তাঁত শিল্পে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ বিদ্যুৎ বিভ্রাট
- অর্ধেকে নেমেছে কাপড় উৎপাদন
- ঈদের আগে বন্ধ হয়ে গেছে অধিকাংশ তাঁতকল
- কর্মহীন হয়ে পড়ছেন শ্রমিকরা
- উৎপাদন খরচ বাড়লেও কমেছে কাপড়ের দাম
এমনিতেই আগের জৌলুস হারিয়েছে সিরাজগঞ্জের তাঁতশিল্প। নানান সংকটে রুগ্ন অবস্থা। এর ওপর ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট (লোডশেডিং) তাঁতিদের জন্য ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে শাড়ি-লুঙ্গির চাহিদা থাকলেও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে কারখানাগুলোতে কাপড় উৎপাদন নেমেছে অর্ধেকে।
কারখানার মালিকরা ডিজেলচালিত জেনারেটরের সাহায্যে পাওয়ার লুম ও তাঁত কারখানা সচল রাখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু এতে শাড়ি, লুঙ্গি ও গামছা উৎপাদনে প্রায় চারগুণ বাড়তি টাকা ব্যয় হচ্ছে। ফলে ভারি হচ্ছে তাঁতিদের লোকসানের পাল্লা।
‘জেলার ৯টি উপজেলায় ৫ লাখ তাঁতকলে প্রায় ১০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তাঁত শিল্পের সঙ্গে জড়িত। তবে বেলকুচি, শাহজাদপুর ও এনায়েতপুরেই প্রায় ২ লাখ তাঁতে শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা ও থ্রি-পিস উৎপাদিত হয়। এতে প্রায় ৪ লক্ষাধিক মানুষ এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত। উৎপাদিত বস্ত্র দেশের চাহিদা মিটিয়ে ভারতসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়’
তাঁতবোর্ড সূত্র জানায়, জেলার ৯টি উপজেলায় ৫ লাখ তাঁতকলে প্রায় ১০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। তবে বেলকুচি, শাহজাদপুর ও এনায়েতপুরেই প্রায় ২ লাখ তাঁতে শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা ও থ্রি-পিস উৎপাদিত হয়। এতে প্রায় ৪ লক্ষাধিক মানুষ এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত। উৎপাদিত বস্ত্র দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়।

সুতা বুনে চলেছে তাঁত কাপড় তৈরির চেষ্টা করছেন তাঁতি/ ছবি: জাগো নিউজ
এ অঞ্চলের তাঁত মালিকরা জানান, সুতায় রঙ দেওয়া, শুকানো, সুতা তৈরি ও কাপড় উৎপাদনের জন্য প্রতিটি তাঁতে ৩-৪ জন শ্রমিকের প্রয়োজন। বিদ্যুৎ বিভ্রাটে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের ঠিকই মজুরি দিতে হয়। চাহিদামতো বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় অধিকাংশ তাঁত কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। আগে যেখানে ১০ জন শ্রমিক কাজ করতেন, বর্তমানে ৬ জন শ্রমিক কাজ করছেন। এতে কাপড়ের উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। অথচ রোজার ঈদের পর থেকেই লুঙ্গির দাম ১৫-২০ শতাংশ কমে গেছে। ফলে সব মিলিয়ে কাপড় উৎপাদনের এই ভরা মৌসুমেও বাধ্য হয়ে অনেকে তাঁত কারখানা বন্ধ রাখছেন।
‘ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে কাপড় তৈরি করতে পারছি না। দিনের সিংহভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। ফলে কাজ না করে বসে থাকতে হয়। এভাবে সংসারের ব্যয় নির্বাহ এখন কঠিন হয়ে পড়ছে’
তাঁতিরা জানান, সুতা, রঙসহ কাপড় উৎপাদনের প্রতিটি উপকরণের দাম বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় উৎপাদিত শাড়ি ও লুঙ্গির দাম না বেড়ে উল্টো কমেছে। রোজার ঈদে যে লুঙ্গি ২২০-২৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, সেই লুঙ্গির দাম এখন ১৮০-২০০ টাকা। অথচ গত বছরের ১৫ হাজার টাকা দামের এক ডোপ সুতার দাম এখন হাজার ২২ হাজার টাকায় উঠেছে। এ অবস্থায় তাঁত চালু রাখতে গিয়ে এমনিতেই লোকসান গুনতে হচ্ছে তাঁতিদের।
আরও পড়ুন:
পশু বেচাকেনায় শত বছরের পুরোনো প্রথা বদলে দিচ্ছে ‘লাইভ ওয়েট’
পরীক্ষার আগে বিদ্যুৎ সংকটে দিশাহারা এসএসসি পরীক্ষার্থীরা
জ্বালানি সংকটে মোটরসাইকেল মেকারদের জীবিকায় টান
ছাদবাগান থেকে শুরু, চাঁদপুরে এখন আঙুর চাষে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
এনায়েতপুর থানার খামার গ্রামের লাভলু-বাবলু কম্পোজিট টেক্সটাইলের তাঁত কারখানা ঘুরে দেখা গেছে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় বিদ্যুৎচালিত তাঁত পাওয়ার লুম মেশিন বন্ধ করে শ্রমিকরা বাইরে বসে লুডু খেলছেন। অনেকেই আবার মোবাইলে গান শুনে আবার কেউ অলস সময় পার করছেন।

