সরকারি আজিজুল হক কলেজ

ছাত্রদের আবাসিক হল এখন ‘স্টাফ কোয়ার্টার’

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক বগুড়া
প্রকাশিত: ০১:৪৬ পিএম, ১২ মে ২০২৬
দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের জন্য বন্ধ থাকা আবাসিক হলে থাকছেন কর্মচারীরা/ছবি: জাগো নিউজ
  • ১৭ বছর ধরে তালাবদ্ধ আজিজুল হক কলেজের তিন ছাত্রাবাস
  • মেরামতের নামে দফায় দফায় কোটি টাকা খরচ
  • দুই হলে পাঁচ পরিবারের সংসার, কলেজের টাকায় ব্যয়ভার
  • পরিত্যক্ত আরেক হলে মাদক, চুরি আর ভাঙনের রাজত্ব

দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বন্ধ বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজের তিন ছাত্রহল। আবাসন সংকটে ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর নাভিশ্বাস উঠলেও ‘পরিত্যক্ত’ ঘোষিত হলগুলো চালু হয়নি। তবে সরকারি খরচে হলে চলছে কর্মচারীদের সংসার। বসছে মাদকসেবীদের আড্ডাও। সংস্কারের নামে দফায় দফায় কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব দেখানো হলেও বাস্তবে শিক্ষার্থীদের জন্য হলের দুয়ার খোলেনি। এতে হল চালুর বিষয়ে কলেজ প্রশাসনের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দীর্ঘ সময়ে ‘বন্ধ’ ঘোষিত হলগুলো আদৌ পুরোপুরি বন্ধ ছিল না। শহীদ তিতুমীর হলের একাধিক কক্ষে নিয়মিত বসবাস চলছে। কোথাও বিছানা পাতা, কোথাও আলমারি, কোথাও রান্নার চুলা। শিশুদের বইখাতা পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন কক্ষে। বর্তমানে তিতুমীর হলে তিনটি পরিবার বসবাস করছে। কলেজ মসজিদের মোয়াজ্জিন জাহিদুল ইসলাম ছেলে-মেয়েসহ চার সদস্য নিয়ে ২০২১ সাল থেকে সেখানে আছেন। একই হলে কলেজের ইলেকট্রিশিয়ান আজাহারুল দুই মেয়েসহ পরিবার নিয়ে থাকছেন। আরেক কক্ষে স্টাফ রশিদুজ্জামান রতন থাকছেন তার পরিবারসহ।

ছাত্রদের আবাসিক হল এখন ‘স্টাফ কোয়ার্টার’

আরও পড়ুন:
খামারিদের লাভের স্বপ্নে ‘কাঁটা’ ভারতীয় গরু
জ্বালানি সংকটে মোটরসাইকেল ব্যবসায় ধস
বুঝে নেওয়ার ‘ঠেলাঠেলিতে’ দুই বছরেও চালু হয়নি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল

অন্যদিকে আক্তার আলী মুন হলেও বসবাস করছে আরও দুটি পরিবার। অধ্যক্ষের বাসার নৈশপ্রহরী হজরত আলী স্ত্রী-সন্তানসহ থাকছেন সেখানে। একই হলে অফিস সহকারী জাহাঙ্গীর আলমও স্ত্রী সন্তান নিয়ে বসবাস করছেন। যেসব ভবনকে দীর্ঘদিন ধরে ‘শিক্ষার্থীদের জন্য অযোগ্য’ বলা হচ্ছে, সেই ভবনেই স্বাভাবিকভাবে চলছে পারিবারিক জীবন। রান্না হচ্ছে, বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে, নিয়মিত শৌচাগার পরিষ্কারসহ দৈনন্দিন জীবনযাপন চলছে।

‘দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার সুযোগে হলগুলোর অনেক আসবাব, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও ব্যবহারযোগ্য মালামাল লুটপাট করার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। আর সংস্কারের নামে বিভিন্ন সময়ে ব্যয় দেখানো হলেও বাস্তবে অধিকাংশ ভবন এখনো জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত।’

জানতে চাইলে ইলেকট্রিশিয়ান আজাহারুল বলেন, ‘আমরা ওঠার আগেই কলেজ প্রশাসন সংস্কার করেছিল। থাকার মতো করেই রাখা হয়েছে। তিনি আরও জানান, বিদ্যুৎ বিল কলেজ কর্তৃপক্ষই দেয়, থাকার ব্যবস্থা প্রশাসনের অনুমতিতেই হয়েছে।’

কলেজ মসজিদের মোয়াজ্জিন জাহিদুল ইসলাম জানান, আগে ফজলুল হক হলে মাদকসেবীদের আড্ডা হতো, অনেক মালামালও চুরি হয়েছে। এ কারণে কলেজ প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে তিনি পরিবারসহ বসবাস করছেন। এতে ভবনটি দেখভাল হচ্ছে, তাদেরও থাকা হচ্ছে।

