ইবির কোনো ভিসিই মেয়াদ শেষ করতে পারেননি


প্রকাশিত: ০৭:০৫ এএম, ১০ জুলাই ২০১৬

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে কোনো ভিসিই তার চার বছরের পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। অধিকাংশ ভিসিই দুই থেকে আড়াই বছরের মাথায় পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন অথবা অপসারিত হয়েছেন। এমনকি পাঁচ মাস দায়িত্ব পালন করার পর পদত্যাগ করার ইতিহাসও রয়েছে।

নিয়োগ বাণিজ্য, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতিতে জড়িয়ে আবার কখনো পেশিশক্তির ছাত্ররাজনীতি অথবা নোংরা শিক্ষক রাজনীতির কবলে পড়ে একে একে বিদায় নিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক ১১ ভিসি। সর্বশেষ প্রফেসর ড. আবদুল হাকিম সরকারকে গত ৩০ জুন নির্ধারিত মেয়াদ পূরণের ৫ মাস ২৭ দিন আগেই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তবে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। মেয়াদ পূর্তির আগে ভিসি পদ থেকে অব্যাহতি পেয়ে প্রফেসর ড. আবদুল হাকিম সরকারও ইতিহাস হয়ে থাকলেন।

রেজিস্ট্রার অফিস সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প পরিচালক এবং পরবর্তীতে চার বছরের জন্য প্রথম ভিসি হিসেবে ১৯৮১ সালের ৩০ জানুয়ারি নিযুক্ত হন প্রফেসর ড. এ এন এম মমতাজউদ্দিন চৌধুরী। দ্বিতীয় মেয়াদে ভিসি থাকাকালীন ক্যাম্পাস গাজীপুর থেকে কুষ্টিয়ায় স্থানান্তর নিয়ে তৎকালীন সরকারের সঙ্গে মতবিরোধের জের ধরে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার এক বছর বাকি থাকতেই ১৯৯০ সালের ২৭ ডিসেম্বর তিনি অপসারিত হন।
 
১৯৯০ সালের ২৮ ডিসেম্বর দ্বিতীয় ভিসি হিসেবে চার বছর মেয়াদে নিযুক্ত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম। যৌন কেলেঙ্কারি ও শিক্ষকদের মূল্যায়ন না করার অভিযোগে মাত্র আড়াই বছরের মাথায় ১৯৯১ সালের ১৭ জুন তাকে ক্যাম্পাস ত্যাগ করতে হয়। তিনি মাত্র ৫ মাস ২০ দিন ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
 
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মুহাম্মদ আব্দুল হামিদ ১৯৯১ সালের ২০ জুন তৃতীয় ভিসি হিসেবে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন। তিনি অবৈধ নিয়োগ দিতে অস্বীকার করায় স্থানীয় চাকরি প্রার্থীরা তাকে তার বাসায় তিনদিন অবরোধ করে রাখে বলে জানা যায়। এমনকি তার বাসার টেলিফোন লাইন, বিদ্যুৎ, খাবার ও পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয় চাকরি প্রত্যাশীরা। প্রাণ ভয়ে তিনি রাতের আঁধারে পালিয়ে যান। তিনি ৩ বছর ১০ মাস ১ দিন দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯৫ সালের ৯ মে প্রফেসর মুহাম্মদ ইনাম-উল হক চতুর্থ ভিসি হিসেবে যোগদান করেন। ভয়ঙ্কর এক পরিস্থিতিতে লাঞ্ছিত হয়ে বিদায় নিতে হয় প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইনাম-উল হককে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলনকারীরা তাকে মারধর করে গাড়িতে তুলে দেয়। এরপর তিনি আর ক্যাম্পাসে ফেরেননি। তিনি ২ বছর ৩ মাস ২৪ দিন দায়িত্ব পালন করেন।
 
এরপর ১৯৯৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর পঞ্চম ভিসি হিসেবে নিয়োগ পান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মুহাম্মদ কায়েস উদ্দিন। তার বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম, দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি ও আঞ্চলিকীকরণের অভিযোগে তীব্র আন্দোলন শুরু হলে ২০০০ সালের ১৮ অক্টোবর মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার এক বছর আগেই পদত্যাগ করে চলে যান।
 
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফেসর ড. মুহাম্মদ লুৎফর রহমান ২০০০ সালের ১৯ অক্টোবর ষষ্ঠ ভিসি হিসেবে যোগদান করেন। জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর মাত্র এক বছরের মাথায় ২০০১ সালের ৯ ডিসেম্বর ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যান। তিনি ১ বছর ১ মাস ১ দিন দায়িত্ব পালন করেন।
 
