ফরিদপুর

সংঘর্ষের জেরে দুই মাস ধরে দোকান বন্ধ শতাধিক ব্যবসায়ীর

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ফরিদপুর
প্রকাশিত: ১০:৫২ এএম, ১১ এপ্রিল ২০২৬

ফরিদপুরের একটি বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অব্যাহত হামলা ও হুমকির মুখে শতাধিক ব্যবসায়ী তাদের দোকানে যেতে পারছেন না। এতে বিশাল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা, বেকার হয়ে পড়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সালথা ও বোয়ালমারী উপজেলার দুটি পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের জেরে প্রতিপক্ষের ভয়ে গত দুই মাস শতাধিক ব্যবসায়ী স্থানীয় ময়েনদিয়া বাজারে থাকা তাদের দোকানে যেতে পারছেন না। টানা দুই মাস ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলতে না পারায় দোকানে প্রায় কোটি টাকার মালামাল নষ্ট হচ্ছে। এমন অবস্থায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সালথা ও বোয়ালমারী উপজেলার সীমান্তে অবস্থিত ওই এলাকার সবচেয়ে বড় হাট ময়েনদিয়া বাজার। বাজারে অন্তত এক হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বাজারটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বোয়ালমারী উপজেলার পরমেশ্বরদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপিতে যোগদানকারী আব্দুল মান্নানের সঙ্গে সালথা উপজেলার যদুনন্দী ইউনিয়নের খারদিয়া গ্রামের বিএনপি সমর্থক টুলু মিয়া এবং জিহাদ মিয়ার বিরোধ চলে আসছে। টুলু মিয়া ও জিহাদ মিয়ার বাড়ি খারদিয়া গ্রামে আর আব্দুল মান্নানের বাড়ি ময়েনদিয়া বাজার এলাকায়।

স্থানীয়রা জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ময়েনদিয়া বাজার নিয়ন্ত্রণ করতেন মান্নান মাতুব্বর। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরদিন মান্নান চেয়ারম্যানের বাড়ি পুড়িয়ে দেয় প্রতিপক্ষের লোকজন। একপর্যায় মান্নান চেয়ারম্যান ও তার নেতাকর্মীরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। পরে ময়েনদিয়া বাজার নিয়ন্ত্রণে নেন টুলু ও জিহাদ মিয়া। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপির এক নেতার সহযোগিতায় এলাকায় ফিরে আসেন মান্নান চেয়ারম্যান। এরপর মান্নান ও তার সমর্থকরা ময়েনদিয়া বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, সংঘর্ষের ঘটনার পর থেকে সালথার খারদিয়া গ্রামের শতাধিক ব্যবসায়ী ময়েনদিয়া বাজারে থাকা তাদের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যেতে পারছেন না। বাজারের গেলেও মান্নানের সমর্থকরা তাদের ওপর হামলা করে ও হুমকি ধামকি দেয়। এমন অবস্থায় গত দুই মাস ধরে খারদিয়া গ্রামের ব্যবসায়ীরা দোকান বন্ধ রাখায় তাদের প্রায় কোটি টাকার মালামাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

খারদিয়া গ্রামের বাসিন্দা ও ময়েনদিয়া বাজারের মিনহাজ টেডার্সের মালিক মো. ফায়েক বলেন, দুই মাস ধরে ময়েনদিয়া বাজারে থাকা আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যেতে পারছি না। এতে আমার দোকানে সিমেন্ট নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শুধু আমি একা নয়, আমার মতো শতাধিক ব্যবসায়ী মান্নান চেয়ারম্যান ও তার ভাই সিদ্দিক মাতুব্বরের সমর্থকদের ভয়ে বাজারে থাকা তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যেতে পারছে না। এতে আমাদের ব্যবসায়ীদের কোটি টাকার সম্পদ ও মালামাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা ব্যবসায়ী, আমাদের কোনো দলপক্ষ নেই। তারপরও বাজারে যেতে দেওয়া হচ্ছে না আমাদের।