ছাত্রদের আবাসিক হল এখন ‘স্টাফ কোয়ার্টার’

কলেজের অধ্যক্ষ মো. মাহফুজুল ইসলাম জানান, বন্ধ থাকা হলগুলো চালু করতে সময় লাগবে। এগুলো বসবাস উপযোগী করতে বড় ধরনের সংস্কার ও সরকারি বরাদ্দ প্রয়োজন। ইতোমধ্যে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে সংস্কারের জন্য চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে কাজ শেষে হলগুলো চালু করা হবে। এছাড়াও ছাত্রদের নিরাপত্তা স্বার্থে হোস্টেলগুলোর বাউন্ডারি দেওয়ালের প্রয়োজন।

‘বন্ধ থাকা হলগুলো চালু করতে সময় লাগবে। এগুলো বসবাস উপযোগী করতে বড় ধরনের সংস্কার ও সরকারি বরাদ্দ প্রয়োজন। ইতোমধ্যে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে সংস্কারের জন্য চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে কাজ শেষে হলগুলো চালু করা হবে। এছাড়াও ছাত্রদের নিরাপত্তা স্বার্থে হোস্টেলগুলোর বাউন্ডারি দেওয়ালের প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, ‘যে দুটি হলে কর্মচারীরা অবস্থান করছেন, তারা মূলত নিরাপত্তা ও পাহারার দায়িত্বে সেখানে থাকছেন। এ কারণে সেখানে থাকার খরচ কলেজ কর্তৃপক্ষ বহন করে। তাদের কাছে থেকে কোনো ভাড়া নেওয়া হয় না।’

ভবনগুলো সত্যিই বসবাসের অনুপযোগী হয় তাহলে সেখানে কীভাবে বছরের পর বছর পরিবার থাকছে, আর যদি তা বসবাসযোগ্য হয় তাহলে শিক্ষার্থীদের জন্য কেন তা খোলা হচ্ছে না, এমন প্রশ্নে অধ্যক্ষ জানান, তিনি নতুন এসেছেন। আগে আরও অনেকে দায়িত্বপালন করলেও কেন চালু করার উদ্যোগ নেননি সেটি তিনি জানেন না। তবে এখন হলগুলো চালু করার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে তিনি সহযোগিতার আবেদন করেছেন।

ফজলুল হক হলে মাদকসেবীদের রাজত্ব

শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক হলের চিত্র আরও ভয়াবহ। ভবনটির বিভিন্ন কক্ষের দরজা-জানালা খুলে নেওয়া হয়েছে। দেওয়ালের প্লাস্টার খসে পড়ছে, চারপাশজুড়ে আগাছা ও ঝোপঝাড়। সন্ধ্যার পর ভবনটিকে ঘিরে তৈরি হয় ভিন্ন এক পরিবেশ। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই এলাকায় নিয়মিত মাদকসেবী ও বহিরাগতরা আড্ডা বসায়। শিক্ষার্থীরা জানান, রাতে সেখানে যেতে পর্যন্ত ভয় লাগে। একসময় এই হল ছিল ছাত্ররাজনীতির কেন্দ্র। এখন সেটি মাদকসেবীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে।

ছাত্রদের আবাসিক হল এখন ‘স্টাফ কোয়ার্টার’

ইসলামের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বিপুল বলেন, ‘প্রথমে নাটোর থেকে যাতায়াত করতাম। পরে বুঝলাম এটা সম্ভব না। এখন মেসে থাকি। মাসে প্রায় ৭ হাজার টাকা খরচ হয়। গাইবান্ধা থেকে আসা আরেক শিক্ষার্থী আবু তাহের বলেন, বাবা কৃষক। মেস ভাড়া দিতে গিয়ে পরিবারে চাপ পড়ে যান। অনেক সময় টিউশন করতে হয়। সাধারণ মানের একটি সিট ভাড়া ২ থেকে ৪ হাজার টাকা। খাবার, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটসহ মাসিক ব্যয় দাঁড়ায় ৭ থেকে ১০ হাজার টাকায়।’

‘যে দুটি হলে কর্মচারীরা অবস্থান করছেন, তারা মূলত নিরাপত্তা ও পাহারার দায়িত্বে সেখানে থাকছেন। এ কারণে সেখানে থাকার খরচ কলেজ কর্তৃপক্ষ বহন করে। তাদের কাছে থেকে কোনো ভাড়া নেওয়া হয় না।’

শিক্ষার্থী আব্দুল কাদের বলেন, ‘মেসে থাকতে গিয়ে তাদের বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে। হলগুলো বন্ধ থাকায় কলেজসংলগ্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে মেসনির্ভর অর্থনীতি। স্থানীয় বাড়ির মালিক, মেস ব্যবসায়ী ও খাবারের দোকানগুলোর বড় অংশই শিক্ষার্থীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।’

