ঘুষ নিয়ে ‘ভোট কারচুপি’ প্রিজাইডিং অফিসারের!


প্রকাশিত: ০৫:১২ পিএম, ০১ জুন ২০১৬

ঝিনাইদহ সদর উপজেলার মধুহাটি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের এক কেন্দ্রে ভালোভাবে ভোট গণনা না করে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে দুই ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী ঘোষণা ও প্রিজাইডিং অফিসারের ভোট কারচুপির প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন করেছেন এক মেম্বর প্রার্থী। মঙ্গলবার জেলা প্রেসক্লাবে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মিজানুর রহমান (মিনা) এ সংবাদ সম্মেলন করেন। গত শনিবার (২৮ মে) অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি ভ্যানগাড়ি প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

প্রেসক্লাব হল রুমে সকাল ১১টায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য রাখেন ভ্যানগাড়ির প্রার্থী। তিনি অভিযোগ করেন, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়েছেন ওই প্রিজাইডিং অফিসার। এ ছাড়া ভোট গ্রহণের আগের রাতে তিনি প্রার্থী মো. রবিউল ইসলামের (তালা মার্কা) সঙ্গে দেখা করে একসঙ্গে রাতের দাওয়াত খান।

তিনি বলেন, ‘ভোটগ্রহণের দিন ৯ নম্বর ওয়ার্ড কেন্দ্রে দায়িত্বরত প্রিজাইডিং অফিসার ছিলেন এ এইচ এম হুমায়ুন কবির। তিনি ঝিনাইদহ সরকারি কে সি কলেজের রসায়ন বিভাগের প্রভাষক। ভোট গণনাকালে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মো. রবিউল ইসলামের (তালা মার্কা) পক্ষ অবলম্বন করেন। কোনোমতে প্রিজাইডিং একবার ভোট গণণা করেই ফল প্রকাশ করেন। ঠিকমতো ভোট গণনা না করেই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে দুই ভোট বেশি দেখিয়ে বিজয়ী ঘোষণা করেন।

ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি বলেন, ভোট গণনা প্রক্রিয়ায় সন্দেহ থাকায় কেন্দ্রে নিয়োজিত আমার পোলিং এজেন্ট ভোট আরেকবার গণনা করার জন্য প্রিজাইডং অফিসারকে অনুরোধ করেন। কিন্তু প্রিজাইডিং অফিসার তাতে কর্ণপাত করেননি। এ ছাড়া ভোট গণণা শেষে বলা হয় মোট ৮০টি ভোট বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর (তালা মার্কা) ১৯টি ও আমার (ভ্যানগাড়ি মার্কা) ৬১টি। কিন্তু ভোট গণনার সময় প্রিজাইডিং অফিসার পোলিং এজেন্ট বাতিল ভোট দেখাননি। ভোট গণনা শেষে পোলিং এজেন্ট বাতিল ভোট দেখতে চাইলেও প্রিজাইডিং অফিসার দেখাবেন বলে আশ্বাস দেন। কিন্তু পরে আর দেখাননি। ওই প্রার্থী অভিযোগ করেন ভোট গণনার আগেই প্রিজাইডিং অফিসার কৌশলে রেজাল্ট শিটে পোলিং এজেন্টের স্বাক্ষর নিয়ে রাখেন। যা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন বিধিমালার পরিপন্থি।

সংবাদ সম্মেলনকালে ভোট পুনরায় গণনা ও প্রিজাইডিং অফিসারের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় শাস্তি দাবি করেন। সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে কারচুপির স্বপক্ষে কেন্দ্রে পড়ে থাকা ব্যালট পেপারসহ বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত তুলে ধরেন মিজানুর রহমান মিনা। মিনা বলেন, ‘প্রিজাইডিং অফিসার ঠিকমতো বৈধ ব্যালট পেপারও সংগ্রহ করেননি। যে রুমে ভোট গ্রহণ করা হয়েছিল সেখানে চেয়ারম্যান ও মেম্বর প্রার্থীদের দুইটি ব্যালট পেপার পড়ে ছিল। সকালে তা কুড়িয়ে পাওয়া যায়।’

সাংবাদিক সম্মেলনে কুড়িয়ে পাওয়া দুইটি ব্যালট পেপারের ফটোকপি দেখানো হয়। অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রিজাইডিং অফিসার এ এইচ এম হুমায়ুন কবির বলেন, ‘ভোট একবার গণনা করা হয়েছিল।’ পোলিং এজেন্টের আপত্তি থাকার পরও ভোট পুনরায় গণনা করা হয়নি কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ট্রেনিং করার সময় আমাকে একবার গণনা করার কথা বলা হয়েছিল।

