বগুড়ার উপ-নির্বাচনে ফ্যাক্টর ‘নীরব ভোটার’

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক বগুড়া
প্রকাশিত: ০৯:৫১ এএম, ০৫ এপ্রিল ২০২৬
প্রার্থীদের পোস্টার, ব্যানার ও প্রতীকে ছেয়ে গেছে বিভিন্ন সড়ক ও গলি। শহরের সাতমাথা এলাকা থেকে তোলা ছবি

বগুড়ায় একেবারে দোরগোড়ায় উপ-নির্বাচন। শহর এখন নির্বাচনি ব্যস্ততায় ঢাকা। সাতমাথা মোড়ে দাঁড়ালে মাইকিংয়ের শব্দে কান ঝালাপালা। জলেশ্বরীতলা থেকে চেলোপাড়া, দেয়ালে দেয়ালে প্রার্থীদের পোস্টার, ব্যানার ও প্রতীকের প্রতিযোগিতা। বিকেলে ছোট পথসভা, রাতে উঠান বৈঠক, সব মিলিয়ে উপনির্বাচনের দৃশ্যমান তৎপরতা চোখে পড়ার মতো।

তবে এই দৃশ্যের বাইরে আরেকটি বাস্তবতা নীরবে জায়গা করে নিচ্ছে। ভোটারদের এক বড় অংশ এখনো নিরব। তারা প্রচারণা দেখছেন, শুনছেন, কিন্তু সিদ্ধান্তে পৌঁছাচ্ছেন না। এই ‘নীরব ভোটার’ই এবার বগুড়া-৬ (সদর) আসনের উপনির্বাচনের ফল নির্ধারণে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এই আসনে মোট ভোটার প্রায় ৪ লাখ ৫৪ হাজার। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে ভোট পড়েছিল প্রায় ৬৯ শতাংশ। কিন্তু উপনির্বাচনের ক্ষেত্রে সেই ধারাবাহিকতা থাকবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার ভোটার উপস্থিতি ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।

স্থানীয় কলেজশিক্ষক আবু তাহের বলেন, এখানে এখনো সেই জাতীয় নির্বাচনের মতো উত্তাপ তৈরি হয়নি। ভোটারদের বড় অংশ পর্যবেক্ষণে আছে, তারা এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি ভোটে যাবে কি না।

বগুড়ার উপ-নির্বাচনে ফ্যাক্টর ‘নীরব ভোটার’

এই অনিশ্চয়তার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে জেলার বাইরে থাকা ভোটারদের বিষয়টি। বগুড়া সদরের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কাজ করেন। গার্মেন্টস, পরিবহন, ছোট ব্যবসা বা বেসরকারি চাকরির কারণে তারা বছরের বেশিরভাগ সময়ই বাইরে থাকেন।

শহরের বাসিন্দা ব্যবসায়ী আবু মোত্তালেব বলেন, আমার দুই ছেলে ঢাকায় চাকরি করে। পরিবারসহ ওখানেই থাকে। উপনির্বাচনের জন্য তারা আসবে না।

তার মতো এমন অসংখ্য পরিবার রয়েছে, যেখানে ভোটার তালিকায় নাম থাকলেও ভোটের দিনে তাদের উপস্থিতি থাকে না।

এছাড়া এই উপনির্বাচনের সময়সূচিও একটি বড় প্রভাব ফেলছে। তফসিল ঘোষণার পর থেকে ভোটগ্রহণ পর্যন্ত সময় কম হওয়ায় অনেক ভোটারের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়নি।

শহরের তরুণ ভোটার সাইদ মোক্তাদির বলেন, হঠাৎ করেই আবার নির্বাচন চলে এলো। অনেকে বিষয়টা সিরিয়াসলি নেওয়ার সুযোগই পায়নি। আমরা আগের নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলাম, কিন্তু এবার সেই আগ্রহটা অনেকের মধ্যে নেই।

উপনির্বাচন নিয়ে ঐতিহ্যগত অনাগ্রহও এখানে ভূমিকা রাখছে। অনেক ভোটার মনে করেন, এই নির্বাচন সরাসরি সরকার গঠন বা বড় কোনো পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত নয়। ফলে এটি তাদের কাছে কম গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়।

তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ভোটের দিনের পরিবেশ। অনেক ভোটারই এখনো নিশ্চিত নন, তারা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারবেন কি না।

বগুড়ার উপ-নির্বাচনে ফ্যাক্টর ‘নীরব ভোটার’

সেউজগাড়ি এলাকার ব্যবসায়ী পলাশ মিয়া বলেন, আমরা পরিস্থিতি দেখেই সিদ্ধান্ত নেবো। পরিবেশ ভালো থাকলে ভোট দিতে যাব, না হলে ঝুঁকি নেবো না।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হয়েছে। পুলিশ সুপার মীর্জা সায়েম মাহমুদ বলেন, ভোট সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থাকবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তারপরও ভোটের দিনের পরিবেশ নিয়েও অনেক ভোটারের মনে আস্থার সংকট রয়েছে। নির্বাচন অফিস বগুড়া-৬ সদর আসনে ১৫০টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৫৩টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

এদিকে বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা মাঠে সমান সুযোগ না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। তাদের দাবি, কিছু এলাকায় প্রচারণায় অনানুষ্ঠানিক বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। যদিও প্রশাসন এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, সব দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে।

এই উপনির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত দুই দলই সক্রিয়ভাবে মাঠে রয়েছে। প্রার্থী হিসেবে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির (বিডিপি) আল-আমিন তালুকদার (ফুলকপি) থাকলেও প্রচারণায় নেই। বিএনপি তুলনামূলকভাবে সংগঠিত ও সংযত প্রচারণা চালাচ্ছে।

দলটির প্রার্থী রেজাউল করিম বাদশা বলেন, মানুষ আমাদের সঙ্গে আছে। ভোটের পরিবেশ ঠিক থাকলে ভোটাররা কেন্দ্রে আসবে এবং তাদের মতামত দেবে।

অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী আবিদুর রহমান বলেন, আমরা শুরু থেকেই ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখছি। মানুষ ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছে। তবে ভোটার উপস্থিতি নির্ভর করবে নির্বাচনের পরিবেশের ওপর। কারণ এরই মধ্যে অনেক স্থানে আমরা বাধার মুখে পড়েছি।

নির্বাচন বিশ্লেষক কেজিএম ফারুক বলেন, এই ধরনের পরিস্থিতিতে ‘নীরব ভোটার’ বড় ভূমিকা রাখে। তারা শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেয় এবং অনেক সময় ফলাফল ঘুরিয়ে দিতে পারে। তবে তাদের কেন্দ্রে আনতে না পারলে পুরো নির্বাচনই সীমিত ভোটের মধ্যে আটকে যেতে পারে। ভোটার উপস্থিতি কম হলে সংগঠিত ভোটব্যাংকগুলো বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে। এতে করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও ঘনীভূত হয় এবং অল্প ব্যবধানে ফল নির্ধারিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। সব মিলিয়ে বগুড়া-৬ (সদর) আসনের উপনির্বাচনে প্রচারণা যতই দৃশ্যমান হোক, মূল লড়াই এখন ভোটারদের নিয়ে।

সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. ফজলুল করিম জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত পরিবেশ ভালো আছে। নির্বাচনের দিন শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন থাকবে।

আগামী ৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বগুড়া-৬ (সদর) আসনের উপনির্বাচন। বিএনপির চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ আসন থেকে জয়ী হওয়ার পর এই আসনটি ছেড়ে দেওয়ায় উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

এফএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।