বেশ কয়েকজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘কলেজ প্রশাসনের বড় উদ্বেগ অতীতের রাজনৈতিক সংঘর্ষের অভিজ্ঞতা। একসময় হলগুলো ছাত্ররাজনীতির কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। দখল, সংঘর্ষ ও সিট বাণিজ্যের কারণে প্রশাসন নতুন করে ঝুঁকি নিতে চায় না। কর্তৃপক্ষ মনে করে, হল খুললে আবার রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।’

আরও পড়ুন:
আলু চাষিদের ভাগ্য যেন উত্থান-পতনের গল্প
বন্ধ চিনিকলে আটকা হাজারো শ্রমিক-চাষির ভাগ্য
প্রত্যন্ত অঞ্চলের চিকিৎসকরা যেন ‘ঢাল-তলোয়ারহীন সেনাপতি’

ছাত্রদের আবাসিক হল এখন ‘স্টাফ কোয়ার্টার’

বারবার সংস্কার, খোলেনি হলের তালা

অনুসন্ধানে কলেজের হলগুলো নির্মাণের পর সংস্কার ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ সমন্বিত সরকারি হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথি, কলেজ প্রশাসনের একাধিক দাপ্তরিক তথ্য, পুরোনো উন্নয়ন বরাদ্দ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে একটি আর্থিক চিত্র পাওয়া গেছে। সেই হিসেবে নব্বই দশকের শেষভাগ থেকে ২০০০ সালের শুরুর দিকে সরকারি শিক্ষা অবকাঠামো সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় হলগুলো নির্মাণ করা হয়। সে সময় তিনটি হল নির্মাণে সম্মিলিতভাবে প্রায় ৮ থেকে ১০ কোটি টাকার সমপরিমাণ সরকারি ব্যয় হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি করেছে। ২০০৯ সালে ছাত্ররাজনীতি ও সহিংসতাজনিত অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে হলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর দীর্ঘ সময় সেগুলো অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে। এরপর কয়েক দফায় সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা ছিল খণ্ডিত ও সীমিত পরিসরের।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ও কলেজের নিজস্ব তহবিল থেকে ধাপে ধাপে কয়েক কোটি টাকার মেরামত ও সংস্কার কাজ দেখানো হয়। এর মধ্যে ছিল বৈদ্যুতিক লাইন সংস্কার, দরজা-জানালা পরিবর্তন, দেওয়াল পলেস্টার, ছাদ মেরামত, স্যানিটেশন কাজ, পানির লাইন পুনঃস্থাপন ও কিছু কক্ষ আংশিক ব্যবহার উপযোগী করার কার্যক্রম। কিন্তু সংস্কার শেষে হলগুলো শিক্ষার্থীদের জন্য খুলে দেওয়ার কোনো কার্যকর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ফলে সংস্কার ব্যয়ের পরও ছাত্রাবাসগুলো বছরের পর বছর তালাবদ্ধই পড়ে থাকে।

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর বগুড়ার সহকারী প্রকৌশলী সবুজ মিয়া জানান, তার জানা মতে বন্ধ হলগুলো চার বছর আগে সংস্কার করা হয়েছিল। তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলীর সময়ে এই সংস্কার কাজ সম্পন্ন হয়। এরপর থেকে হলগুলোতে নতুন করে আর কোনো সংস্কার কাজ করা হয়নি। এখন এ ব্যাপারে পুরাতন হলগুলোর ফাইল চেক করারও সুযোগ নেই।

কলেজের কর্মচারীরা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার সুযোগে হলগুলোর অনেক আসবাব, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও ব্যবহারযোগ্য মালামাল লুটপাট করার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। আর সংস্কারের নামে বিভিন্ন সময়ে ব্যয় দেখানো হলেও বাস্তবে অধিকাংশ ভবন এখনো জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত।

ছাত্রদের আবাসিক হল এখন ‘স্টাফ কোয়ার্টার’

সরকারি আজিজুল হক কলেজে বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। উত্তরাঞ্চলের এই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বগুড়া ছাড়াও গাইবান্ধা, জয়পুরহাট, নওগাঁ, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, রংপুরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয়। তাদের বড় অংশই নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। তাদের কাছে এই কলেজই উচ্চশিক্ষার একমাত্র ভরসা।

২০০৯ সালের ২০ ডিসেম্বর ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষের পর শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক হল, আক্তার আলী মুন হল ও শহীদ তিতুমীর হল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এ পর্যন্ত কলেজে পরিবর্তন হয়েছেন ৯ জন অধ্যক্ষ। কিন্তু হল খোলার সিদ্ধান্ত আর বাস্তবায়ন হয়নি। এখন ভবনের ভেতরে ছাদে লাগানো নতুন ফ্যানগুলো জংপড়ে ঝুঁকিপূণভাবে ঝুলছে। স্তূপ করে রাখা হয়েছে ছাত্রদের ব্যবহারের জন্য সরকারিভাবে প্রদান করা লোহার বেডগুলো। এরমধ্যে অনেক ফ্যান ও বেড চুরি হয়ে গেছে।

এমএন/এসআর/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।