কাপড় ব্যবসায়ী আকরাম শিকদার বলেন, সংঘর্ষ হয়েছে দুটি পক্ষের মধ্যে, কিন্তু আমাদের ব্যবসায়ীদের কী দোষ? আমাদের দোকান কেন খুলতে দিচ্ছে না। কোনো ব্যবসায়ী বাজারে গেলেও তাকে মারধর করা হয়। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলতে না পেরে আমরা পথে বসে যাচ্ছি। আমাদের অনেক ক্ষতি হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আমরা না খেয়ে মরবো। বিষয়টি আমরা প্রশাসনকে জানানো পরেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

ময়েনদিয়া বাজারের ইজারাদার টুলু মিয়া বলেন, আমার বাড়ি খারদিয়া হওয়ায় সংঘর্ষের পর থেকে বাজার থেকে ইজারার টাকা তুলতে দিচ্ছে না মান্নান মাতুব্বরের সমর্থকরা। আমার লোকজন বাজারে গেলেই তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে বাজার থেকে বের করে দেয়। এমন অবস্থায় বাজার থেকে ইজারার টাকাও তুলতে পারছি না।

শাহিন মিয়া নামে ময়েনদিয়া বাজারের আরেক ব্যবসায়ী বলেন, কিছু অসাধু ব্যক্তি চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত থেকে বাজারের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। তারা নিজেরা ব্যবসা করতে না পারলে অন্যদেরও বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে এবং ব্যবসায়ীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে বর্তমানে বাজারের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান মাতুব্বর কারাগারে থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে তার ভাই ময়েনদিয়া বাজারের বাসিন্দা সিদ্দিক মাতুব্বরের ছেলে মো. শাহিন মিয়া বলেন, গত ৫ আগস্টের ঘটনার পর আমার চাচা পরমেশ্বরদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মান্নান মাতুব্বরের বাড়িসহ আমাদের বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা হয়। এরপর প্রায় দেড় বছর তারা নিজ বাড়িতে ফিরতে পারেননি।

তিনি বলেন, যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা। তার দাবি, বাজারে এখনো স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য চলছে এবং অধিকাংশ ব্যবসায়ী নির্ভয়ে দোকান খুলছেন। যারা বাজারে আসতে পারছেন না বা আসছেন না, তাদের একটি অংশ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।

এ বিষয়ে ফরিদপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. নজরুল ইসলাম জানান, অনেক আগে থেকেই ময়েনদিয়া বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওই দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলমান ছিল, উভয় পক্ষের দায়ের করা একাধিক মামলাও বিচারাধীন রয়েছে। সর্বশেষ গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ময়েনদিয়া ও খারদিয়াবাসীর মধ্যে বড় ধরনের সংঘাত হয়, বেশ কয়েকটি দোকানে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা হয়। বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নজরে রেখেছে জেলা পুলিশ বিভাগ।

তিনি জানান, এই ঘটনার প্রেক্ষিতে দায়ের করা মামলায় আমরা বেশ কিছু আসামিকে ধরতে সক্ষম হয়েছি। আরও কয়েকজনকে খুঁজছি, আশা করি ধরতে সক্ষম হব শিগগিরই। এ ঘটনার পর থেকে ওই এলাকায় চাপা ক্ষোভ রয়েছে। সাধারণ মানুষ ও নিরপরাধ ব্যবসায়ীরা যাতে বাজার এলাকায় নির্বিঘ্নে তাদের কাজ করতে পারে তার নিশ্চয়তা দিতে পুলিশ বদ্ধপরিকর। কোনো নিরীহ বা নিরপরাধ লোককে হয়রানি করা হবে না। কেউ কাউকে হুমকি দিলেও সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাধারণ মানুষের কাজকর্ম ও চলাচলে বাধা দিলে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

এন কে বি নয়ন/এফএ/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।