সিরাজগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি
উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সিরাজগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতি আরো অবনতি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি ১৪ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বৃস্পতিবার সকালে সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে বিপদসীমার ৭০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
পানি বৃদ্ধি ফলে জেলার নতুন করে আরো ৭টি ইউনিয়ন বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে। ফলে এ সকল স্থানের ১৩৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে।
সিরাজগঞ্জের ৫ উপজেলার চরাঞ্চলের ৭টি ইউনিয়ন বেড়ে এখন ৩১টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। খাবার ও পানির সংকটে বন্যা কবলিতরা এখন দুর্বিষহ জীবন যাপন করছে।
এদিকে, ব্রহ্মপুত্রের পশ্চিম বাঁধে চাপ পড়ছে। অনেক স্থানে পানির প্রবল চাপ থাকায় বাঁধ ভাঙার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বুধবার রাতে রানীগ্রামে বাঁধের নিচ দিয়ে পানি চুইয়ে পড়তে দেখে এলাকাবাসীর মধ্যে বাঁধ ভাঙার আতঙ্ক দেখা দেয়। খবর পেয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা গিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বালির বস্তা ফেলে তা নিয়ন্ত্রণে আনে।
তাছাড়া বন্যা কবলিত এলাকার নলকূপগুলো ডুবে যাওয়ার কারণে খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। বিশুদ্ধ পানির অভাবে বন্যা কবলিত এলাকায় পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
কাউয়াখোলা এলাকার আব্দুস সবুর জানান, বাড়ি ঘরে পানি উঠার কারণে পরিবার পরিজন নিয়ে কষ্টে পড়েছেন। বাড়ির বেশির ভাগ সদস্যের তিনি বাঁধের উঁচু স্থানে পাঠিয়ে দিলেও চুরির ভয়ে তিনি কষ্ট করে বাড়িতেই অবস্থান করছেন।
ভাটপিয়ারী গ্রামের নজরুল ইসলাম জানান, গবাদি পশু পালন করেই তার সংসার চলতো। কিন্তু আকস্মিকভাবে বন্যা আসার কারণে এ সকল গবাদি পশু রাখার কোনো স্থান নেই। এছাড়া এই মুহূর্তে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করারও প্রায় অসম্ভব। যে কারণে তিনি গবাদি পশুগুলো বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
কাওয়াকোলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান টিএম শাহাদত হোসেন জানান, এই ইউনিয়নের তিন হাজার পরিবার পানিবন্দী রয়েছে। সরকার থেকে পাওয়া আড়াইশ পরিবারের মাঝে মাত্র ১০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়েছে। যা প্রয়োজনের তুলনায় খবই অপ্রতুল।
কাউয়াখোলা ইউনিয়নের শয়শেখা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা আয়েশা খাতুন জানান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তলিয়ে যাওয়ার কারণে শিক্ষার্থী তো দূরের কথা শিক্ষকেরাই স্কুলে যেতে পারছেন না। সামনেই পিএসসি পরীক্ষা। এই সময় শিক্ষাদান বন্ধ থাকলে পরীক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল করতে পারবে না।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ব্রেনজন চাম্বুগং জানান, যতটুকু বরাদ্দ পাওয়া গেছে তা বিতরণ করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে সব পানিবন্দী মানুষের মাঝে শুকনো খাবার ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হবে। এছাড়া বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। বন্যা কবলিতদের চিকিৎসার জন্য একটি মেডিকেল টিমও মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা ওয়ালি উদ্দিন জানান, সিরাজগঞ্জ সদর, কাজীপুর, বেলকুচি, শাহজাদপুর ও চৌহালী উপজেলায় ৩১টি ইউনিয়নের প্রায় শতাধিক গ্রামের কমপক্ষে সাড়ে ৭ হাজার পরিবারের অন্তত ৫০ হাজার মানুষ বন্যা কবলিত হয়েছে। এছাড়া ৯৫০টি বাড়িঘর আংশিক ও পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার্তদের জন্য ১৩৯টি কেন্দ্রে আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ হাসান ইমাম জানান, পানি বৃদ্ধির কারণে বাঁধগুলোতে চাপ পড়ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক বাঁধে মনিটরিং করা হচ্ছে। কোথাও কোনো সমস্যা পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে তার সমাধান করার ব্যবস্থা রয়েছে। এখনো তেমন আশঙ্কার কিছু নেই বলে তিনি জানান।
বাদল ভৌমিক/এসএস/আরআইপি