স্বামী ছেড়ে গেছে, অন্ধ মেয়েকে আগলে রেখেছেন মা
পৃথিবীতে সবচেয়ে আপন কে?—মা। সন্তানের সুখের জন্য নিজের সব আরাম-আয়েশ বিসর্জন দেন কে?—মা। এগুলো প্রমাণ করা লাগে না। এটি পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত সত্য। সেই সত্যের চাক্ষুষ উদাহরণ বৃদ্ধা সোনাভান।
অন্ধত্বের কারণে শ্বশুরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলেও মেয়েকে ফেলতে পারেননি মা। আগলে রেখেছেন খুব যত্ন করে। মেয়ের সেবাযত্ন করেই তার দিন চলে যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রায় ৪০ বছর আগে মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদি ইউনিয়নের তালতলা এলাকার সামচু হাওলাদারের (৭৫) সঙ্গে একই এলাকার কেরামত আলীর মেয়ে সোনাবানের (৬০) বিয়ে হয়। বিয়ের পর তার সংসার আলো করে আসে তিন মেয়ে ও দুই ছেলে। বর্তমানে এক ছেলে সৌদি আবর থাকেন। আরেক ছেলে ও তার স্বামী করেন কৃষিকাজ। সোনাভানের বড় মেয়ের নাম কোমেলা বেগম। তিনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। এজন্য শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে রাখেনি। এরপর থেকে মা সোনাভানই তার সব। তিনিই পরম যত্নে আগলে রেখেছেন প্রতিবন্ধী মেয়েটিকে।
বড় মেয়ে কোমেলা বেগম তখন তালতলা ব্র্যাক স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। বাবার সংসারের অভাবের কারণে মাত্র ১৩ বছর বয়সে পাশের গ্রামের কুদ্দুস শেখের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের বছর না পেরুতেই অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে কোমেলা। জন্ম দেয় এক ছেলেসন্তান। তখন তার স্বামী কুদ্দুস শেখ একটি মসজিদের ইমাম ছিলেন। ছেলে মাহামুদুল হাসান শেখকে নিয়ে স্বামীর সংসারে অনেক অভাবে দিন কাটাছিলেন কোমেলার। তখনো কোমেলা বেগম জানতেন না জীবনে কতবড় বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে তাকে। স্বামীর সংসারে কিছুদিন গড়াতে না গড়াতেই নির্যাতনের শিকার হতে হয় তাকে।
বাবার বাড়ি থেকে যৌতুক হিসেবে টাকা এনে দিতে চাপ দিতে থাকেন স্বামী কুদ্দুস শেখ। দরিদ্র বাবার কাছে হাত পেতে কিছু অর্থ আনার মতো কোনো অবস্থাই ছিল না কোমেলা বেগমের। ছেলে মাহামুদুল হাসান শেখের বয়স যখন তিন বছর, তখন তার গর্ভে আসে আরও একটি সন্তান।

অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ঘরের চৌকি থেকে পড়ে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন কোমেলা বেগম। শিশু জন্মের পরেই তার দুটি চোখের আলো নিভে যায়। ৯ মাস গর্ভধারণ করে মা হয়েও তার ভাগ্যে মেলেনি মেয়েকে একবার দেখার সুযোগ। মেয়ের নাম রাখেন সুমাইয়া আক্তার। সুমাইয়া দেখতে কী রকম তাও জানেন না এই মা।
এদিকে স্ত্রীর এই অন্ধ হওয়া কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি তার স্বামী কুদ্দুস শেখ। একদিন সবার অজান্তে অন্ধ স্ত্রী ও তার দুই সন্তানকে ফেলে রেখে নিরুদ্দেশ হয়ে যান কুদ্দুস শেখ। প্রায় ৯ বছর পরে কোমেলা বেগম জানতে পারেন, কুদ্দুস শেখ আবার বিয়ে করেছেন। সেই ঘরে একটি কন্যাসন্তানও আছে। পরে সময়ে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে মেনে নিতে না পারায় কোমেলা বেগম নিজেই কুদ্দুস শেখকে ডিভোর্স দেন।
