১১ বছর ধরে তালাবদ্ধ কোটি টাকার আইসিইউ

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি জামালপুর
প্রকাশিত: ০২:৫২ পিএম, ১৩ মে ২০২৬

দক্ষ জনবলের অভাবে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে এক দশকের বেশি সময়েও চালু হয়নি কোটি টাকা মূল্যের চারটি আইসিইউ বেড। এতে অকেজো হয়ে পড়েছে কোটি টাকা মূল্যের বেডগুলো।

জামালপুরের ২৬ লাখ জনগণসহ শেরপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার কিছু অংশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র ভরসাস্থল ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জামালপুর জেনারেল হাসপাতাল।

লাখো মানুষের দুর্ভোগ কমাতে ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ২০১৫ সালে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে আইসিইউ সেবা চালু করে স্বাস্থ্য বিভাগ। সেই বছরের ৩১ জানুয়ারি কোটি টাকা মূল্যের আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ চার শয্যার আইসিইউ সেবা উদ্বোধন করেন তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। কিন্তু এরপর আর চালু হয়নি সেই আইসিইউ। এতে ব্যাপক দুর্ভোগে পড়তে হয় এই অঞ্চলের সেবা প্রত্যাশীদের।

আইসিইউ সেবা না থাকায় গুরুতর রোগীদের দ্রুত ময়মনসিংহ বা রাজধানীতে পাঠাতে হচ্ছে। বেশিরভাগ সময় পথেই জীবন হারাচ্ছেন অনেক রোগী। এছাড়াও বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা নিতে গেলে খরচ করতে হয় লাখ লাখ টাকা।

১১ বছর ধরে তালাবদ্ধ কোটি টাকার আইসিইউ

বুধবার (১৩ মে) সকালে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়- মূল ভবনের দক্ষিণ পাশের ভবনটির তৃতীয় তলার দেওয়ালে লেখা আইসিইউ। তবে সেখানকার আইসিইউ কক্ষে তালা ঝুলছে। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর কক্ষটি খুলে দেন সেখানকার দায়িত্বে থাকা পারুল ইসলাম। ভেতরে ঢুকতেই দেখা যায়- এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে যন্ত্রপাতিগুলো। দীর্ঘদিন ব্যবহার না করাই ভেতরে লাইটগুলোও নষ্ট হয়ে গেছে, বিছানাগুলোও ব্যবহারহীন। কোটি টাকার এই অবকাঠামো যেন শুধুই নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অব্যবস্থাপনার।

এসময় কথা হয় আইসিউ কক্ষ পরিষ্কার করার দায়িত্বে থাকা পারুল বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমি প্রতিদিন আসি, তালা খুলে পরিষ্কার করে আবার রেখে দিই। আজ পর্যন্ত কোনো রোগী এখানে আসেনি।

জেলার ইসলামপুর উপজেলার পাথর্শী ইউনিয়নের বাসিন্দা ফাতেমা বেগম বলেন, আমার মেয়ের সিজারের পর আমার মা ও সন্তানের জন্য আইসিইউ প্রয়োজন পড়ে। জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে আইসিইউ থাকলেও সেটি চালানো হয় না। তাই আমি তাদেরকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করি। সেখানে অতিরিক্ত বিল হয়, যা আমার পক্ষে দেওয়া খুবই কষ্টকর ছিল। শেষ পর্যন্ত আমার গহনা বিক্রি করে বিল পরিশোধ করি। জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে আইসিইউ চালু থাকলে চিন্তা করতে হতো না।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা তাজুল ইসলাম বলেন, শুনেছি এখানে আইসিইউ উদ্বোধন করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এর চিকিৎসা পাইনি কেউ, দেখা যায় চিকিৎসার জন্য ওই ময়মনসিংহেই যেতে হয় আমাদের। এত টাকার যন্ত্রপাতি উদ্বোধন করা হলো, ব্যবহার করা হলো না একদিনও। এগুলোতো আমাদের টাকায় কেনা ছিল। এর দায় এখন কে নেবে?

১১ বছর ধরে তালাবদ্ধ কোটি টাকার আইসিইউ

জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের দীর্ঘদিনের অ্যাম্বুলেন্সচালক শফিকুল ইসলাম আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, বহু বছর ধরে এই হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স চালাই। কত মুমূর্ষু রোগীকে ময়মনসিংহ আর ঢাকায় নিয়ে গেছি, তার হিসাব নেই। অনেক সময় রোগীর স্বজনরা কান্না করতে করতে গাড়িতে ওঠেন, আর পথেই মারা যায় প্রিয় মানুষটা। নিজের চোখের সামনে অ্যাম্বুলেন্সের ভেতর কত মৃত্যু দেখেছি, তা ভাষায় বোঝানো যাবে না। জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে আইসিইউ সেবা চালু থাকলে হয়ত এভাবে এত মানুষকে পথেই মারা যেতে হতো না।

জামালপুর জেনারেল হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের উদাসীনতার কারণে আজ এই অবস্থা। যন্ত্রপাতি দিয়েছে কিন্তু দক্ষ জনবল দেয়নি। এমন উদাসীনতা আমরা আর দেখতে চাই না। আমরা চাই জেলাবাসীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে স্বাস্থ্য বিভাগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. রনি জানান, আইসিইউ কক্ষের ভেতরে মোট চারটি শয্যা রয়েছে। এর মধ্যে দুটি আইসিইউ ও দুটি উচ্চ মাত্রার নির্ভরশীল (এইচডিইউ) শয্যা। প্রতিটি শয্যার সঙ্গে প্রয়োজনীয় সব আধুনিক যন্ত্রপাতি লাগানো রয়েছে। এই আইসিইউসহ পুরো সেবা চালু করতে কত টাকা খরচ হয়েছে সে সম্পর্কে হাসপাতালের কারোর ধারণা নেয়। ২০১৫ সালে ঢাকা থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে।

জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মো. মাহফুজুর রহমান সোহান বলেন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান ও পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে আইসিইউ চালু করা সম্ভব হয়নি। ২০২৩ সালে ঢাকা থেকে স্বাস্থ্য বিভাগের একটি দল এসে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর আইসিইউগুলোকে অকেজো বা বাতিল বলে ঘোষণা করেছে।

এফএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।