মাইন বিস্ফোরণে ৬ শতাধিক বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রাণ হারানোর দিবস আজ

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি দিনাজপুর
প্রকাশিত: ১২:২২ পিএম, ০৬ জানুয়ারি ২০২৬

দিনাজপুর জেলার ইতিহাসে ৬ জানুয়ারি এক বেদনাবিধুর দিন। দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র ২১ দিন পর ১৯৭২ সালের এই দিনে দিনাজপুর শহরের মহারাজা গিরিজানাথ হাই স্কুলের ট্রানজিট ক্যাম্পে ভয়াবহ মাইন বিস্ফোরণে ৬ শতাধিক বীর মুক্তিযোদ্ধা নিহত হন। দিবসটি উপলক্ষে মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) স্মৃতি পরিষদ, মহারাজা গিরিজানাথ হাই স্কুল ও দিনাজপুর প্রেসক্লাব বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে।

জানা গেছে, ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীনের পর দিনাজপুর শহরের উত্তর বালুবাড়ীর মহারাজা হাই স্কুলে স্থাপন করা হয় মুক্তিযোদ্ধা ট্রানজিট ক্যাম্প। বিজয় অর্জনের পর ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ ক্যাম্পে এসে সমবেতন হন দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়সহ আশপাশের জেলাগুলোর বীর মুক্তিযোদ্ধারা। তারা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হামজাপুর, তরঙ্গপুর, পতিরাম ও বাঙ্গালবাড়ী ক্যাম্পের বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। সমবেত বীর মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল ৮ শতাধিক।

রক্তের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীন দেশকে শত্রুদের পুঁতে রাখা, ফেলে যাওয়া ও চেড়ে যাওয়া এন্টি ট্যাংক মাইন, এন্টি পারসোনাল মাইন, টুইঞ্চ, থ্রি-ইঞ্চ মর্টার শেল, গ্রেনেডসহ বিভিন্ন গোলাবারুদ সংগ্রহ করা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম প্রধান কাজ ছিল। ক্যাম্প থেকে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা বেরিয়ে পড়তেন পাক সেনাদের ফেলে যাওয়া, লুকিয়ে রাখা ও পুঁতে রাখা মাইন, অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদের সন্ধানে। সন্ধ্যার দিকে উদ্ধারকৃত মাইন ও অস্ত্রাদি জমা করা হতো মহারাজা স্কুলের দক্ষিণাংশে খনন করা বাংকারে।

১৯৭২ সালের ৬ জানুয়ারি সন্ধ্যায় এ রুটিন ওয়ার্কের এক পর্যায়ে ঘটে যায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা। উদ্ধারকৃত দুই ট্রাক অস্ত্র বাংকারে নামানোর সময় অসতর্ক মুহূর্তে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার হাত থেকে একটি মাইন পড়ে যায়। এতে মাইনটি বিস্ফোরিত হয়। সঙ্গে সঙ্গে বাংকারের পুরো অস্ত্রভাণ্ডার বিস্ফোরিত হয়। ভয়াবহ ও বিকট বিস্ফোরণে ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি হয় মহারাজা স্কুল প্রাঙ্গণসহ এর আশপাশের এলাকায়। কালোধোঁয়ায় আচ্ছাদিত হয় দিনাজপুর শহর। শব্দ প্রায় একশ মাইল পর্যন্ত শোনা যায়। এই ঘটনায় ছয় শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন ও বহু মুক্তিযোদ্ধা আহত হন।

ভয়াবহ এ দুর্ঘটনায় আহত বীর মুক্তিযোদ্ধারা জানান, সেদিন মাইন বিস্ফোরণে কতজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন তা সঠিকভাবে নির্ধারণ করা যায়নি। তবে সকালের রোলকলে উপস্থিত ছিলেন ৭৮০ জন মুক্তিযোদ্ধা। দুর্ঘটনার পূর্বে ৫০-৬০ জন মুক্তিযোদ্ধা ছুটি নিয়ে ক্যাম্প ত্যাগ করেছিলেন। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় প্রায় ৫৭০ জন মুক্তিযোদ্ধা তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলেই নিহত হন। ক্যাম্পে অবস্থানরত অনেক মুক্তিযোদ্ধার হাত-পা, মাথা অনেক দূরে ছিটকে যায়। দুর্ঘটনার পরপরই দেড়শতাধিক আহত মুক্তিযোদ্ধাকে ভর্তি করা হয়েছিল দিনাজপুর জেনারেল হাসপাতাল ও সেন্ট ভিসেন্ট মিশন হাসপাতালে। তাদের মধ্য থেকে পরে ২৯ জন মারা যান।

দিনাজপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র ও ৬ জানুয়ারি স্মৃতি পরিষদের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা সফিকুল হক ছুটু জানান, ঘটনার সময় তিনি তার শহরের বাসাতেই অবস্থান করছিলেন। দুর্ঘটনার পর শহরের সব স্তরের মানুষ ঘটনাস্থলে গিয়ে জীবিত ও মৃতদের উদ্ধার করেন। যারা আহত ছিলেন তাদের চিকিৎসারও ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু সে সময় হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও ওষুধপত্র না থাকায় ঠিকমতো চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়নি।

তিনি জানান, সে দিনের ওই মাইন বিস্ফোরণে শুধু মুক্তিযোদ্ধাই নন, এ ভয়াবহ দুর্ঘটনায় শহরের উত্তরবালুবাড়ি কুমার পাড়া মহল্লায় আরও ১৫ জন অধিবাসীও মৃত্যুবরণ করেন। ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হয় মহারাজা স্কুলের দ্বিতল ভবনসহ আশেপাশের অধিকাংশ ঘরবাড়ি, দালানকোঠা। ফাটল ধরে দিনাজপুর শহরে শতশত বাড়িঘরে।

তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনার পরদিন ৭ জানুয়ারি দিনাজপুর গোর-এ শহীদ বড় ময়দানে শহীদদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে সামরিক মর্যাদায় ১২৫ জন শহীদের মরদেহ দাফন করা হয় ঐতিহাসিক চেহেলগাজী মাজার প্রাঙ্গণে। এরপর চেহেলগাজী মাজার প্রাঙ্গণে আরও দাফন করা হয় হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করা ১৯ জন মুক্তিযোদ্ধা মরদেহ। নিহতদের মধ্যে সে সময় ৫৮ জনের নাম পরিচয় পাওয়া যায়। পরে পর্যায়ক্রমে পাওয়া যায় আরো ৬৪ শহীদদের নাম ও পরিচয়।

৬ জানুয়ারি স্মৃতি পরিষদের সাবেক আহ্বায়ক আজহারুল আজাদ জুয়েল জানান, দুর্ঘটনার পরপরই জনতা উদ্ধার কাজে নেমে পড়েছিলেন। কিন্তু সে সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ঘন অন্ধকারের ভেতর ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধারকাজ চালানো কষ্টকর ছিল। পরে ভারতীয় মিত্র বাহিনী উদ্ধার কাজে যোগ দেয়। গাড়ির লাইট জ্বালিয়ে, টর্চ, হ্যাজাক, হারিকেনের ও কুপির আলোয় রাতভর উদ্ধার কাজে সর্বস্তরের মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। মরদেহগুলোর অধিকাংশ ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন ছিল। কারও হাত, কারও মাথা জোড়া লাগিয়ে একেকটি মরদেহের আদল দেওয়া হয়েছিল। সবগুলো মরদেহই ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের। ঘটনাস্থল থেকে গলিত, পোড়া, অর্ধ পোড়া, ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন, ঝলসানো মাংসের টুকরো উদ্ধার করা হয়। এই মাংসও দাফন করা হয় মুক্তিযোদ্ধাদের মরদেহের সঙ্গে।

৬ জানুয়ারি স্মৃতি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সুলতান কামাল উদ্দীন বাচ্চু জানান, দিনটি স্মরণে ৬ জানুয়ারি স্মৃতি পরিষদ সকাল সাড়ে ৯টায় দিনাজপুর প্রেসক্লাব হতে চেহেলগাজী মাজারের মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণের উদ্দেশ্যে যাত্রা, সকাল ১০টায় মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ ও সকাল সাড়ে ১০টায় মহারাজা স্কুল প্রাঙ্গণে নির্মিত শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ ও আলোচনার কর্মসূচি নিয়েছে। বাদ আছর মহারাজা স্কুল প্রাঙ্গণ মসজিদে মিলাদ মাহফিল ও শহীদদের জন্য দোয়া অনুষ্ঠিত হবে।

এমদাদুল হক মিলন/এমএন/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।