দিনাজপুরে ৫৫০ টাকা কেজি হাঁসের মাংস কিনতে ক্রেতাদের হিড়িক

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি দিনাজপুর
প্রকাশিত: ০৪:৩১ পিএম, ০৬ মার্চ ২০২৬

দিনাজপুরের বোচাগঞ্জে হাঁস জবাই করে পরিষ্কার করা মাংস কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগ ক্রেতাদের মধ্যে সাড়া ফেলেছে। চলনবিল ও হাওর এলাকা থেকে নিয়ে আসা এই হাঁসের মাংস বিক্রি হচ্ছে ৫৫০ টাকা কেজি হিসেবে। উপজেলার ৫টি হাঁস বিক্রির দোকানে কমপক্ষে ৬০ জন কাজ করছেন।

সাধারণ ক্রেতাদের কাছে বিক্রি ছাড়াও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অর্ডারে মাংস বিক্রি করছেন বলে জানান ব্যবসায়ীরা। পরিষ্কার করার ঝামেলা ছাড়াই প্রস্তুত অবস্থায় পাওয়া যাওয়ায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নতুন আইটেম হিসাবে জায়গা করে নিচ্ছে হাঁসের মাংস।

ব্যবসায়ীরা জানান, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একেক জন গড়ে ১৫০-২৫০টি হাঁসের মাংস বিক্রি করতে করছেন। দোকান ভাড়া ও কর্মচারীদের বেতন দিয়েও মাসে ৩০-৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয় তাদের।

দিনাজপুর-বোচাগঞ্জ সড়কের হাটমাধবপুর ও আটগাঁও বাজারে সপ্তাহের প্রতিদিন পাওয়া যাচ্ছে হাঁসের মাংস। গত ৩-৪ মাস থেকে এখানে মাংস বিক্রি হচ্ছে। একেকটি দোকানে ১০-১২ জন করে কর্মচারী রয়েছেন।

দিনাজপুর শহর থেকে ৩৪ কিলোমিটার দূরে টাঙ্গন নদ। নদের ওপরে নির্মিত হয়েছে সেতুসহ রাবার ড্যাম। জায়গাটি নাম রানীর ঘাট মোড়। এটি দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার মধ্যে। জায়গাটিতে রয়েছে ৭টি হোটেল। যার সবগুলোর নাম ভাবির হোটেল। এই হোটেলগুলো রান্না করা হাঁসের মাংসের জন্য ভোজন রসিকদের বেশ পরিচিত। এই হোটেল গুলো এতটাই পরিচিতি লাভ করেছে যে মোড়টির নাম রানীর ঘাট থেকে পরিবর্তন হয়ে ‘ভাবির মোড়’ পরিচিতি লাভ করেছে।

এখন সেই উপজেলার হাটমাধবপুর ও আটগাঁও বাজার পরিচিতি লাভ করছে জবাই করে পরিষ্কার করা মাংস কেজি দরে হাঁসের মাংস বিক্রির জন্য।

হাটমাধবপুর বাজারে রাস্তার ধারে ৪টি হাঁসের মাংসের দোকান। সেসার্স বিসমিল্লাহ হাঁস ঘর, কামাল হাঁস ঘর, ভাই ভাই হাঁসঘর ও হৃদয় হাঁসঘর। ক্রেতারা আসছেন, অর্ডার দিচ্ছে, হাঁস জবাই হচ্ছে, পরিষ্কার করে ডিজিটাল পাল্লায় ওজন করে ৫৫০ টাকা কেজি দরে মাংস নিয়ে যাচ্ছেন ক্রেতারা। যাদের সময়ের স্বল্পতা রয়েছে তারা আগে থেকেই প্রস্তুত থাকা মাংস নিয়ে যাচ্ছেন। ব্যবসায়ীরা অর্ডার নিচ্ছেন বিয়ে, আকিকা, খতনা, জন্মদিন, অন্য প্রসন্ন, রমজান মাসে ইফতারির অনুষ্ঠানে মাংস সরবরাহের। দোকানের মালিক কর্মচারীদের দম ফেলার সময় নেই।

