ফসলি জমিতে নতুন করে লোনা পানির আগ্রাসন

আহসানুর রহমান রাজিব
আহসানুর রহমান রাজিব আহসানুর রহমান রাজিব , সাতক্ষীরা সাতক্ষীরা
প্রকাশিত: ০১:৩৬ পিএম, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদ আশাশুনিতে আবারো মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে লবণাক্ততার পুরোনো অভিশাপ। উপজেলার তেঁতুলিয়া ও প্রতাপনগর এলাকায় স্লুইস গেট ব্যবহার করে লোনা পানি তোলার অভিযোগ উঠেছে প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে। এতে ওই এলাকার কয়েকশো বিঘা জমির বোরো ধান চাষ হুমকির মুখে পড়েছে।

স্থানীয় কৃষকদের দাবি, বর্ষার পানি নিষ্কাশনের জন্য নির্মিত গেট অপব্যবহার করে প্রভাবশালী ঘের মালিকরা বিলে লবণ পানি প্রবেশ করাচ্ছেন। এতে প্রায় ৮০০ বিঘা জমি সরাসরি ঝুঁকিতে রয়েছে, যার মধ্যে চলতি মৌসুমে ৮০ থেকে ১০০ বিঘা জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। পানি আরও বিস্তৃত হলে বিস্তীর্ণ আবাদি জমি, গাছপালা, পুকুরের মিঠা পানি ও স্থানীয় জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এই ঘটনায় কৃষকেরা গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করে ইউনিয়ন পরিষদে অভিযোগ দিয়েছেন এবং সম্মিলিতভাবে পানি আটকাতে যাওয়ার চেষ্টা করলেও হুমকির মুখে পিছিয়ে আসতে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে।

উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে অবৈধভাবে লোনা পানি তোলা বন্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডও স্লুইস গেটের অপব্যবহার প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জানিয়েছে।

লবণাক্ততার ছোবলে বহুমুখী ক্ষতির শঙ্কা, দুশ্চিন্তায় কৃষক পরিবার

লোনা পানি প্রবেশের আশঙ্কায় প্রতাপনগর ও তেঁতুলিয়া এলাকার কৃষকদের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। তাদের আশঙ্কা, পানি ধানের জমিতে পৌঁছালে শুধু চলতি মৌসুমের ফলনই নষ্ট হবে না, মাটির উর্বরতা কমে গিয়ে আগামী কয়েক মৌসুমেও চাষাবাদ ব্যাহত হবে। এতে পরিবার চালাতে হিমশিম খেতে হবে কৃষিনির্ভর হাজারো মানুষকে।

স্থানীয় কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, আমরা ধারদেনা করে বীজ, সার, কীটনাশক কিনেছি। এখন যদি লোনা পানি ঢুকে ধান নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে ঋণ কীভাবে শোধ করবো? পরিবার চালানোই কষ্ট হয়ে যাবে।

আরেক কৃষক অনাদি সরকার বলেন, এই জমিতে আগে লবণ ছিল। অনেক কষ্টে মাটিতে লবণ কমিয়েছি। দুই-তিন বছর ধরে ভালো ফলনও পাচ্ছিলাম। আবার লোনা পানি ঢুকলে জমি আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। তখন ধান তো দূরের কথা, ঘাসও জন্মাবে না।

কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, এই বিলে আগে যারা মাছ চাষ করতেন তারা বলেছিল, আর মাছ চাষ করবে না। তবে তারা অনেকে কথা রাখেনি। অনেকের ধান কাটার পর মাছ চাষের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ধান পাকার আগেই যদি পানি ঢোকে, তাহলে দুই দিক থেকেই ক্ষতি হবে। ফসলও যাবে, জমিও নষ্ট হবে।

স্থানীয়দের দাবি, বিলে লবণপানি এলে এলাকায় পুকুরের মিঠা পানি নষ্ট হয়ে গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়বে। গবাদিপশুর জন্য নিরাপদ পানির সংকট তৈরি হবে। একইসঙ্গে ফলজ ও বনজ গাছ শুকিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে কৃষি উৎপাদনের পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতি ও জীবিকায় দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সবুজ বিপ্লব থেকে আবার লবণাক্ততার অভিশাপে

ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও ইয়াসের পর প্রতাপনগর ইউনিয়নে লবণাক্ততার ভয়াবহ প্রভাব কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘ সময় লেগেছিল। স্থানীয় উদ্যোগে স্লুইস গেট নিয়ন্ত্রণ ও মিঠা পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে গত দুই বছরে হাজার হাজার বিঘা জমিতে ধান ও সবজি চাষ পুনরুদ্ধার হয়, যাকে এলাকাবাসী সবুজ বিপ্লব বলছিলেন।

