেয়া হচ্ছে। সকালের নাস্তায় পাউরুটি, ডিম, কলা, দুধ, জেলি ও বিস্কুট; দুপুরে ভাত, মাছ, সবজি ও ডাল; বিকেলে চা, বিস্কুট, ফিরনি ও কলা এবং রাতের খাবারে ভাত, মুরগি, সবজি ও ডাল দেয়া হচ্ছে। এত ভাল খাবার দেশের আর কোন সরকারি হাসপাতালে দেয়া হয় না।

হাসপাতাল পরিচালনার ক্ষেত্রে অপ্রাপ্তি বা অসন্তুষ্টি রয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেনাবাহিনীতে সিনিয়ররা ইচ্ছা প্রকাশ করলেই তা আদেশ হয়ে যায়। প্রশাসনিকভাবে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ হওয়ায় যে কোন আদেশ সঙ্গে সঙ্গে তা বাস্তবায়ন হয়ে যায়। কিন্তু ঢামেক হাসপাতালে রাউন্ড দেয়ার সময় সমস্যা চিহ্নিত করে দিলেও তাগাদা না দিলে অনেক সময় আদেশ বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়। এটি একটি অপ্রাপ্তি বা অসন্তুষ্টির জায়গা।

তবে প্রতিনিয়ত সমস্যার সমাধানে তিনি সদা প্রস্তুত উল্লেখ করে ডাক্তার, নার্স, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সমস্যা নিয়ে তার কাছে আসার আহ্বান জানান এ ঢামেক পরিচালক।

এমইউ/আরএস/জেএইচ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।