ক্রেতারা জানান, হাঁসের মাংস খাওয়া আগে কষ্টসাধ্য ছিল। বাড়িতে মহিলারা হাঁস পরিষ্কার করে আগুনে পুড়ে প্রস্তুত করা ছিল বড় ঝামেলা। এখন সেটি দূর হয়েছে। খেতে ইচ্ছে করলেই যে কেউ এসে বাজার থেকে হাঁসের মাংস কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। দামও সাধ্যের মধ্যে। তাই শুধু বাড়িতে নয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও এখন গরু-খাসির পাশাপাশি নতুন আইটেম হিসেবে হাঁসর মাংস পরিবেশন করা হচ্ছে।

কালাম হাঁস ঘরের স্বত্বাধিকারী মনোয়ার ইসলাম তারেক বলেন, আমরা হাঁস স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে পরিষ্কার করে কেজি দরে বিক্রি করি। আবার পুরো হাঁসও বিক্রি করি। প্রতি কেজি হাঁসের দাম ৫৫০ টাকা। এই হাঁসগুলো গ্রাম থেকে কেনা হয়। এখানে আমরা ১২ জন কাজ করে। দিনে ১০০-১৫০টি হাঁস বিক্রি হয়। আগে পাইকারি কিনে খুচরা বিক্রি করতাম। তখন দেখা যেত হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বিয়ে বাড়ির জন্য হাঁস নিয়ে যেত। সেখান থেকেই হাঁস বানিয়ে কেজি দরে বিক্রি করার চিন্তা মাথায় আসে।

রফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা এক জায়গায় গিয়েছিলাম, সেখানে দেখছিলাম হাঁস কেজি দরে বিক্রি করছে। সেখান থেকে আমরাও ঠিক করলাম কেজি দরে বিক্রি করবো। প্রায় দেড় বছর ধরে এই ব্যবসা করছি। প্রতিদিন ২০০টি পর্যন্ত হাঁস বিক্রির রেকর্ড রয়েছে।

ভাই ভাই হাঁস ঘরের স্বত্বাধিকারী নয়া মিঞাঁ বলেন, আমরা হাঁস বিক্রির ক্ষেত্রে মান বজায় রাখার চেষ্টা করি। গ্রাহকরা যেন ভালো মানের হাঁস পান, সে জন্য প্রতিদিন নতুন হাঁস সংগ্রহ করি। কেজি দরে বিক্রির ফলে ক্রেতারা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী কিনতে পারেন। এতে ব্যবসা যেমন বাড়ছে, তেমনি গ্রাহকদের সন্তুষ্টিও মিলছে।

বিসমিল্লাহ হাঁস ঘরের স্বত্বাধিকারী সুজন ইসলাম বলেন, আমরা চাই গ্রাহকরা স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিষ্কার হাঁস যেন পান। এজন্য বিশেষভাবে পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর দিই। বাজারে হাঁসের চাহিদা সবসময় থাকে। কেজিদরে বিক্রি করার ফলে সাধারণ মানুষও সহজে কিনতে পারছে। এতে কর্মসংস্থানও তৈরি হয়েছে। চলন বিলসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাঁস সংগ্রহ করা হয়।

ক্রেতা মো. আল আমিন বলেন, কেজিদরে হাঁস বিক্রি হওয়ায় আমাদের জন্য সুবিধা হয়েছে। আগে পুরো হাঁস কিনতে হতো, এখন প্রয়োজন অনুযায়ী কেজি দরে কিনতে পারি। দামও তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী। হাঁসগুলো পরিষ্কার ও স্বাস্থ্যসম্মতভাবে প্রস্তুত করা হয়, তাই আমরা নিশ্চিন্তে কিনতে পারি।

ক্রেতা রুবিনা আক্তার বলেন, আগে পুরো হাঁস কিনতে হতো, যা অনেক সময় আমাদের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি হয়ে যেত। এখন কেজিদরে হাঁস কিনতে পারছি বলে সুবিধা হয়েছে। দামও তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী। হাঁসগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নভাবে প্রস্তুত করা হয়। পরিবারের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত খাবার নিশ্চিত করতে আমরা নিশ্চিন্তে এখান থেকে হাঁস কিনি।

এমদাদুল হক মিলন/এমএন/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।