তাঁত শ্রমিক জুলমাত আলী জাগো নিউজকে বলেন, ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে কাপড় তৈরি করতে পারছি না। দিনের সিংহভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। ফলে কাজ না করে বসে থাকতে হয়। এভাবে সংসারের ব্যয় নির্বাহ এখন কঠিন হয়ে পড়ছে।
‘সাধারণত ঈদ সামনে রেখে বন্ধ থাকা তাঁত চালু হয়। তবে এবার বেশির ভাগ তাঁতই চালু হয়নি। উল্টো চালু থাকা তাঁতগুলোই বন্ধ হতে শুরু করেছে’
শ্রমিক সোলায়মান জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় তাঁত বন্ধ, ডিজেলও পাওয়া যাচ্ছে না, তাই মেশিন বন্ধ রয়েছে। বাধ্য হয়ে লুডু খেলে সময় পার করছেন তিনি।
তাঁত মালিকরা বলছেন, অতিরিক্ত মূল্য দিয়েও চাহিদামতো জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। প্রান্তিক পর্যায়ের তাঁতিদের কাপড় উৎপাদন কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। ফলে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। সময়মতো অর্ডার ডেলিভারি দিতে না পারায় তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অনেকেই ঝুঁকি এড়াতে পেশা বদলে ফেলছেন। কেউ কেউ আবার ব্যাংক লোন নিয়েও টিকে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন।

আরও পড়ুন:
রূপগঞ্জে বিদ্যুতের ‘লুকোচুরি’, উৎপাদন সংকটে ২ হাজার কলকারখানা
বাঁশ-বেতের শিল্পে পাহাড়ের প্রাণ, টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম লাকি চাকমার
বন্ধ চিনিকলে বাড়ছে দেনা-দুর্ভোগ
আলু চাষিদের ভাগ্য যেন উত্থান-পতনের গল্প
বেলকুচি তামাই গ্রামের ‘রাজবিথি লুঙ্গি’ কারখানার স্বত্বাধিকারী সাইফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, সাধারণত ঈদ সামনে রেখে বন্ধ থাকা তাঁত চালু হয়। তবে এবার বেশিরভাগ তাঁতই চালু হয়নি। উল্টো চালু থাকা তাঁতগুলোই বন্ধ হতে শুরু করেছে।
‘বড় বড় তাঁত কারখানা মালিকরা চড়া দামে ডিজেল কিনে কাপড় তৈরি করছেন। কিন্তু এতে উৎপাদন ব্যয় চারগুণ বাড়লেও লুঙ্গি ও শাড়ির দাম বাড়ছে না। অপরদিকে প্রান্তিক তাঁতিরা, যাদের ৫-১০ তাঁত রয়েছে তারা বাধ্য হচ্ছে তাঁতকল বন্ধ করতে। এভাবে আর কিছুদিন চললে হস্তচালিত তাঁত বাদে পাওয়ার লুমগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। এতে কয়েক লাখ মানুষ বেকার হয়ে পড়বে। দ্রুত এ সংকট নিরসন না হলে তাঁত শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়বে’
তাঁতি লোকমান শেখ বলেন, শুধু তামাই গ্রামেই ১০ হাজারের অধিক যন্ত্রচালিত তাঁত রয়েছে। কিন্তু লোডশেডিং ও জ্বালানি তেল সংকটে অনেকেই তাঁতকল বন্ধ রেখেছে। রোজার ঈদে যেসব তাঁতি প্রতি সপ্তাহে তিন থেকে চার হাজার টাকা রোজগার করেছেন, এখন তাদের এক হাজার টাকা রোজগার হওয়াই মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেন্দ্রীয় তাঁতি সমিতির সভাপতি আব্দুস ছামাদ খান জাগো নিউজকে বলেন, বড় বড় তাঁত কারখানা মালিকরা চড়া দামে ডিজেল কিনে কাপড় তৈরি করছেন। কিন্তু এতে উৎপাদন ব্যয় চারগুণ বাড়লেও লুঙ্গি ও শাড়ির দাম বাড়ছে না। অপরদিকে প্রান্তিক তাঁতিরা, যাদের ৫-১০টি তাঁত রয়েছে তারা বাধ্য হচ্ছে তাঁতকল বন্ধ করতে। এভাবে আর কিছুদিন চললে হস্তচালিত তাঁত বাদে পাওয়ার লুমগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। এতে কয়েক লাখ মানুষ বেকার হয়ে পড়বে। দ্রুত এ সংকট নিরসন না হলে তাঁত শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়বে।
এনএইচআর/এফএ/জেআইএম