নিরাপত্তাহীনতায় আশ্রয়ণ প্রকল্পে বাস করা দায়
‘বিগত সরকার আমাদের ঘর দিয়েছে কিন্তু নিরাপত্তা দেয়নি। সেই সঙ্গে কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করেনি। শহর থেকে অনেক দূরে আমাদের পরে থাকতে হয়। যেখানে কোনো কাজকর্ম নেই। রাতে ঘরে থাকতে পারলেও কোনো নিরাপত্তা নেই। মাদকসেবীরা সবসময় উৎপাত করে।’
কথাগুলো বলছিলেন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার চর সৈয়দপুর এলাকার আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা রুবিয়া বেগম। তবে এসব কথা বললে তার উপর হামলা হয় কিনা এ শঙ্কায় ছিলেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘ঘরে কোনো কিছু রাখা যায় না। সব চুরি করে নিয়ে যায়। আবার কিছু বলাও যায় না। বলতে গেলেই আগুন দিয়ে ঘর জ্বালিয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়। রোহিঙ্গা বলে গালিগালাজ করে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বিগত সরকারের একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ আশ্রয়ণ প্রকল্প। যার লক্ষ্য ছিল গৃহহীন ও ছিন্নমূল পরিবারকে বিনামূল্যে ঘর ও জমি প্রদানের মাধ্যমে পুনর্বাসন করা। কিন্তু নানা অনিয়মের কারণে এই আশ্রয়ণ প্রকল্প অনেক ক্ষেত্রে সফলতার মুখ দেখেনি।
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা থেকে চর সৈয়দপুর এলাকার আশ্রয়ণ প্রকল্প ২১০টি পরিবারকে ঘর দেওয়া হয়। বর্তমানে আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা নিরাপত্তাহীনতা ভুগছেন। নানারকম ভয়ের মধ্য দিয়ে তাদের দিন যাচ্ছে।

এদিকে কয়েক দিন পরপরই বিদ্যুতের তার চুরির ঘটনা ঘটছে। অনেক সময় রাতের বেলা বাসিন্দারা নিরাপত্তা শঙ্কায় থাকেন। তাদের আশ্রয়ণ প্রকল্প থেকে বের করে দেওয়ার ও ঘর জ্বালিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করায় অনেক ঘর এখনই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
আনোয়ারা বেগম নামে এক বাসিন্দা বলেন, ‘ঘরে থাকতে পারি না। টিনের চাল ছিদ্র হয়ে গেছে। বৃষ্টি এলেই ঘরে পানি পড়ে।’
শেফালি বেগম নামে আরেকজন বলেন, ‘বিদ্যুতের তার চুরি করে নিয়ে যায়। কাজের সুযোগ নেই, সবদিক দিয়েই কষ্ট করতে হয়। কোনো সাহায্য আসে না। আমাদের মেয়েরা শান্তিতে থাকতে পারে না, রাস্তায় তাদের উত্ত্যক্ত করা হয়।’

সেলিনা বেগম বলেন, ‘তার চুরি হয়ে গেলে নতুন করে কেনার টাকা থাকে না। আমাদের আয়ের পথ বন্ধ। প্রকল্পের ভেতরে অনেককে জোর করে বের করে দিয়ে বাইরের লোক প্রবেশ করানো হয়েছে। কোনো কোনো ঘরে তালা ভেঙে লোক ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমরা চরম দুর্গতির মধ্যে আছি।’
আরও পড়ুন:
খামারিদের লাভের স্বপ্নে ‘কাঁটা’ ভারতীয় গরু
জ্বালানি সংকটে মোটরসাইকেল ব্যবসায় ধস
বুঝে নেওয়ার ‘ঠেলাঠেলিতে’ দুই বছরেও চালু হয়নি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল
চর সৈয়দপুর ভূমিহীন আশ্রয়ণ কেন্দ্র পরিচালনা কমিটির সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা হামিদুর রহমান বাঙালি বলেন, ‘ঘরে প্রবেশের পর দেখি প্লাস্টারের কাজ অত্যন্ত নিম্নমানের। ঘরে বাতি ও বিদ্যুতের লাইন নেই। এখন পর্যন্ত আমরা ঘরের দলিল পাইনি। এমন এক জায়গায় আমাদের নেওয়া হয়েছে, যেখানে কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই। কেউ আমাদের খবর নেয় না, মাঝেমধ্যে কেউ আসলেও শুধু আশার বাণী শুনিয়ে যান। বর্তমান সরকার আমাদের জন্য কিছু করবে—সেই প্রত্যাশায় আছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। রাতে বিদ্যুতের তার চুরি হয়ে যায়। এমনকি একটা সাধারণ বদনা পর্যন্ত নিরাপদে রাখা যায় না। আমাদের থাকার জায়গা নেই বলে মাটি কামড়ে এখানে পড়ে আছি। কোনো সরকারি সাহায্য পাচ্ছি না। শহরে যাতায়াত করতে প্রতিদিন ৮০ টাকা ভাড়া দিতে হয়। এখানে কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেই, আমরা সবাই বেকার।’
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজউদ্দিন বলেন, ‘আমরা সরেজমিনে লোক পাঠাব। তারা গিয়ে বাসিন্দাদের সমস্যার কথা শুনে আসবে। সেই সাথে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতে বলা হবে। আমরা তাদের সাথে কথা বলে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’
এমএন/জেআইএম