পরে ২০০১ সালে ১০ ডিসেম্বর সপ্তম ভিসি হিসেবে নিযুক্ত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের প্রফেসর ড. মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান। তার কার্যকালে দুই বছরের মাথায় আওয়ামীপন্থী প্রগতিশীল ও বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের একাংশ এবং তাদের সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের লাগাতার আন্দোলনের মুখে মেয়াদ পূর্তির দুই বছর আগেই ২০০৪ সালের ২ এপ্রিল তিনি অপসারিত হন। তিনি ২ বছর ৩ মাস ২৩ দিন দায়িত্ব পালন করেন।
 
সপ্তম ভিসিকে অপসারণের পর ২০০৪ সালের ৩ এপ্রিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. এম রফিকুল ইসলামকে অষ্টম ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। স্থানীয় চাকরি প্রার্থীদের চাপের মুখে ভিসি প্রফেসর ড. এম রফিকুল ইসলাম ২০০৬ সালের ২০ জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন।

চ্যান্সেলর ও প্রধানমন্ত্রী তা অনুমোদন করেন এবং ১০ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ভিসি অফিসে ফ্যাক্স বার্তার মাধ্যামে জানানো হয় ভিসি পদে নতুন নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত ট্রেজারার প্রফেসর ড.এ এস এম আনোয়ারুল করীম তার দায়িত্বে অতিরিক্ত ভিসির আর্থিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করবেন। এ সময় ক্লাস বর্জন করে শিক্ষকরা এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একজন শিক্ষককে ভিসি হিসেবে নিয়োগের দাবিতে আন্দোলন করেন।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রথমবারের মত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রফেসর ফয়েজ মোহাম্মদ সিরাজুল হককে নবম ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেন। নিয়োগ পেয়ে তিনি তার অত্যন্ত কাছের দুর্নীতিবাজ কিছু ঘনিষ্ঠ শিক্ষককে প্রশাসনিক বিভিন্ন দায়িত্ব দেন বলে অভিযোগ ওঠে। এতে তিনিও বিতর্কিত হয়ে পড়েন। পরে ভিসি প্রফেসর ফয়েজ মোহাম্মদ সিরাজুল হক ২০০৯ সালের ১৫ জানুয়ারি শিক্ষা সচিব মোমতাজুল ইসলামের কাছে তার পদত্যাগপত্র জমা দেন।

সিরাজুল হকের পর ২০০৯ সালের ৯ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত ও রাসায়নিক প্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. এম আলাউদ্দিন দশম ভিসি হিসেবে নিয়োগ পান। প্রফেসর ড. এম আলাউদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব নেয়ার পর মোট তিনটি চাকরির সিন্ডিকেট সম্পন্ন করেন। সর্বশেষ ২০১২ সালের ৭ ও ৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১৭তম সিন্ডিকেটে ১২৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগকে কেন্দ্র করে নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগে শিক্ষকরা ভিসি, প্রো-ভিসি ও ট্রেজারারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। শিক্ষকদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালের ২৭ ডিসেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান তাকে ওই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেন।

সর্বশেষ ২০১২ সালের ২৭ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১তম ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের প্রফেসর ড. আবদুল হাকিম সরকার। দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে ইউজিসি থেকে দুই দফা তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

সর্বশেষ গত ৯ ও ১০ এপ্রিল ইউজিসি থেকে একটি তদন্ত টিম ক্যাম্পাসে আসে। তারা শিক্ষক নিয়োগে বিভিন্ন অনিয়মসহ সার্বিক বিষয় তদন্ত করেন। এর আগে ইউজিসির আরেকটি তদন্ত টিম ক্যাম্পাসের সার্বিক বিষয়ে তদন্ত করেছে। অবশেষে ৩০ জুন বৃহস্পতিবার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পদ থেকে ড. আবদুল হাকিম সরকারকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। নির্ধারিত মেয়াদের ৫ মাস ২৭ দিন আগেই তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

বার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় আইন-১৯৮০ এর ১০(১) ধারা অনুযায়ী নিয়োগ আদেশের (ক) শর্তানুসারে ভিসি প্রফেসর ড. আবদুল হাকিম সরকারকে অব্যাহতি প্রদান করেছেন। তবে এই ফ্যাক্স বার্তায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ভিসি হিসেবে কে দায়িত্ব পালন করবেন সে বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়নি। এছাড়া মেয়াদপূর্তির আগেই কেন তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে, সে বিষয়েও কিছু জানা যায়নি। তবে ইউজিসির তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
 
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিগত ১০ ভিসির মত প্রফেসর ড. আবদুল হাকিম সরকার মেয়াদ পূর্তির আগেই অব্যাহতি পেয়ে আগের ইতিহাসই ধরে রাখলেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্যদের মনে প্রশ্ন উঠেছে, ভবিষ্যতেও কোনো ভিসি কি পারবে তার মেয়াদ পূর্ণ করতে?

এফএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।