দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন
যে চাকরি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করতে পারবে না এআই
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে সতর্কবার্তা দিন দিন জোরালো হচ্ছে। গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেছেন, এআই শ্রমবাজারে সুনামির মতো আঘাত হানছে। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ব্যাংক জেপি মরগ্যান চেজের প্রধান নির্বাহী জেমি ডাইমন পূর্বাভাস দিয়েছেন, শিগগিরই ব্যাংকটির কম কর্মীর প্রয়োজন হবে। আর এআই কোম্পানি অ্যানথ্রপিকের প্রধান ডারিও আমোদেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, তার কোম্পানি যে প্রযুক্তি তৈরি করছে তা ‘প্রবেশপর্যায়ের’ ‘সাদা-কলার চাকরির’ অর্ধেক নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে।
‘সাদা-কলার চাকরি’ বলতে মূলত অফিসভিত্তিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রশাসনিক কাজকে বোঝায়, যেখানে শারীরিক পরিশ্রমের চেয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা বেশি প্রয়োজন হয়। ব্যাংকার, প্রকৌশলী, ডাক্তার, শিক্ষক, ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার), আইটি বিশেষজ্ঞ, হিসাবরক্ষক ইত্যাদি এই ধরনের পেশার আওতাভুক্ত। সাধারণত, এই চাকরি করা কর্মীরা করপোরেট পোশাক পরেন এবং ভালো বেতন ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পান।
নিশ্চয়ই এআই সাদা-কলার কর্মীবাহিনীতে বড় ধরনের আলোড়ন তুলতে পারে। তবে এসব চাকরিকে কম আয়ের করে দেওয়া বা পুরোপুরি অপ্রয়োজনীয় করে তোলার চেয়ে এগুলোকে নতুনভাবে রূপ দেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ভবিষ্যতের এআই অফিস রোবটের মতো নয়, বরং মানুষের ও কম্পিউটারের সক্ষমতার সমন্বয়ে গড়া এক ধরনের ‘সাইবর্গ’ হবে। কেন এমনটা হতে পারে, তা বুঝতে হলে গত তিন বছরে সাদা-কলার কাজের পরিবর্তন, আগের প্রযুক্তিগত বিপ্লবগুলোর অভিজ্ঞতা ও সেসব ধারা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কী ইঙ্গিত দেয়- তা বিবেচনা করতে হবে।
সব আতঙ্কের মাঝেও সাদা-কলার কর্মীরা এখনো ভালো অবস্থানে আছেন। ২০২২ সালের শেষ দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৩০ লাখ নতুন সাদা-কলার চাকরি যোগ হয়েছে, যার মধ্যে ব্যবস্থাপনা, পেশাদার, বিক্রয় ও অফিসভিত্তিক কাজ অন্তর্ভুক্ত। একই সময়ে ব্লু-কলার কর্মসংস্থান (কায়িক শ্রম বা সরাসরি উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের সাথে জড়িত পেশাক) প্রায় স্থির রয়েছে। যেসব পেশাকে প্রায়ই এআইয়ের প্রথম শিকার বলা হয়, সেগুলোর অনেকগুলোতেই বরং দ্রুত প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।
তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্রে সফটওয়্যার ডেভেলপারের সংখ্যা ৭ শতাংশ, রেডিওলজিস্ট ১০ শতাংশ ও প্যারালিগাল ২১ শতাংশ বেড়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় যে কিছু প্রবেশপর্যায়ের সাদা-কলার চাকরিতে নিয়োগ কমার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, তা চ্যাটজিপিটি আসার আগের সময় থেকেই শুরু হয়েছিল। ফলে এর পেছনে উচ্চ সুদের হার ও অনিশ্চিত বৈশ্বিক ব্যবসা পরিবেশের প্রভাবই বেশি হতে পারে।
