আরব সাগরের তীরে স্বর্গীয় ভ্রমণের গল্প

তানভীর অপু
তানভীর অপু তানভীর অপু , বিশ্ব পর্যটক
প্রকাশিত: ০৩:০২ পিএম, ০৭ এপ্রিল ২০২৬
ওমানের তিউই গ্রাম ও ওয়াদি তিউই, ছবি: লেখকের সৌজন্যে

আরব সাগরের তীরে ওমানের তিউই গ্রাম ও ওয়াদি তিউই মরুভূমির বুকে সবুজ স্বপ্ন, পাহাড়, নদী প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে গড়া এক স্বর্গীয় ভ্রমণের গল্প এটি। আরব সাগরের নীল জলের তীর ঘেঁষে, পাহাড় আর পাথুরে উপত্যকার গভীরে লুকিয়ে আছে এক বিস্ময়কর সবুজ স্বপ্ন তিউই এবং ওয়াদি তিউই। মরুভূমির দেশ ওমানের বুকে এমন স্বর্গীয় রূপের দেখা মিলবে, এটা আগে কল্পনাও করিনি। কিন্তু জায়গাটিতে পা রাখার পর মনে হলো, প্রকৃতি যেন এখানে নিজের সমস্ত রং, সৌন্দর্য আর জীবনের ছোঁয়া ঢেলে দিয়েছে।

তিউই একটি ছোট্ট, শান্ত, নিরিবিলি গ্রাম। আরব সাগরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এই গ্রাম যেন সময়ের বাইরে আলাদা পৃথিবী। এখানে নেই শহরের কোলাহল, নেই যান্ত্রিক জীবনের তাড়াহুড়া। চারপাশে শুধু পাহাড়, খেজুর গাছের সারি আর দূরে সমুদ্রের মৃদু গর্জন। গ্রামটিই মূলত ওয়াদি তিউইয়ের প্রবেশদ্বার। কিন্তু এ প্রবেশদ্বারেই যে এত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে, তা না এলে বোঝা সম্ভব নয়।

গ্রামে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই চোখে পড়ে ছোট ছোট ঘর-বাড়ি, পাহাড়ের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের বসতি। মনে হয়, প্রকৃতির সাথে মানুষের এক নিঃশব্দ চুক্তি হয়েছে। এখানে মানুষ প্রকৃতিকে আঘাত করবে না আর প্রকৃতি মানুষকে বাঁচার সবকিছু দিয়ে যাবে। এই সমঝোতার ফলই হয়তো এই অপার্থিব শান্তি।

আসল বিস্ময় শুরু হয় তখন; যখন আপনি এগিয়ে যান ওয়াদি তিউইয়ের ভেতরের দিকে। ‌‘ওয়াদি’ শব্দের অর্থ পাহাড়ি উপত্যকা বা প্রাকৃতিক খাল। যেখানে বৃষ্টির পানি জমে একধরনের নদীর মতো প্রবাহ তৈরি করে। এই ওয়াদি তিউই সেই অর্থেই এক জীবন্ত নদী; যেখানে পানি আসে আকাশ থেকে, জমে পাহাড়ের বুকে আর ধীরে ধীরে গড়ে তোলে অনন্য জীববৈচিত্র্য।

আমার জন্য সবচেয়ে বড় বিস্ময় ছিল মরুভূমির দেশে দাঁড়িয়ে আম গাছ দেখা! হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন। এখানে আমি প্রথম দেখলাম আম গাছ, পেঁপে গাছ, কলা গাছ। শুধু তা-ই নয়, অসংখ্য পাখির কলতানে মুখরিত ছিল চারপাশ। মনে হচ্ছিল, যেন আমি বাংলাদেশের কোনো গ্রামে ফিরে গেছি; যেখানে প্রকৃতি আপনাকে আপন করে নেয়।

oman

পাহাড়ের গা বেয়ে নামা পানির ধারা, সেই পানির স্বচ্ছতা আর তার পাশে সবুজ গাছপালার সমাহার সব মিলিয়ে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যা সত্যিই অবিশ্বাস্য। এই পানি মূলত বৃষ্টির পানি, যা পাহাড়ের ভেতরে জমে থেকে ধীরে ধীরে প্রবাহিত হয়। এই পানিই এখানে জীবনের মূল উৎস, যা গড়ে তুলেছে এই সবুজ উপত্যকা।

