নোয়াখালীতে ‌ধর্ষণের অভিযোগের ঘটনায় মেডিকেল বোর্ড, থানায় জিডি

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি নোয়াখালী
প্রকাশিত: ০৪:১৫ পিএম, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

নোয়াখালীর হাতিয়ায় ‘ধর্ষণকাণ্ডে’ তিন সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। তবে ঘটনার তিনদিন পরও এ নিয়ে থানায় বা আদালতে কোনো মামলা হয়নি। তবে স্বপ্রণোদিত হয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে পুলিশ। সেই মূলে চাহিদাপত্রের আলোকে ভুক্তভোগীর শারীরিক পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ২৫০ শয্যার নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী বিষয়টি জাগো নিউজকে নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, পুলিশের চাহিদাপত্র ছাড়া আমরা ধর্ষণের ঘটনার অনেকগুলো পরীক্ষা করতে পারি না। জিডিমূলে পুলিশ চাহিদাপত্র দেওয়ায় আজ (সোমবার) তিন সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ভুক্তভোগীর শারীরিক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। বাকিগুলোর নমুনা সংগ্রহ করে কাজ চলছে।

মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা হলেন, গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. শিরিন সুলতানা, ডা. ফাতেমা জোয়ান মুনিয়া ও ডা. তাহমিনা আক্তার। ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল পাওয়া সাপেক্ষে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এ কমিটি পরীক্ষার প্রতিবেদন দাখিল করবেন।

এদিকে ঘটনার তিন দিন পার হলেও এ বিষয়ে থানায় বা আদালতে কোনো অভিযোগ দায়ের হয়নি। হাতিয়া পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দুই পক্ষের হামলা ভাঙচুর ও পিটিয়ে আহত করার প্রমাণ পেলেও ধর্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, আমরা এখনো কোনো অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে মামলা রুজু করে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করা হবে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ভুক্তভোগীর অভিযোগ না পেলেও তাকে সার্বক্ষণিক পুলিশি নিরাপত্তা প্রদানসহ সব আইনি কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে হাসপাতালে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।

ভুক্তভোগীর স্বামী অভিযোগ করে বলেন, শুক্রবার রাত ১১টার পরে ১২টা পর্যন্ত সন্ত্রাসীরা আমার ঘরে তাণ্ডব চালায়। এসময় তারা আমাকে স্কচটেপ দিয়ে মুখ বেঁধে আটক করে রাখে। রাত দুইটার দিকে আমার স্ত্রী আমার কাছে গিয়ে ধর্ষণের ঘটনা খুলে বলে। এখনও আমি প্রাণভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি।

এর আগে শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে হাতিয়ার চানন্দি ইউনিয়নের ৩২ বছর বয়সী ওই নারী দাবি করেন, ‘নির্বাচনে শাপলা কলিতে ভোট দেওয়ায়‌ শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) রাত ১১টায় স্থানীয় কয়েকজন যুবক তাকে ও তার স্বামীকে পিটিয়ে জখম করেন। এসময় তার স্বামীকে কক্ষে বেঁধে রেখে গোসলখানায় নিয়ে রহমান হোসেন নামের এক ব্যক্তি তাকে ধর্ষণ করেছেন। তিনি এখনো ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।’

জেনারেল হাসপাতাল সূত্র জানায়, রহমান হোসেন নামে এক ব্যক্তি শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে ১০টায় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়ে রাত ১০টা ৪০ মিনিটে মোটরসাইকেল যোগে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যান। জরুরি বিভাগের রেজিস্ট্রার ও সিসিটিভির ফুটেজে তার রেকর্ড রয়েছে।

এ ঘটনার পর রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন, তথ্য ও সম্প্রচার এবং পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আকতার এবং এর আগে শনিবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) রাতে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম মোবাইলফোনে ওই নারীর সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা তাকে সার্বিক সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন।

অপরদিকে ঘটনাটিকে একটি দলের মিথ্যা প্রচার ও চক্রান্তমূলক, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করে জেলা বিএনপি বিবৃতি দিয়েছে। সোমবার বিকেলে জেলা বিএনপির সদস্য অ্যাডভোকেট রবিউল হাসান পলাশের সই করা চিঠিতে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মাহবুব আলমগীর আলো ও সদস্য সচিব হারুনুর রশিদ আজাদ ওই বিবৃতি দেন।

এতে তারা বলেন, ‘একটি নিছক সমসাময়িক ঘটনাকে ধর্ষণের ঘটনায় রূপান্তরের প্রচেষ্টা গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ। হাতিয়ায় অসংখ্য বিএনপি নেতাকর্মীসহ সংখ্যালঘুর বাড়িতে হামলা হয়েছে। আমরা সহনশীলতায় বিশ্বাসী। গণতান্ত্রিক রায় মেনে নিয়ে সবাইকে ধৈর্য ধারণ করার আহ্বান জানাই।’

এ ঘটনার জের ধরে আজ (সোমবার) জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের নোয়াখালীতে আসার কথা থাকলেও অনিবার্য কারণে তা বাতিল করা হয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জেলা কমিটি এ ঘটনায় বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দিয়েও তা পরে স্থগিত করা হয়।

এ ব্যাপারে জেলা জামায়াতের আমির ইসহাক খন্দকার বলেন, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত থাকায় জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান নোয়াখালী সফর স্থগিত করেছেন।

অন্যদিকে এনসিপির জেলা সদস্য সচিব কাজী মাঈন উদ্দিন তানভীর বলেন, আমি নিজে অসুস্থ থাকায় বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হয়নি। অচিরেই এ ঘটনার বিচার দাবিতে কর্মসূচি দেওয়া হবে।

এদিকে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির সোমবার এক ফেসবুক পোস্টে দাবি করেছেন, ‘নোয়াখালীর হাতিয়ার ঘটনায় এনসিপির হান্নান মাসউদ, আসিফ মাহমুদ ও ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে জাতির কাছে প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে।’

এতে তিনি লেখেন, ‘ধর্ষণের মতো গুরুতর ও স্পর্শকাতর অভিযোগকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে মব তৈরির অপচেষ্টা এবং একটি রাজনৈতিক দলকে হেয় করার অপপ্রয়াস শুধু নৈতিক অবক্ষয়ের পরিচয় নয়- এটি সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও বিপজ্জনক।’

ইকবাল হোসেন মজনু/এফএ/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।