এদিকে, ২০২২ সালের শেষ দিক থেকে পেশাদার ও ব্যবসাসংক্রান্ত খাতে (যেমন বিক্রয়কর্মী, হিসাবরক্ষক) প্রকৃত বা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা বেতন বেড়েছে ৫ শতাংশ। অফিস ও প্রশাসনিক কর্মীদের আয় বেড়েছে ১৭ শতাংশ। শিক্ষা, বয়স, লিঙ্গ, জাতিগোষ্ঠীসহ অন্যান্য বৈশিষ্ট্য সমন্বয় করে হিসাব করলে দেখা যায়, বর্তমানে সাদা-কলার কর্মীরা ব্লু-কলার কর্মীদের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি আয় করেন। ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে এই পার্থক্য ছিল এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। গত তিন বছরেও এই ব্যবধান বেড়েছে। অর্থাৎ এআই এখনো অফিসকর্মীদের দীর্ঘদিনের বেতনের সুবিধা কেড়ে নিতে পারেনি।
প্রযুক্তিগত ইতিহাসবিদদের কাছে এসব তথ্য খুব আশ্চর্যের নয়। কম্পিউটার যুগের শুরুর দিকেও ব্যাপক কর্মচ্যুতির আশঙ্কা করা হয়েছিল। ১৯৮২ সালে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ভাসিলি লিওনতিয়েফ সতর্ক করে বলেছিলেন, মানুষ ও যন্ত্রের সম্পর্ক মৌলিকভাবে বদলে যাচ্ছে, কারণ কম্পিউটার তখন প্রথমে সহজ, পরে ক্রমেই জটিল মানসিক কাজ করতে শুরু করেছিল। তবে বাস্তবে দেখা গেল, ডিজিটাল স্বয়ংক্রিয়তা অফিসকাজের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৮০-এর দশকের শুরু থেকে ব্যবস্থাপনা, পেশাদার, বিক্রয় ও অফিসভিত্তিক চাকরির সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে, আর প্রকৃত বেতন বেড়েছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
এর একটি কারণ হলো- কম্পিউটার সাধারণত পুরো একটি চাকরি একবারে প্রতিস্থাপন করেনি। বরং নিয়মভিত্তিক, পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলো স্বয়ংক্রিয় করেছে। কিন্তু অধিকাংশ পেশাগত কাজই বিভিন্ন ধরনের কাজের সমষ্টি, যার কেবল কিছু অংশ স্বয়ংক্রিয় করা যায়। ফলে পুরো চাকরি হারানোর বদলে কাজের মানোন্নয়ন হয়েছে। কম্পিউটার উৎপাদনশীলতা বাড়িয়েছে এবং মানুষকে বিশ্লেষণ ও বিচার-বিবেচনার মতো উচ্চমূল্যের কাজে মনোযোগ দিতে দিয়েছে। এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারদের উদাহরণই এক্ষেত্রে যথেষ্ট- সফটওয়্যার ফ্লাইট ডেটা প্রক্রিয়ায় সাহায্য করেছে, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষমতা মানুষের হাতেই থেকেছে, আর বেতনও বেড়েছে।
কম্পিউটার-সহায়িত আধিপত্য
