জীর্ণ ভবনে পাঠদান, ঝুঁকিতে ২৫ হাজার শিক্ষার্থী
বিদ্যালয়ের ভবন জরাজীর্ণ। যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় দুর্ঘটনা। এর মাঝেই ক্লাস করতে হচ্ছে কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীদের। লক্ষ্মীপুরের অন্তত ১৫০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র এটি। বিদ্যালয়গুলোতে প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে পড়াশুনা করছে। এ নিয়ে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
এদিকে জরাজীর্ণ ভবনের তালিকা করে যেন দায় সেরেছে শিক্ষা অফিস। সরকারি হিসেবে জেলাতে ১১৭টি বিদ্যালয় ভবন জরাজীর্ণ, বেসরকারি হিসেবে তা ১৫০টি বলে জানিয়েছে একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র।
জানা যায়, গত ২ এপ্রিল রায়পুর উপজেলার জনকল্যাণ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্লাস চলাকালে ছাদের পলেস্তারা খসে পড়েছে। এতে ৫ শিক্ষার্থী আহত হয়। বিদ্যালয়ের ওই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের বিষয়ে একাধিকবার চিঠি দিয়েও কোনো সুফল পাননি বলে জানিয়েছিলেন প্রধান শিক্ষক মো. সেলিম।
আরও পড়ুন:
খামারিদের লাভের স্বপ্নে ‘কাঁটা’ ভারতীয় গরু
জ্বালানি সংকটে মোটরসাইকেল ব্যবসায় ধস
বুঝে নেওয়ার ‘ঠেলাঠেলিতে’ দুই বছরেও চালু হয়নি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, লক্ষ্মীপুর জেলায় মোট ৭৩২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এরমধ্যে সরকারি সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী ১১৭টি বিদ্যালয়ের ভবন জরাজীর্ণ। সবচেয়ে বেশি রামগঞ্জে, সেখানে ৪০টি বিদ্যালয় জরাজীর্ণ। এছাড়া সদরে ১৪, রায়পুরে ২৭, রামগতিতে ১৬, কমলনগরে ২০টি বিদ্যালয়ের ভবন জরাজীর্ণ। এসব প্রতিষ্ঠানে ১৯ হাজার ছাত্রছাত্রী রয়েছে। ব্যবহারের অনুপযোগী শ্রেণিকক্ষ রয়েছে ৩২৮টি।
‘বাধ্য হয়েই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিশুরা ক্লাস করে। আমাদের আরেকটি ভবন রয়েছে। সেখানে স্থান সংকুলান না হওয়ায় পরিত্যক্ত ভবনেই শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে শুধু শিক্ষার্থী নয়, শিক্ষকরাও দুশ্চিন্তায় থাকেন।’
তবে জরাজীর্ণ তালিকায় নাম নেই রায়পুর স্টেশন মডেল মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। ওই প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কামরুন্নাহার বলেন, বাধ্য হয়েই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিশুরা ক্লাস করে। আমাদের আরেকটি ভবন রয়েছে। সেখানে স্থান সংকুলান না হওয়ায় পরিত্যক্ত ভবনেই শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে শুধু শিক্ষার্থী নয়, শিক্ষকরাও আতঙ্কে থাকেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে লক্ষ্মীপুরে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির শীর্ষ এক নেতা বলেন, বিভিন্ন সময় খোঁজ নিয়ে জেনেছি সদর, রায়পুর, রামগঞ্জ, রামগতি ও কমলনগরে ১৫০টি বিদ্যালয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কমপক্ষে ২৫ হাজার ছাত্রছাত্রী অধ্যয়নরত। অবুঝ এ শিশুরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে আসে। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে চারদিকে হইচই পড়বে, এখন তালিকা করেই দায় সারছে সংশ্লিষ্টরা।
আরও পড়ুন:
আলু চাষিদের ভাগ্য যেন উত্থান-পতনের গল্প
বন্ধ চিনিকলে আটকা হাজারো শ্রমিক-চাষির ভাগ্য
প্রত্যন্ত অঞ্চলের চিকিৎসকরা যেন ‘ঢাল-তলোয়ারহীন সেনাপতি’
পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী তানিয়া আক্তারের ভাষ্য, স্কুলে ভবন একটি। সেটি অনেক পুরোনো। ব্যবহার করার মতো না। তবুও বাধ্য হয়ে স্কুলে আসতে হয়। মনে ভয় থাকে সবসময়।
রায়পুরের দক্ষিণ দেনায়েতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র রাকিব হোসেন বলে, আমাদের স্কুলের ভবনটি ভালো না। ঝড়-বৃষ্টির সময় স্কুলে থাকলে অনেক ভয় হয়। অন্য স্কুলের মতো আমাদেরও নতুন বিল্ডিং হলে ভালো হতো।
‘জরাজীর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে কিছু বিদ্যালয়ে একাধিক ভবন থাকায় সেখানে ক্লাস হচ্ছে। এ অবস্থায় দুর্ঘটনা এড়াতে শিক্ষকদের বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বিদ্যালয়গুলোতে নতুন ভবন হচ্ছে।’
জেলার সেরা শিক্ষক মনোনীত হয়েছেন রামগঞ্জের পশ্চিম আঙ্গারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এ কে এম শামছুল ইসলাম পাটওয়ারী। তার বিদ্যালয়েও একটি ভবন পরিত্যক্ত। চার শতাধিক শিক্ষার্থী হওয়ায় হিমশিম অবস্থার কথা জানিয়ে এই শিক্ষক বলেন, ভবন চেয়ে অনেকবার চিঠি লিখেছি। কোনো কাজ হয়নি।

লক্ষ্মীপুর পৌরসভার লামচর এলাকার অভিভাবক নুরুল ইসলাম বলেন, সরকার প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থার তেমন উন্নতি হচ্ছে না। অধিকাংশ স্কুলের ভবন অবস্থা ভালো নয়। নিয়মিত তদারকি ও সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
রামগতির উত্তর পূর্ব চর হাসান হোসেন গোলাম রহমানিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম বলেন, দুর্গম এলাকার স্কুল হওয়ায় আমাদের ভোগান্তি বেশি। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই পাঠদান করাতে হচ্ছে। শ্রেণিকক্ষগুলো ব্যবহার করার মতো না।
রায়পুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মঈনুল ইসলাম বলেন, রায়পুরে ঝুঁকিপূর্ণ ২৭টি বিদ্যালয় ভবনের তালিকা করে জেলাতে পাঠানো হয়েছে। এরমধ্যে কয়েকটি বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত কক্ষ না থাকায় পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। অগ্রাধিকারভিত্তিতে ৮টি বিদ্যালয়ে নতুন ভবনের জন্য এমপির কাছে তালিকা পাঠানো হয়েছে।
এ বিষয়ে আতঙ্কের কথা স্বীকার করেন লক্ষ্মীপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) মোহাম্মদ সাজ্জাদ। তিনি বলেন, জরাজীর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে কিছু বিদ্যালয়ে একাধিক ভবন থাকায় সেখানে ক্লাস হচ্ছে। এ অবস্থায় দুর্ঘটনা এড়াতে শিক্ষকদের বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বিদ্যালয়গুলোতে নতুন ভবন হচ্ছে।
এমএন/এমএস