নড়িয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
চালুর আগেই হাসপাতালের ৩৫ লাখ টাকার মালামাল লুট
আধুনিক ও আইসিইউ সুবিধা সংবলিত শরীয়তপুরের নড়িয়ার ৫০ শয্যা বিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি একটি পক্ষের আইনি বাধায় দীর্ঘদিনেও চালু করা সম্ভব হয়নি। অরক্ষিত অবস্থায় থাকায় এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কয়েক দফায় মালামাল লুট করে নিয়েছে একটি চক্র।
সবশেষ গত ১ মে তালা ভেঙে হাসপাতালের জেনারেটরের কয়েল, এসিসহ অন্তত ৩৫ লাখ টাকার মূল্যবান মালামাল চুরি করে নিয়ে যায় চক্রটি। এ ঘটনায় থানায় একটি মামলা দায়ের করেন স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা।
নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ জানায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকল্পের আওতায় ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে নড়িয়া পৌরসভার বৈশাখীপাড়া এলাকায় নির্মাণ শুরু হয় ৫০ শয্যা বিশিষ্ট নতুন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ৪ তলা হাসপাতালটির মূল ভবনের পাশাপাশি রয়েছে চিকিৎসক, নার্সদের নতুন কোয়ার্টারসহ আরও ৫টি ভবন। নতুন হাসপাতালটিতে রোগীদের জন্য আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ সুবিধাসহ মুমূর্ষু রোগীদের জন্য রয়েছে ৫টি আইসিইউ। হাসপাতালটি তৈরি শেষে উদ্বোধনের তারিখ ছিল ২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বরে।

তবে মুলফৎগঞ্জ এলাকা থেকে পুরাতন হাসপাতালের কার্যক্রম সরিয়ে নেওয়ায় আপত্তি জানিয়ে আদালতের দারস্থ হয় স্থানীয় একটি পক্ষ। এতে আটকে যায় নতুন ভবন উদ্বোধনের কার্যক্রম। এরপর ২ বছরে কয়েক দফা চেষ্টা করা হলেও তা কার্যকর হয়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পুরাতন ভবনটির অবস্থান নড়িয়া মূল উপজেলা থেকে সাড়ে ৩ কিলোমিটার দূরে পদ্মা নদীর কোলঘেঁষা কেদারপুর ইউনিয়নের মুলফৎগঞ্জ এলাকায়। ২০১৮ সালে নদীভাঙনের শিকার হয়ে হাসপাতালটির ৩ তলার মূল ভবনটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। পরবর্তীতে হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম সচল রাখতে পাশের সরকারি কোয়ার্টারগুলোতে সরিয়ে নেওয়া হয়। এছাড়াও হাসপাতালের মূল চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে একটি পরিত্যক্ত ভবনে। জায়গা স্বল্পতার কারণে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা অর্ধেকে নেমে আসে। ৫০ জন রোগীর শয্যার বিপরীতে শুধুমাত্র ২৫টি শয্যার ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া এক্সরে যন্ত্র থাকার পরও কক্ষের অভাবে সেটি বসানো সম্ভব হয়নি। প্যাথলজি বিভাগ ও অপারেশন থিয়েটার সরকারি কোয়ার্টারে স্বল্প পরিসরে চালু রয়েছে। পুরাতন হাসপাতালে ভবন আর জায়গা সংকটের কারণে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে বলে জানায় হাসপাতালের কর্মচারীরা।
এদিকে আইনি জটিলতায় হস্তান্তর প্রক্রিয়া ব্যর্থ হলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে নতুন হাসপাতালে নিরাপত্তা প্রহরীর ব্যবস্থা রাখা হয়। পরে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হাসপাতালটিতে অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। নির্বাচনের পর সেনা ক্যাম্পটি সরিয়ে নেওয়া হলে হাসপাতাল ভবনটি পুনরায় অরক্ষিত হয়ে পড়ে। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি চক্র গত ১ মে শুক্রবার রাতে হাসপাতালের কয়েকটি ভবনের তালা ভেঙে জেনারেটরের কয়েল, এসি ও এসির যন্ত্রাংশসহ অন্তত সাড়ে ৩৪ লাখ টাকার মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যায়। এ ঘটনায় গত ৬ মে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন জেলার স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী দেবব্রত হালদার।

বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। আলমগীর হাওলাদার নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, এই হাসপাতালে আইসিইউ আছে। চালু না হওয়ায় আজ হাজারো মানুষ এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত। হাসপাতাল থেকে লাখ লাখ টাকার মালামাল চুরি হয়ে গেছে। এটা দেখভাল করার মতো কেউ নেই। ভবিষ্যতেও যে চুরি হবে না, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। আমরা চাই বিষয়টি পুলিশ প্রশাসন দেখে চোরদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হোক।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আলম শেখ বলেন, এত সুন্দর একটি হাসপাতাল থাকার পরও চালু না হওয়ায় আমরা রোগী নিয়ে জেলা শহরে, না হয় ঢাকায় ছুটে যাই। কয়েক কোটি টাকা খরচ করে হাসপাতালটি তৈরি করা হয়েছে। একদিন আগে আমরা হাসপাতালে চুরির বিষয়টি জানতে পেরেছি। যদি ঠিক সময়ে হাসপাতালটি চালু হতো তাহলে এই ধরনের চুরির ঘটনা ঘটতো না। আমরা চাই আইনি সব সমস্যা সমাধান করে দ্রুত হাসপাতালটি চালু করা হোক।
এদিকে চুরির ঘটনায় হাসপাতালের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষের অবহেলাকে দুষছেন সচেতনমহল। ইমরান আল নাজির নামের এক ব্যক্তি বলেন, যেহেতু এতদিনেও কর্তৃপক্ষ হাসপাতালটি চালু করতে পারেনি এবং জনগণকে সেবা থেকে বঞ্চিত করেছে এখানে অবশ্যই কর্তৃপক্ষের দায় রয়েছে। এটি প্রথমে খতিয়ে দেখা উচিত, কারা কারা এটার সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং কেন হাসপাতালে চালু করা যায়নি। সরকারি সম্পদ, রাষ্ট্রের টাকা খরচ করে বানাবে আর চোরেরা এসে চুরি করে নিয়ে যাবে। আবার নতুন করে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াবে, নতুন করে জিনিসপত্র কিনবে তাদের ব্যবসা হবে এটাতো রাষ্ট্রের সিস্টেম হতে পারে না।

চুরির বিষয়টি নিয়ে নড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বাহার মিয়া বলেন, জাতীয় নির্বাচন শেষে হাসপাতালটি থেকে সেনাবাহিনী চলে যাওয়ার পর এটি দীর্ঘদিন অরক্ষিত ছিল। বিভিন্ন কক্ষে তালা ভাঙা আছে এমন খবর পেয়ে গত শুক্রবার আমরা হাসপাতালে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি পাওয়ার সাপ্লাইয়ের কয়েল, তিনটি এসি ও এসির যন্ত্রাংশসহ স্টোররুম থেকে বেশ কিছু মালামাল চুরি হয়েছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি ইউএনওকে জানিয়েছি।
এ ঘটনায় থানায় একটি মামলা রুজু হয়েছে। এ ঘটনায় চুরি যাওয়া তামার তারসহ একজনকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। সেখানে তার পাঁচ দিনের রিমান্ড চাওয়া হলে বিচারক একদিন জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছেন বলেও জানান ওসি।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে জেলা সিভিল সার্জন ডা. রেহান উদ্দিন বলেন, আমাদের কাছে হাসপাতালটি এখনো হস্তান্তর করা হয়নি। তাই এটি দেখভালের দায়িত্ব স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের। আমরা এই ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করবো না।

এদিকে যোগাযোগ করা হলে জেলার স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী দেবব্রত হালদার বলেন, চুরির ঘটনায় থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। প্রশাসন বিষয়টি দেখছেন।
বিধান মজুমদার অনি/এফএ/এএসএম