বাতিল ভোট কেন পোলিং এজেন্টকে দেখানো হয়নি জানতে চাইলে প্রিজাইডিং অফিসার বলেন, ‘পোলিং এজেন্ট বাতিল ভোট দেখতে চেয়েছিল। আমি দেখাইনি। বিষয়টি বুঝতে পারিনি।’ কেন্দ্রে বৈধ ব্যালট পেপার পড়ে থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এমনটি হওয়ার কথা না। কীভাবে ব্যালট পেপার কেন্দ্রে রয়ে গেছে তা বুঝতে পারছি না।’

মিজানুর রহমান মিনা’র (ভ্যান গাড়ি) পোলিং এজেন্ট আলতাফ হোসেন পরিবর্তনকে বলেন, ‘ভ্যানগাড়ি মার্কার যে ৬১টি ভোট বাতিল করা হয়েছে তার মধ্যে আমাদের অনেক ভালো ভোট আছে। এ কারণেই আমাদের বাতিল ভোট দেখানো হয়নি। আমি প্রিজাইডিং অফিসারকে বাতিল ভোট দেখানোর জন্য বারবার অনুরোধ করেছি কিন্তু প্রিজাইডিং অফিসার আমার কথা শোনেননি।’

উপজেলা নির্বাচন অফিসার মো. মোখলেচুর রহমান বলেন, ‘আমি কোনোপ্রকার লিখিত অভিযোগ পাইনি। তবে নির্বাচনের পরের দিন ওই ওয়ার্ড থেকে প্রার্থীসহ কিছু লোক আমার কাছে এসেছিলেন। আমি তাদের মুখে এই ঘটনা শুনেছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘ওই প্রার্থীর কোনো অভিযোগ থাকলে তা গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করতে হবে। ৩ মাসের মধ্যে রায় ঘোষণা করা হবে। যিনি হেরে যাবেন তিনি চাইলে পুনরায় আপিল করতে পারবেন। এরপর আবার তিন মাসের মধ্যে পুনরায় রায় প্রকাশ করা হবে।’

দায়িত্বপ্রাপ্ত মধুহাটি ইউনিয়নের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও উপজেলা কৃষি অফিসার ড. মনিরুজ্জামান বলেন, প্রার্থীর আপত্তি থাকলে ভোট একাধিকবার গণনা করতে তো সমস্যা নেই। প্রিজাইডিং অফিসার চাইলে সেটি করতে পারেন। এ ছাড়া বাতিল ভোট দেখাতে তো কোনো সমস্যা নেই। প্রিজাইডিং অফিসার কীভাবে ভুলটি করলেন বুঝতে পারছি না।’

তিনি বলেন, ‘বুধবার আমি একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। আমি অভিযোগটি নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠাব। কমিশন আমাকে যা করতে বলবেন আমি সেটা অবশ্যই করব।’ সংবাদ সম্মেলন শেষে মেম্বর প্রার্থী মিজানুর রহমান মিনা বলেন, আমি আশাবাদী ও আত্মবিশ্বাসী নির্বাচনে আমিই জয়ী হব। আমি গণমাধ্যমের মাধ্যমে আহ্বান জানাচ্ছি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আমার সমস্যা সমাধানে যেন আন্তরিক হন।

নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ পরিবর্তনকে বলেন, ‘প্রার্থীর কোনো আপত্তি থাকলে তা প্রিজাইডিং অফিসারের উচিৎ তার মীমাংসা করা। একবার ভোট গণনা করা স্বাভাবিক, দুইবার গণনা করা যথার্থ। প্রয়োজন হলে একাধিকবার ভোট গণনা করতে তো অসুবিধা নেই।’

বাতিল ভোট দেখানো প্রসঙ্গে কমিশনার বলেন, ‘কোনো বাতিল ভোট থাকলে তা পোলিং এজেন্টকে দেখানো উচিৎ। কমিশন চায় না প্রার্থী কারো কোনো আপত্তি থাক।’

মেম্বার প্রার্থী মিজানুর রহমান মিনা বুধবার নির্বাচন কমিশনে লিখিত আবেদন করেছেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার, চার কমিশনার ও ইসি সচিব বরাবর তিনি এ আবেদন করেছেন।

এমএএস/বিএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।