মেহেরপুরের ‘রাজা’ এখন অসহায়

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি মেহেরপুর
প্রকাশিত: ০১:১৫ পিএম, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

এক সময় যাত্রাপালার মঞ্চে রাজা সেজে গর্জন তুললেই থমকে যেত দর্শক, অভিনয়ের মুগ্ধতায় করতালিতে মুখর হয়ে উঠতো চারপাশ। রাজার পোশাক, সংলাপ আর উপস্থিতিতেই যাত্রার আসর জমে উঠতো। সেই মানুষটি আজ বাস্তব জীবনে অসহায়, নিঃস্ব ও উপেক্ষিত।

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার হাড়িয়াদাহ গ্রামের সাবেক যাত্রাশিল্পী সুনীল হালদার এখন কুঁড়েঘরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দুর্ঘটনায় পঙ্গুত্ব বরণ করার পর সংসারের ভার নিতে হয়েছে তার স্ত্রী ও পুত্রবধূকে।

স্থানীয়ভাবে পরিচিত এই যাত্রাশিল্পী এক সময় মেহেরপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘুরে ঘুরে যাত্রাপালায় অভিনয় করতেন। বিশেষ করে রাজার চরিত্রে তার অভিনয় ছিল দর্শকপ্রিয়। তার সংলাপ, গর্জন ও অভিব্যক্তিতে দর্শকরা মুগ্ধ হতেন। আলোঝলমলে মঞ্চ, মানুষের ভালোবাসা, সম্মান আর করতালি ছিল তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে হারিয়ে যায় যাত্রাপালার সেই সোনালি দিন। ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় যাত্রার আসর, থেমে যায় তার অভিনয়জীবনও।

জীবিকার তাগিদে বাধ্য হয়ে দিনমজুরের কাজ শুরু করেন সুনীল হালদার। কিন্তু কয়েক বছর আগে শ্রমিকের কাজ করতে গিয়ে একটি বাড়ির ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। এতে তার কোমর ও পায়ে মারাত্মক আঘাত লাগে। সেই দুর্ঘটনার পর থেকে আর স্বাভাবিকভাবে দাঁড়াতে পারেন না তিনি। এখন লাঠিতে ভর করেই কোনো রকমে চলাফেরা করেন।

মেহেরপুরের ‘রাজা’ এখন অসহায়

শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়ায় তার পক্ষে কোনো কাজ করাও সম্ভব নয়। ছয় সদস্যের পরিবার নিয়ে বর্তমানে চরম কষ্টে দিন কাটছে তাদের। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন সুনীল হালদার। তিনি কর্মক্ষমতা হারানোর পর সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে তার স্ত্রী ও ছেলের বউয়ের ওপর। দুজনেই স্থানীয় একটি ইটভাটায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। সামান্য যে আয় হয়, তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলে। অনেক দিন একবেলা খাবার জোটে, আবার কোনোদিন না খেয়েই থাকতে হয় পুরো পরিবারকে।

প্রতিবেশীরা জানান, এলাকার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন সুনীল হালদার। অথচ আজ তিনি অবহেলিত ও অসহায় অবস্থায় জীবন কাটাচ্ছেন। সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো সহায়তা এখনো নিয়মিতভাবে পাননি তিনি। দ্রুত তাঁর পাশে দাঁড়ানোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

প্রতিবেশী রিতা হালদার বলেন, এক সময় যাত্রামঞ্চে তার অনেক নামডাক ছিল। মানুষ তাকে সম্মান করতো। আজ তিনি অসুস্থ হয়ে কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। কেউ যদি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়, তাহলে তার পরিবার কিছুটা স্বস্তি পাবে।

আরেক প্রতিবেশী অঞ্জনা হালদার বলেন, সুনীলদা এক সময় ভালোভাবেই সংসার চালাতেন। কিন্তু এখন খুব কষ্টে আছেন। সমাজের বিত্তবান মানুষ এগিয়ে এলে তিনি অন্তত দুবেলা খাবার জোগাড় করতে পারবেন।

প্রতিবেশী সঞ্চিত হালদার বলেন, ছয় সদস্যের পরিবারে প্রায়ই অভাব লেগেই থাকে। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটে তাদের।

এ বিষয়ে গাংনী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আনোয়ার হোসেন বলেন, সুনীল হালদারের বিষয়ে আমরা অবগত হয়েছি। তাকে সব ধরনের সরকারি সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

আসিফ ইকবাল/এমএন/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।