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে ও খরচ কমিয়ে কম্পিউটার কোম্পানিগুলোকে এমন অনেক কাজ লাভজনকভাবে করার সুযোগ দিয়েছে, যা আগে সম্ভব ছিল না। ই-কমার্স তৈরি করেছে লজিস্টিকস, সাপ্লাই চেইন পরিকল্পনা ও ডিজিটাল পেমেন্টের নতুন কাজ। স্মার্টফোন এনেছে অ্যাপ ডিজাইনার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তৈরি করেছে ডিজিটাল মার্কেটার ও ইনফ্লুয়েন্সার। এর ফলেই সাদা-কলার কর্মসংস্থানে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির ড্যারন আসেমোগলু ও বোস্টন ইউনিভার্সিটির পাসকুয়াল রেস্ট্রেপোর গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৮০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রায় অর্ধেকই এসেছে সম্পূর্ণ নতুন পেশা সৃষ্টির মাধ্যমে।
এআই আগের ডিজিটাল প্রযুক্তির চেয়ে নিঃসন্দেহে বেশি বুদ্ধিমান। তবু প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের একই যুক্তি এখানেও প্রযোজ্য হতে পারে। একদিকে, আজকের এআই সিস্টেমগুলোর মধ্যে যাকে গবেষকেরা ‘খাঁজকাটা বুদ্ধিমত্তা’ বলেন- অর্থাৎ সক্ষমতা অসম ও অসঙ্গত। কোনো কাজের ৯৫ শতাংশ ভালোভাবে করা যথেষ্ট নয়, যদি বাকি ৫ শতাংশে জটিল পরিস্থিতি ও বিবেচনার দরকার হয়। অ্যানথ্রপিকের প্রমাণও তাই বলে। তাদের মডেলের সঙ্গে হওয়া লাখো বেনামি যোগাযোগ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মাত্র ৪ শতাংশ পেশায় এআই তিন-চতুর্থাংশ বা তার বেশি কাজ করে; বলতে গেলে কোনো পেশাই পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় করা যায় না। কম্পিউটারের মতোই, এআই পুরো ভূমিকা নয়, বরং নির্দিষ্ট জ্ঞানভিত্তিক কাজ যেমন লেখা খসড়া তৈরি, কোড লেখা, তথ্য সংগ্রহ বা মানক বিশ্লেষণের খরচ কমাচ্ছে।
সাম্প্রতিক শ্রমবাজারের তথ্যও এই ধারণাকে সমর্থন করে। ২০২২ সালের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ১০০টিরও বেশি বড় সাদা-কলার পেশায় কর্মসংস্থান ও বেতন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মোট কর্মসংস্থান ৪ শতাংশ ও প্রকৃত বেতন ৩ শতাংশ বেড়েছে। এআইয়ের প্রভাব বুঝতে পেশাগুলোকে কাজের ধরন অনুযায়ী চার ভাগে ভাগ করা হয়: প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞ, ব্যবস্থাপক ও সমন্বয়কারী, যত্নমূলক কাজের কর্মী ও ব্যাক-অফিস কর্মী। এরপর ২০২২ সালের শেষ দিক থেকে ছয় মাসের গড় ধরে প্রতিটি দলে কর্মসংস্থান ট্র্যাক করা হয়।
যেসব পেশায় প্রযুক্তিগত দক্ষতার সঙ্গে তদারকি ও সমন্বয়ের কাজ আছে, সেগুলোতেই সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। প্রকল্প ব্যবস্থাপক ও তথ্য-নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের সংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। গণিতভিত্তিক গভীর দক্ষতা ও সমস্যা সমাধানের কাজগুলোও ভালো করছে। একইভাবে আন্তঃব্যক্তিক যত্নমূলক কাজ এবং বিচার-বিবেচনা ও সমন্বয় প্রয়োজন এমন চাকরিতেও প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। কেবল নিয়মভিত্তিক ব্যাক-অফিস কাজ কমেছে। গত তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্রে বীমা দাবি প্রক্রিয়াকরণকারী কর্মীর সংখ্যা ১৩ শতাংশ এবং সেক্রেটারি ও প্রশাসনিক সহকারীর সংখ্যা ২০ শতাংশ কমেছে।