এরপর দুই সন্তান নিয়ে অসহায় মা কোমেলা বেগমের বাবার বাড়িতেই শুরু হয় সংগ্রামের জীবন। অন্ধ হওয়ায় কোনো কাজ করতে পারেন না। নিজের সব কিছুই করে দেন তার মা সোনাভান।
দিনে দিনে ছেলে মাহামুদুল হাসানকে ঘিরে অসহায় কোমেলা স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। ছেলে পড়াশোনা করে বড় হবে, চাকরি করবে। তখন আরও অভাব থাকবে না। কিন্তু অসহায় মা কোমলে বেগমের সেই স্বপ্ন নিমিষেই শেষ হয়ে যায়। ২০১৯ সালের ২৬ জুন একটি বিষধর সাপের ছোবলে তার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়। সকালে নিজের ঘরে কম্পিউটারে কাজ করার সময় টেবিলে নিচে পা পড়তেই বিষধর সাপের কামড় দেয় মাহামুদুল হাসানকে। এতে তার মৃত্যু হয়।
ছেলেকে হারিয়ে আরও অসহায় হয়ে পড়েন এই প্রতিবন্ধী মা। মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। দেখা দেয় মানসিক সমস্যা। এরপর থেকে মেয়েকে আরও আঁকড়ে ধরেন মা সোনাভান।

তবে সোনাবানের এখন বয়স হয়েছে। এক ছেলে বিদেশ থাকেন। আরেক ছেলে আলাদা সংসার গড়েছেন। এখন স্বামী সামচু হাওলাদার ও মেয়ে কোমেলাকে নিয়েই সংসার সোনাভানের।
বর্তমানে সোনাভানের স্বামী ক্যানসার আক্রান্ত। চিকিৎসার খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এত বিপদ সত্ত্বেও তার মৃত্যুর পর এই অন্ধ মেয়ের কী হবে, এই চিন্তায় দিশাহারা সোনাভান।
অন্ধ কোমেলা বেগম বলেন, ‘আমি চোখে দেখতে পারি না। নিজে একা একা কিছুই করতে পারি না। আমার মা সব কিছু করিয়ে দেন। আমাকে খাইয়ে দেন, গোসল করিয়ে দেন, এমনকি টয়লেটে গেলেও তিনি হাত ধরে দিয়ে আসেন। আমার মা না থাকলে আমার কী হতো তা আল্লাহই জানে।’
তিনি বলেন, ‘অনেক স্বপ্ন ছিল ছেলেকে স্বাবলম্বী করলে আমার আর দুঃখ থাকবে না। কিন্তু আল্লাহ সেই স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছেন। স্বামী আমাকে ছেড়ে গেলেও মা আমাকে আগলে রেখেছেন।’
কোমেলা বেগমের মা সোনাবান বলেন, ‘আমার বড় সন্তান এই কোমেলা। আমার কোল আলো করে ফুটফুটে চাঁদের মতো সৌন্দর্য নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু অসুস্থতায় সে অন্ধ হয়ে গেলে তার স্বামী তাকে ফেলে রেখে চলে যায়। তখন থেকে ওর সব দায়িত্ব আমি পালন করছি। ছোটবেলায় যেভাবে যত্ন করতে হয়েছে, এখনো সেই একইভাবে যত্ন করতে হয়।’
তিনি বলেন, ‘আমি যতদিন বেঁচে আছি এই সন্তানকে নিয়ে থাকতে চাই। তাছাড়া আমার মেয়েওতো মা। সে তার একমাত্র ছেলের মারা যাওয়া মেনে নিতে না পারায় মানসিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। এখন আমিই তার সব।’
প্রতিবেশী পারভীন বেগম বলেন, ‘অন্ধ কোমেলাকে তার মা সোনাভান যেখানে আদর-যত্ন করেন তা বিরল। সোনাভান সর্ম্পকে আমার জা হয়। তিনি না থাকেল কোমেলার কী অবস্থা হতো, তা আল্লাহ জানে।’
এ বিষয়ে মাদারীপুরের সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আফজাল হোসাইন বলেন, ‘কোমেলা বেগম যেহেতু অন্ধ প্রতিবন্ধী আর তার মা বৃদ্ধ। তাই তারা যদি প্রতিবন্ধী ভাতা ও তার মা বয়স্ক ভাতা না পেয়ে থাকেন, তার ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কোমেলার বাবা ক্যানসার আক্রান্ত। তিনি প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ সমাজসেবা অধিদপ্তর দরখাস্ত করলে, যাচাই বাচাই করে সহযোগিতার ব্যবস্থা করা হবে।’
আয়শা সিদ্দিকা আকাশী/এসআর/এমএস