কিন্তু নতুন করে লোনা পানি ঢোকানোয় সেই অর্জন হুমকির মুখে পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতাপনগর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের খেয়াঘাট এলাকার স্লুইস গেট দিয়ে শাহাদাৎ হোসেনের নেতৃত্বে একটি চক্র দক্ষিণ বিলে লোনা পানি প্রবেশ করাচ্ছে। এতে প্রায় ৮০ বিঘা জমির ধান তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি স্থায়ী জলাবদ্ধতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

প্রতাপনগরের বাসিন্দা হুজাইফা আল-আমিন জাগো নিউজকে জানান, কয়েকদিন ধরে এলাকার প্রভাবশালী ঘের মালিকরা বর্ষার পানি নিষ্কাশনের জন্য নির্মিত স্লুইস গেট ব্যবহার করে নদী থেকে বিলে লবণ পানি তোলা শুরু করেছেন। তবে এখনো সেই লোনা পানি সরাসরি ধানের জমি পর্যন্ত পৌঁছায়নি।

তিনি বলেন, এখানে প্রায় ৮০০ বিঘা জমি রয়েছে। এর মধ্যে চলতি মৌসুমে ৮০ থেকে ১০০ বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। পানি যদি এভাবে বাড়তে থাকে, অল্প সময়ের মধ্যেই ধানক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

হুজাইফা আল-আমিন আরও জানান, পরিস্থিতি ঠেকাতে কৃষকরা গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করে প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে লিখিতভাবে অভিযোগ দিয়েছেন। কিন্তু এরপরই আজ কৃষকদের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। কৃষকরা সম্মিলিতভাবে গিয়ে পানি আটকানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু হুমকির কারণে কেউ আর বের হতে সাহস পায়নি।

স্থানীয়দের দাবি, যে স্লুইস গেট দিয়ে এখন লোনা পানি তোলা হচ্ছে, সেটি মূলত বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের জন্য তৈরি করা হয়েছিল।

কৃষকেরা বলছেন, নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে উল্টো পথে ব্যবহার করে লবণ পানি প্রবেশ করানো হলে তা শুধু চলতি মৌসুমের ধানই নয়, ভবিষ্যৎ চাষাবাদ ও পুরো এলাকার পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

পরিবেশ ও খাদ্য নিরাপত্তায় বহুমাত্রিক সংকট

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপকূলে একবার লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেলে মাটির উর্বরতা কমে যায়, জমিতে পরবর্তী কয়েক মৌসুম চাষাবাদ ব্যাহত হয় এবং ভূগর্ভস্থ পানিও লবণাক্ত হয়ে পড়ে। এতে শুধু চলতি মৌসুমের ধান নয়, ভবিষ্যৎ ফসলও ঝুঁকিতে পড়ে।

সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ সাইফুল ইসলাম বলেন, উপকূলীয় এলাকায় ফসল উৎপাদন কম হয়। বেড়িবাঁধ নির্মাণের পর কিছু এলাকার চাষিরা লবণাক্ত সহনশীল জাতের ধান চাষ শুরু করেছেন। তবে আবারও মাছ চাষের নামে কেউ কেউ ফসলি জমিতে লবণ পানি তোলার চেষ্টা করছে। ধান চাষ বন্ধ হলে স্থানীয় খাদ্য উৎপাদনে বড় ঘাটতি তৈরি হবে।

জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের অবস্থান

প্রতাপনগর ইউপি চেয়ারম্যান আবু দাউদ ঢালী জাগো নিউজকে বলেন, আমি এরইমধ্যে বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও কৃষি কর্মকর্তাদের জানিয়েছি। প্রয়োজনে লিখিতভাবে জেলা প্রশাসককেও অবহিত করবো। ইউনিয়ন পরিষদে জরুরি সভা ডেকে কৃষক প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বসার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বিভাগ ২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহমান তাযকিয়া জাগো নিউজকে বলেন, প্রতাপনগর ও তেঁতুলিয়া এলাকার যে স্লুইস গেট দিয়ে পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয়, সেটি মূলত বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের জন্য নির্মিত।

তিনি বলেন, পানি ব্যবস্থাপনা একটি সমন্বিত বিষয়, এখানে কৃষি, মৎস্য ও স্থানীয় জনগণের স্বার্থ জড়িত। তাই উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে এমন সমাধান খোঁজা হবে, যাতে ধান চাষ ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং অবকাঠামোর অপব্যবহার বন্ধ থাকে। কেউ যদি অবৈধভাবে গেট পরিচালনা করে থাকেন, সে ক্ষেত্রে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টিও বিবেচনায় আনা হবে।

আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইদুজ্জামান হিমু জাগো নিউজকে বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত আছি। লিখিত অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিকভাবে একটি তদন্ত টিম গঠন করা হবে। কৃষি বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিদের নিয়ে সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রকৃত অবস্থা যাচাই করা হবে। যদি প্রমাণ পাওয়া যায় যে স্লুইস গেট অপব্যবহার করে অবৈধভাবে লোনা পানি তোলা হচ্ছে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এফএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।