‘ভাইয়া ভালো থাকিস আমি আবার আসবো’


প্রকাশিত: ০৫:৩১ পিএম, ১৮ আগস্ট ২০১৬

‘ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকার উদ্দেশে যখন আফসানা গাড়িতে উঠতো তখন বুকে জড়িয়ে ধরে বলতো, ভাইয়া তুই শরীরের দিকে খেয়াল রাখবি, ভালো করে খাওয়া-দাওয়া করবি, মা ও ছোট বোন আফিয়াকে দেখে রাখবি। আফসানা আর কখনো বুকে জড়িয়ে বলবে না, ভাইয়া ভালো থাকিস আমি আবার আসবো।’ আফসানা আবার এসেছে কিন্তু লাশ হয়ে।

এক বুক হাহাকার নিয়ে খুব নিচু স্বরে কথাগুলো বলছিলেন গত শনিবার (১৩ আগস্ট) খুন হওয়া ঢাকার মিরপুরের সাইক ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজির স্থাপত্যবিদ্যার শেষবর্ষের ছাত্রী ঠাকুরগাঁওয়ের ফেরদৌস আফসানার বড় ভাই ফজলে রাব্বী।

‘আমি ভালো আছি, কোনো চিন্তা করিস না। ঈদের অনেক আগেই এবার বাড়ি চলে আসব রে। ভুলেও আমাকে ছাড়া গরু কিনবি না। এবার হাটে কিন্তু আমিও যাবো। গরুর গলায় মালা ঝুলিয়ে সবাই একসঙ্গে মজা করতে করতে হেঁটে ঘরে ফিরবো।’ গত শুক্রবার (১২ আগস্ট) রাত সাড়ে ১২টার দিকে মোবাইলে বড় ভাই ফজলে রাব্বির সঙ্গে এটাই ছিল আফসানার শেষ কথা।

আফসানার স্বজনদের অভিযোগ, ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ডের শিকার হন ওই শিক্ষার্থী। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত তেজগাঁও কলেজের ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হাবিবুর রহমান রবিন ও তার বন্ধুরা। পরিকল্পিতভাবে গলায় রশি জাতীয় কিছু পেঁচিয়ে তারা হত্যা করেছে আফসানাকে। পরে মিরপুরের আল-হেলাল হাসপাতালে লাশ ফেলে পালিয়ে যায় তারা কিংবা তাদের লোকজন। এখন অপরিচিত মোবাইল থেকে কখনো সমঝোতার প্রস্তাব, কখনো এই নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার জন্য অব্যাহতভাবে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে তারা।

পুলিশ গত শনিবার সাইকের শিক্ষার্থী আফসানার লাশ মিরপুরের আল-হেলাল হাসপাতাল থেকে উদ্ধার করে বেওয়ারিশ হিসেবে। এ সময় তার গলায় কালো রঙের একটি গভীর দাগ খুঁজে পান। ওই তরুণীর রহস্যজনক এই মৃত্যুর ঘটনার ৪ দিনেও রহস্য ভেদ করতে পারেনি পুলিশ। তারা আটক কিংবা গ্রেফতার করতে পারেননি আফসানার হত্যাকারী বা আত্মহত্যায় প্ররোচনাকারী একজনকেও।

আফসানার মৃত্যুতে ক্ষোভে ফুঁসে উঠছে নিহতের নিজ জেলা ঠাকুরগাঁও ও মিরপুর শ্যাওড়াপাড়ায় অবস্থিত সাইক পলিটেকনিক ইন্সস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা। আফসানার মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড দাবি করে ঠাকুরগাঁওয়ের আন্দোলনকারীরা বলছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে দোষীদের গ্রেফতার করা না হলে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানাবেন তারা।

আফসানার বড় ভাই ফজলে রাব্বি জানান, তার বাবার নাম মৃত আক্তার হোসেন। আফসানার বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ের রুহিয়ার কানীকশালগাঁওয়ে। মা ও এক বোনকে নিয়ে রাব্বি গ্রামের বাড়িতেই থাকেন। তবে আফসানা ঢাকা থেকে সাইক ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজির স্থাপত্য বিদ্যার শেষবর্ষে পড়াশোনা করছিলেন। আগে অন্য ছাত্রীদের সঙ্গে তিনি তেজগাঁও এলাকায় থাকতেন। মাসখানেক আগে দুইজন রুমমেটের সঙ্গে মানিকদি এলাকার একটি বাসায় উঠেছিলেন।

গত শনিবার রাত ৯টার দিকে সৌরভ পরিচয় দিয়ে একটি মোবাইল ফোন থেকে কল করে আফসানার মা সৈয়দা ইয়াসমিনের কাছে জানানো হয়, আফসানা মারা গেছে। তার লাশ ধানমন্ডির বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা আছে। আপনারা এসে লাশ নিয়ে যান, বলেই ফোনটি কেটে দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়।

সৈয়দা ইয়াসমিন বিষয়টি আত্মীয়স্বজনদের জানালে আফসানার মামা হাসানুজ্জামানসহ অন্যরা বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এলেও লাশ পাননি আফসানার। তারা সেখানে থাকা অবস্থায় অন্য একটি অপরিচিত মোবাইল নম্বর থেকে বাবু নামে একজন জানান, আফসানার লাশ মিরপুরের আল-হেলাল হাসপাতালে। সবাই আল-হেলাল হাসপাতালে ছুটে গেলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলে, অজ্ঞাত এক তরুণীর লাশ এসেছিল। পরে কাফরুল থানা পুলিশ লাশটি নিয়ে গেছে।

কাফরুল থানা পুলিশকে আফসানার ছবি দেখালে কর্তব্যরত কর্মকর্তারা জানান, এমন চেহারার একটি মেয়ের লাশ আল-হেলাল হাসপাতাল থেকে উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। অবশেষে রোববার ভোররাত ৩টার দিকে তারা ঢামেক মর্গের হিমঘরে খুঁজে পান আফসানার নিথর দেহ।

ফজলে রাব্বি আরো জানান, তেজগাঁও থাকাকালীন তেজগাঁও কলেজের ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হাবিবুর রহমান রবিনের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন আফসানা। একপর্যায়ে তাদের সম্পর্কে টানাপড়েন সৃষ্টি হয়। পরে এলাকা ছেড়ে চলে যান আফসানা। ঘটনার ১০ দিন আগে আফসানা ও রবিনের পরিচিত বন্ধুরা আবার তাদের এক করে দেন। কিন্তু ঘটনার দুইদিন আগে ফের সম্পর্কে ছেদ পড়ে। এই নিয়ে আফসানাকে দেখে নেয়ারও হুমকি দেয়া হয়। এর দুইদিন পরই লাশ পাওয়া গেল আফসানার। এখন প্রতিনিয়ত হুমকি আসছে মোবাইল ফোনে।

গত সোমবার বিকালেও রবিনের ভাই পরিচয় দিয়ে দিপু নামে একজন বলেছেন, ‘এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি কইরেন না। আপনারা অনেক দূরে থাকেন। আমাদের কিছুই করতে পারবেন না। একটা মিসটেক হয়ে গেছে। আসেন আমরা বসে মীমাংসা করে ফেলি।’

ফজলে রাব্বি বলেন, ‘এ ধরনের ফোনকল আরো আসায় আমরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আফসানাকে ধর্ষণের পর রশির মতো কোনো কিছু দিয়ে পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে নিশ্চিত তিনি। আর এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে রবিন, সৌরভ, বাবু ছাড়াও আরো কয়েকজন জড়িত।’ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে আফসানার হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন ফজলে রাব্বি।

মো. রবিউল এহসান রিপন/বিএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।