আবার এআই নতুন নতুন চাকরিও তৈরি করছে। কোম্পানিগুলো নিয়োগ দিচ্ছে ‘ডেটা অ্যানোটেটর’, যারা এআইকে তথ্য বোঝাতে ডেটা লেবেল করেন। ‘ফরওয়ার্ড-ডিপ্লয়ড ইঞ্জিনিয়ার’, যারা গ্রাহকদের এআই বাস্তবায়নে সহায়তা করেন। এমনকি শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় ‘চিফ এআই অফিসারও’ আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সবচেয়ে দ্রুত বেড়ে ওঠা সাদা-কলার পেশাগুলোর অনেকগুলোরই এখনো স্থায়ী নাম নেই।
এদিকে, অন্যান্য গাণিতিক-বিজ্ঞানভিত্তিক পেশা ২০২২ সালের শেষ দিক থেকে প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে, আর প্রকৃত বেতন বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। ‘অন্যান্য কম্পিউটার পেশা’ যেমন- সিস্টেম আর্কিটেক্ট ও আইটি প্রকল্প ব্যবস্থাপকের সংখ্যা ব্যাপক গতিতে বাড়ছে। আর ‘ব্যবসায়িক কার্যক্রম বিশেষজ্ঞ’- যেখানে প্রক্রিয়া নকশা, সমন্বয় ও বিশ্লেষণ একসঙ্গে থাকে- এই গোষ্ঠীর কর্মসংস্থান প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে, তাদের বেতনও শক্ত অবস্থানে।
এর মানে এই নয় যে সব সাদা-কলার কর্মী নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। যেসব কাজের মধ্যে জটিল ব্যতিক্রম কম ও বিবেচনার প্রয়োজন নেই, সেগুলো পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় হওয়ার ঝুঁকিতে। এরই মধ্যে নতুন এআই মডেলগুলো সীমিত মানব তদারকিতে বহু ঘণ্টা ধরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোড লেখা, বিশ্লেষণ ও টুল ব্যবহারের কাজ করতে পারছে। গবেষণা সংস্থা এমইটিআরয়ের মানদণ্ড অনুযায়ী, এআই টানা পাঁচ ঘণ্টা নিজে সফটওয়্যার লিখতে পারে, ও এই সক্ষমতা প্রতি সাত মাসে দ্বিগুণ হচ্ছে। অ্যানথ্রপিকের প্রধান ডারিও আমোদেই মনে করছেন, চলতি বছরেই এআই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের কাজের বড় অংশ করতে সক্ষম হতে পারে।
প্রবেশপর্যায়ের চাকরিগুলোও একই কারণে ঝুঁকিতে। আগের প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ধাক্কা যারা সামলাচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে কেরানি ও প্রশাসনিক কাজে কর্মরত মানুষের হার ১৯৮০-এর দশকে যেখানে ছিল ১৮ শতাংশ, তা নেমে এসেছে ১০ শতাংশে ও আরও কমার সম্ভাবনা আছে। সেন্টার ফর দ্য গভর্ন্যান্স অব এআইয়ের গবেষক স্যাম ম্যানিং ও টোমাস আগুইরের নতুন গবেষণা বলছে, এই কর্মীদের অভিযোজন ক্ষমতা সবচেয়ে দুর্বল, কারণ তাদের স্থানান্তরযোগ্য দক্ষতা কম এবং উচ্চমূল্যের কাজে যাওয়ার সুযোগ সীমিত।
এই পরিবর্তন যাদের ওপর পড়বে, তাদের জন্য তা নিঃসন্দেহে কষ্টকর। তবে এটি শ্রমবাজারের সেই ‘সর্বগ্রাসী ধ্বংস’ নয়, যেটার ভবিষ্যদ্বাণী কেউ কেউ করছেন। আপাতত মানুষের বিচার-বিবেচনা ও যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তার সমন্বয় কেবল এআইয়ের চেয়ে বেশি মূল্য তৈরি করবে। বাজারে মানবিক দায়বদ্ধতা ও অংশ নেওয়ার মূল্য থাকবে। আর সাদা-কলার কর্মীরা যে অত্যন্ত অভিযোজ্য, তা আগেও প্রমাণিত। এআই আবারও তাদের কাজের ধরন বদলে দেবে, কিন্তু সেগুলো গায়েব করে ফেলবে না।
সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট
এসএএইচ