ওয়াদির ভেতরের পথটিও এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। আপনি চাইলে গাড়ি নিয়ে অনেকটা পথ এগিয়ে যেতে পারবেন। তবে সেই পথ মোটেও সহজ নয়। এখানে দরকার একটি শক্তিশালী ফোর ডব্লিউডি গাড়ি। সরু রাস্তা, একপাশে খাড়া পাহাড়, আরেক পাশে গভীর খাদ মিলিয়ে রোমাঞ্চকর যাত্রা। তবে যারা অ্যাডভেঞ্চার ভালোবাসেন, তাদের জন্য এটি স্বপ্নের রাস্তা।

গাড়ি রেখে যখন আপনি পায়ে হেঁটে ওয়াদির ভেতরে প্রবেশ করবেন; তখন শুরু হবে আসল অভিযান। বড় বড় পাথরের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে হবে। কখনো কখনো সামান্য ঝুঁকিও নিতে হবে। কিন্তু সেই কষ্টের প্রতিদান আপনি পাবেন প্রতিটি মুহূর্তে। কারণ প্রতিটি বাঁকে অপেক্ষা করছে নতুন কোনো সৌন্দর্য।

এই পথে হেঁটে যেতে যেতে আপনি পৌঁছে যাবেন অপূর্ব জায়গায়। একটি প্রাকৃতিক পুকুর, যার চারপাশে খেজুর গাছ, পাথরের দেওয়ালে লতাপাতা আর মাঝখানে স্বচ্ছ নীল পানি। জায়গাটি যেন প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা এক চিত্রকর্ম। এই পুকুরের পরেই আছে আরেকটি বিস্ময় মিবাম গ্রামের নিচে অবস্থিত জলপ্রপাত। তবে সেখানে যেতে হলে আপনাকে সাঁতার কাটতে হতে পারে প্রায় ৮০ থেকে ১০০ মিটার। যারা সাঁতার জানেন, তাদের জন্য এটি দারুণ অভিজ্ঞতা। যারা সাঁতার জানেন না; তারাও পুকুর পর্যন্ত এসে এ সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।

মিবাম গ্রামটি নিজেও অপূর্ব জায়গা। পাহাড়ের কোলে ছোট্ট গ্রামটি যেন সময়ের স্পর্শ থেকে দূরে। এখানে মানুষ এখনো প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে জীবনযাপন করে। খামার, ফলের বাগান আর ছোট ছোট জলধারা সব মিলিয়ে এটি জীবন্ত স্বর্গ।

oman

ওয়াদি তিউইয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর সবুজতা। অন্যান্য অনেক ওয়াদির তুলনায় এটি অনেক বেশি সবুজ, অনেক বেশি জীবন্ত। এখানে শুধু পাথর আর পানি নয়; আছে জীবন, আছে প্রাণ, আছে প্রকৃতির অপার দান। এ ভ্রমণ আমার কাছে শুধু একটি জায়গা দেখা নয় বরং একটি অনুভূতি। এখানে এসে মনে হয়েছে, পৃথিবী এখনো সুন্দর, এখনো প্রকৃতি তার সৌন্দর্য হারায়নি। শুধু আমাদের দরকার সেই সৌন্দর্যকে খুঁজে নেওয়া।

তবে এ ভ্রমণে আসার আগে কিছু প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। সূর্যের তাপ থেকে বাঁচতে ক্যাপ বা টুপি, সানস্ক্রিন, পর্যাপ্ত পানি ও খাবার, সাঁতারের পোশাক, আর ভালো গ্রিপযুক্ত জুতো অবশ্যই সঙ্গে রাখতে হবে। এ ছাড়া ক্যামেরা ও ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগ থাকলে এই সৌন্দর্যকে ধরে রাখা আরও সহজ হবে।

সবশেষে বলবো, ওয়াদি তিউই এমন একটি জায়গা; যেখানে একবার গেলে বারবার যেতে ইচ্ছে করবে। এটি শুধু একটি ভ্রমণ নয়; এটি একটি অনুভব, একটি স্মৃতি, একটি ভালোবাসা। মরুভূমির বুকে এমন এক সবুজ স্বর্গ যে লুকিয়ে থাকতে পারে, তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।

জায়গাটি আমাকে শিখিয়েছে প্রকৃতি কখনো শূন্য নয়, সে সব সময় কিছু না কিছু দিয়ে ভরিয়ে রাখে। শুধু আমাদের চোখ থাকতে হবে সেই সৌন্দর্য দেখার জন্য। সেই চোখ যখন একবার খুলে যায়; তখন তিউই ও ওয়াদি তিউইয়ের মতো জায়গাগুলো চিরকাল হৃদয়ে জায়গা করে নেয়।

এসইউ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।