ধান-চালের বাজারে ধস, ‘ইন্টেরিম’কে দুষছেন কৃষক-ব্যবসায়ীরা
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষ সময়ের অনিয়ন্ত্রিত আমদানির প্রভাব পড়েছে নওগাঁর ধান-চালের বাজারে। গত এক মাসের ব্যবধানে জেলার বৃহত্তর মোকামগুলোতে মানভেদে প্রতিকেজি চালের দাম কমেছে ২-৭ টাকা। একই সঙ্গে হাট-বাজারে মণপ্রতি ধানের দাম উল্লেখযোগ্যহারে কমেছে। এতে দেশীয় চালকল শিল্প ধ্বংসের পাশাপাশি ধান উৎপাদনকারী কৃষকরা চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন। সংকট কাটিয়ে উঠতে আসন্ন বোরো মৌসুমে বিগত বছরের চেয়ে দ্বিগুণ ধান ও চাল কিনতে খাদ্য বিভাগের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ধান-চাল সংশ্লিষ্টরা।
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) সকালে জেলার মান্দা উপজেলার সতিহাটে মানভেদে প্রতিমণ স্বর্ণা-৫ জাতের ধান এক হাজার ১১০ টাকা থেকে এক হাজার ১২০ টাকা, জিরাশাইল এক হাজার ৩৯০ টাকা থেকে এক হাজার ৪৪০ টাকা, সম্পা কাটারী এক হাজার ৮৭০ টাকা থেকে এক হাজার ৯২০ টাকা দরে কেনাবেচা করেন ব্যবসায়ীরা। গত বছরের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে মানভেদে প্রতিমণ স্বর্ণা-৫ জাতের ধান এক হাজার ৪৯০ টাকা থেকে এক হাজার ৫৪০ টাকা, জিরাশাইল দুই হাজার টাকা থেকে দুই হাজার ১০০ টাকা, সম্পা কাটারী দুই হাজার ১৫০ টাকা দরে কেনাবেচা হয়েছিল। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মানভেদে প্রতিমণ স্বর্ণা-৫ ধানের দাম ৩৮০ টাকা থেকে ৪২০ টাকা, জিরাশাইল ৬১০ টাকা থেকে ৬৬০ টাকা এবং সম্পা কাটারী ২৩০ টাকা থেকে ২৮০ টাকা কমেছে।
সতিহাটে ধান বিক্রি করতে আসা কৃষক মোজাম্মেল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমনের শেষ সময়ে ভেবেছিলাম জিরাশাইল ধানের ভালো দাম পাবো। অথচ বাজারে ধান নিয়ে এসে দেখছি গতবছর যে ধান দুই হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি করেছি, সেটার দাম এক হাজার ৪০০ টাকার বেশি কেউ হাঁকছেন না। এরকম হবে জানলে আরও অনেক আগেই ধান বিক্রি করে দিতাম।’

হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘সার-বীজ, কীটনাশক সবকিছুর দাম বেড়েছে। অথচ আমাদের কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম কেউ দিতে চায় না। তাই ধান বিক্রি না করেই বাড়িতে ফিরে যাচ্ছি।’
ধান বিক্রি করতে আসা আরেক কৃষক আব্দুল খালেক জাগো নিউজকে বলেন, ‘এক হাজার ১২০ টাকা মণ দরে ৩০ মণ ধান বিক্রি করলাম। তবে যে হারে দাম কমতে শুরু করেছে, আর কিছুদিন পর এক হাজার টাকাও দাম থাকবে কি-না সন্দেহ। কারণ কিছুদিন পর আবার বোরো ধান উঠবে। আমনে আমরা ভালো ফলন পেয়েছি। এরপরও ইউনূসের সরকার চাল আমদানি করে আমাদের এত বড় লোকসানের মুখে ফেলে দিলো। এভাবে চলতে থাকলে ধান চাষ বন্ধ করে দেবো।’
আরও পড়ুন: ডিজেল সংকটে সেচ পাচ্ছেন না হাওরের চাষিরা, বোরো ফলন নিয়ে শঙ্কা
চেয়ারম্যান বললেন ‘আমার ইউনিয়নে কত কেজি চাল দেবো, সেটা আমার ব্যাপার’
সুগন্ধি চাল রপ্তানি করা যাবে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত
ধান-আলু-পেঁয়াজ-সবজি-সরিষার উৎপাদন বেড়েছে: কৃষি উপদেষ্টা
শহরের পার নওগাঁ মহল্লার আড়তদারপট্টিতে সরেজমিনে দেখা যায়, এ এলাকার মিলগেট ও আড়তগুলোতে এক মাসের ব্যবধানে পাইকারি পর্যায়ে মানভেদে প্রতিকেজি চালের দাম ২-৭ টাকা কমেছে। দাম কমার পর বর্তমানে প্রতিকেজি স্বর্ণা-৫ জাতের চাল ৪২-৪৩ টাকা, জিরাশাইল ৬৭-৬৮ টাকা এবং কাটারীভোগ ৭৪-৭৬ টাকা দরে বেচাকেনা হচ্ছে। অথচ একমাস আগে প্রতিকেজি স্বর্ণা-৫ ৪৬-৪৭ টাকা, জিরাশাইল ৭৪-৭৫ টাকা এবং কাটারীভোগ ৭৬-৭৮ টাকা দরে বেচাকেনা হয়েছিল।

চালের দাম কমার কারণ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অনিয়ন্ত্রিত আমদানিকে দায়ী করেন ওই এলাকার সততা রাইস এজেন্সির আড়তদার সুকুমার ব্রহ্ম।
তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর অনিয়ন্ত্রিত চালের আমদানি বন্ধ করলেও আগে যারা এলসি করে রেখেছেন, সেই চাল এখনো দেশে আসছে। ইন্টেরিমের একটি ভুলের কারণে ধান-চাল ব্যবসায়ীরা আজ ক্ষতিগ্রস্ত। আগে যেখানে নওগাঁ মোকাম থেকে দৈনিক অন্তত ১২০ ট্রাক চাল দেশের বিভিন্ন মোকামে পাঠানো হতো, সেখানে বর্তমানে ৫০ ট্রাক চাল বিক্রি করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। চালের ক্রেতা একেবারেই নেই। বেচাকেনা বন্ধ থাকায় অনেক ব্যবসায়ী ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন।’
নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, ‘কৃষকদের অসুবিধার কথা না ভেবেই অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিভিন্ন দেশ থেকে ব্যবসায়ীদের অবাধে চাল আমদানি সুযোগ দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। অথচ দেশে পর্যাপ্ত ফসল ছিল কৃষকদের মাঠে। গত এক মাস ধরে এখন এর খেসারত দিতে হচ্ছে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের।’

তিনি বলেন, ‘বেচাকেনা না হওয়ায় মিলারদের কাছে দেশীয় চালের বড় একটা মজুত গড়ে উঠেছে। এর প্রভাবে এক মাসের ব্যবধানে মানভেদে প্রতিকেজি চালের দাম ২-৭ টাকা কমেছে। আর প্রতিমণ ধানের দাম কমেছে ২৩০-৬৬০ টাকা।’
বেশি দামের আশায় যেসব কৃষক ঘরে ধান মজুত রেখেছিলেন, তারা হাট-বাজারে ধান বিক্রি করতে এসে চোখের পানি ফেলছেন। আর কিছুদিন পরই বোরো ধান আবারও কৃষকের ঘরে উঠবে। মৌসুমের এই শেষ সময়ে ধানের বাজারের এই দুরবস্থা কৃষকদের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদেরকেও ভাবিয়ে তুলেছে বলে জানান এই ব্যবসায়ী।
আশঙ্কা প্রকাশ করে ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘আসন্ন বেরো মৌসুমে সরকারের সংগ্রহ অভিযানে গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ ধান-চাল কেনা না হলে দেশীয় চালকল শিল্প ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছাবে। ব্যবসা চলে যাবে করপোরেটদের হাতে। কৃষকরা ন্যায্য দাম না পেয়ে চাষাবাদ কমিয়ে দিলে জনগণকে এর খেসারত দিতে হবে।’
এসআর/জেআইএম