৮ বছরেই ভূতুড়ে পাবনা রেল স্টেশন

আলমগীর হোসাইন আলমগীর হোসাইন , জেলা প্রতিনিধি পাবনা
প্রকাশিত: ১২:৫৪ পিএম, ২৪ মার্চ ২০২৬

জনবল সংকট, অযত্ন-অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে পাবনা রেল স্টেশনের লাখ লাখ টাকার সম্পদ। চুরি হয়েছে স্টেশনের লাইট ও বৈদ্যুতিক সংযোগের তার। পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য নির্মিত স্টাফ কোয়ার্টার এবং কয়েকটি অফিস ভবন। মাদকসেবী ও অপরাধীদের আনাগোনায় অনিরাপদ হয়ে পড়েছে পুরো স্টেশন এলাকা। এতে চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে স্টেশনের যাত্রী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

তথ্য বলছে, পাবনাবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রেক্ষিতে ২০১৮ সালে প্রায় পৌনে দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় পাবনার আমিনপুরের ঢালারচর থেকে ঈশ্বরদী পর্যন্ত ৭৯ কিলোমিটার রেলপথসহ অত্যাধুনিক পাবনা রেল স্টেশন। পুরো রেলপথের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নির্মাণ করা হয় ছোট ছোট আরও ৯টি স্টেশন। রেল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসবাসের জন্য পাবনা স্টেশনে নির্মাণ করা হয় দুটি অফিসার্স কোয়ার্টার। প্লাটফর্মের পূর্ব পাশে নির্মাণ করা হয় ৫ রুমের তিনটি অফিস ভবন। পূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগসহ লাইট, ফ্যান ও প্রয়োজনীয় উপকরণে স্বয়ংসম্পূর্ণ এসব কোয়ার্টার ও অফিস ভবন উদ্বোধনের সময়ই হস্তান্তর করা হলেও গত আট বছরে কখনোই ব্যবহার হয়নি। নিয়োগ হয়নি জনবলও।

৮ বছরেই ভূতুড়ে পাবনা রেল স্টেশন

রেলওয়ে কর্মকর্তা কর্মচারী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় চুরি হয়েছে স্টেশন প্লাটফর্ম ও ভবনগুলোতে থাকা আধুনিক লাইট, ফ্যান ও বৈদ্যুতিক সংযোগের তার। এমনকি খুলে নিয়ে গেছে মূল্যবান থাই অ্যালুমিনিয়াম ও লোহার দরজা জানালা। ভাঙাচোরা হয়ে পড়ে আছে গ্লাস। স্টেশন এলাকায় সুপেয় পানি ব্যবস্থার জন্য স্থাপন করা টিউবওয়েলগুলোও নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। বরাদ্দের অভাবে মেরামত না করায় কোনো কোনো টিউবওয়েলের যন্ত্রাংশ চুরি হয়েছে। চুরি হয়ে গেছে স্টাফ কোয়ার্টার ও অফিস ভবনের মোটরসহ সাবমারসিবল পাম্পও। বেহাল দশায় স্টেশনের প্লাটফর্ম। সন্ধ্যা নামলেই ভূতুড়ে অন্ধকারে বাড়ে মাদকসেবী ও বখাটেদের আনাগোনা। ছিনতাইকারীদের ভয়ে তটস্থ থাকেন যাত্রীরা।

যাত্রী রাকিব ও মাসুদা জানান, প্রায় দুই হাজার কোটি টাকায় আমরা রেল পেলাম। সেটির হাল কি? পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী ও জনবল নেই। যাত্রী ছাউনির লাইটগুলোও অকেজো। এমন পরিবেশে আসতেই ভয় হয়।

৮ বছরেই ভূতুড়ে পাবনা রেল স্টেশন

স্টেশন এলাকার বাসিন্দা আজাহার আলী বিশ্বাস বলেন, একবার মাত্র ট্রেন আসে স্টেশনে। এছাড়া দিনরাত অরক্ষিত পড়ে থাকে। এটি একটি পার্কে রূপ নিয়েছে। দিনে উঠতি বয়সি ছেলে-মেয়েরা এসে এখানে অসামাজিক কর্মকাণ্ড করে। প্রকাশ্যে মাদক সেবন করে বখাটে ও মাদকসেবীরা। এর জন্য এলাকার পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা তরিকুল, মোস্তফা ও মারুফ জানান, এখানে লাখ লাখ টাকায় বড় বড় বেশ কয়েকটি কোয়ার্টার ও অফিস ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এগুলো কী কাজে করা হয়েছে তা স্টেশনের কেউ জানে না। কখনো এগুলো ব্যবহার হতে দেখিনি। এরই মধ্যে ভবনগুলোর রুমের জানালা, দরজা, ফ্যান, লাইট ও মূল্যবান বৈদ্যুতিক তারসহ সব চুরি হয়ে গেছে। ছিনতাই ও জিম্মি করার মতো ঘটনাও ঘটছে। সরকারি সম্পদ মেরামত করে সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা উচিত।

৮ বছরেই ভূতুড়ে পাবনা রেল স্টেশন

এ ব্যাপারে স্টেশন মাস্টারের দায়িত্বে থাকা মিরাজুল ইসলাম জানান, এত বড় একটি স্টেশন সামলাতে মাত্র দুজন নিরাপত্তাকর্মী রয়েছে। বুকিং সহকারী হয়েও আমাকে স্টেশন মাস্টারের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। দুজন পোর্টারকে দিয়েও বুকিং সহকারীর কাজ করাতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, নিরাপত্তকর্মীর অভাবে মাদক সেবন বা অসামাজিক কর্মকাণ্ড ঠেকানো যাচ্ছে না। রাত বিরাতে মাদকসেবী, বখাটে ও চোরদের উৎপাত বেড়েই চলেছে। সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের ভয়ে আমরাও তটস্থ থাকি। এ ব্যাপারে ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। স্থানীয় থানায় জানিয়েও তেমন সাড়া মেলেনি।

৮ বছরেই ভূতুড়ে পাবনা রেল স্টেশন

এ ব্যাপারে পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক লিয়াকত শরীফ খান বলেন, পাবনা রেল স্টেশনে ট্রেনের সংখ্যা বাড়াতে সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নাধীন। ট্রেন বাড়লে কাজের পরিধি ও জনবল বাড়লে। তখন এই সংকট কেটে যাবে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় স্থানীয়দের সহযোগিতাও কামনা করেন তিনি।

এফএ/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।