ভ্যানভর্তি সবজি মাঝে ছোট্ট আয়েশাকে নিয়ে মা শিউলি বেগমের সংগ্রামী জীবন

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কিশোরগঞ্জ
প্রকাশিত: ১২:২৬ পিএম, ১৩ মে ২০২৬

এক হাতে ভ্যানের হ্যান্ডেল, অন্য হাতে সংসারের লাগাম। ভ্যানভর্তি শাক-সবজি আর তার মাঝখানে বসে থাকে দুই বছরের ছোট্ট মেয়ে আয়েশা। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কিশোরগঞ্জ শহরের এক রাস্তা থেকে আরেক রাস্তায় ঘুরে এভাবেই সবজি বিক্রি করেন শিউলি বেগম। জীবনযুদ্ধের কঠিন বাস্তবতায় সন্তানকে সঙ্গী করেই এগিয়ে চলছেন এই সংগ্রামী নারী।

কিশোরগঞ্জ শহরের বিভিন্ন এলাকায় দেখা মেলে শিউলি বেগমের। ভ্যানের একপাশে সাজানো থাকে লাউ, কুমড়া, শাক-সবজি। আর মাঝখানে বসে থাকে তার ছোট্ট শিশু সন্তান। মায়ের সঙ্গে সারা শহর ঘুরেই কাটে শিশুটির দিন।

স্থানীয়রা জানান, সকাল হলেই শহরের অলিগলি, ব্যস্ত সড়ক আর দোকানের সামনে সামনে দেখা যায় শিউলিকে। কখনো দাঁড়িয়ে ডাকছেন ক্রেতাদের, কখনো আবার ভ্যান ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছেন অন্য এলাকায়। রোদ, বৃষ্টি কিংবা ক্লান্তি, কিছুই যেন থামাতে পারছে না তাকে।

ভ্যানভর্তি সবজি মাঝে ছোট্ট আয়েশাকে নিয়ে মা শিউলি বেগমের সংগ্রামী জীবন

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের দাসেরগাঁ গ্রামের বাসিন্দা শিউলি বেগমের বয়স ৩৫ বছর। তিন মেয়ে ও এক ছেলে সন্তানের জননী তিনি। স্বামী ছেড়ে চলে গেছেন। বর্তমানে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মারিয়া এলাকায় চার সন্তান নূর মোহাম্মদ (১৫), মাঈশা (৯), আনিশা (৫) ও আয়েশাকে (২) নিয়ে একটি ভাড়া বাসায় থাকেন তিনি।

শিউলি বেগম বলেন, ‘সংসার বাঁচাইতে হইলে ঘরে বসে থাকলে হবে না। দুই বছরের দুধের বাচ্চাডারে রেখে যাওনও যায় না। তাই সঙ্গে নিয়াই বের হই।’

তিনি জানান, সংসারের অভাব দূর করতে আগে বাসায় কাপড়ের ব্যবসা করতেন। কিন্তু তাতে সংসার চলে না। বড় ছেলে নূর মোহাম্মদকে মাদরাসায় ভর্তি করিয়ে হাফেজ বানানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন। চার পারা কোরআন মুখস্থ করার পর ছেলে আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেনি। পরে তাকে একটি বেকারিতে কাজে দেন। কিন্তু তীব্র গরমের কারণে সেখানেও টিকতে পারেনি সে। ছোট দুই মেয়ে মাদরাসায় লেখাপড়া করে।

ভ্যানভর্তি সবজি মাঝে ছোট্ট আয়েশাকে নিয়ে মা শিউলি বেগমের সংগ্রামী জীবন

শিউলি বলেন, ‘বেশ কিছুদিন হইলো ভ্যানে কইরা সবজি বিক্রি শুরু করছি। নিজেই দূরের বাজার থেইকা সবজি কিনে আনি, পরে শহরে ফেরি কইরা বিক্রি করি। অনেকে অনেক কথা কয়, আবার অনেকে সহানুভূতি দেখায়। লাভ একটু হইতাছে। দেখি এভাবেই সংসার চালাইতে পারি কি না। হাত না পেতে কাজতো একটা করতাছি।’

তার এই সংগ্রামী জীবনের দৃশ্য অনেক পথচারীকেও আবেগাপ্লুত করে। কেউ থেমে সবজি কিনে উৎসাহ দেন, কেউ আবার ছোট্ট শিশুটির দিকে তাকিয়ে নীরবে অনুভব করেন এক মায়ের কঠিন সংগ্রামের গল্প। এই সংগ্রাম শুধু একজনের নয় পাঁচ পাঁচটি প্রাণের।

শহরের বাসিন্দা ফজলে হাসান বলেন, এই শিউলি বেগম শুধু একজন সবজি বিক্রেতা নন, তিনি বর্তমান সমাজের একজন সংগ্রামী নারীর প্রতীক। প্রতিকূলতার মধ্যেও সন্তানদের আঁকড়ে ধরে যেভাবে বেঁচে থাকার সংগ্রামে নেমেছেন, তা সত্যিই অন্য নারীদের অনুপ্রেরণা দেয়।

এসকে রাসেল/এফএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।