পুতুল কন্যা রুপা ও মিম
দুই বোন রুপা ও মিম। বয়সে তারা যুবতী হলেও স্বভাব-আচরণে শিশু। দিনভর পাড়ার শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলা করেই তাদের সময় কাটে। রাতে ঘুমায় মায়ের গলা ধরে। বাবার কোলে-পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়ায় এ বাড়ি ও বাড়ি। এলাকার সবাই তাদের ডাকে পুতুল মেয়ে বলে। আর এ কারণে তাদের বাড়ির নাম হয়েছে পুতুল বাড়ি।
পুতুল বাড়ির পুতুল মেয়ে রুপা আর মিম কথাও বলে তোতা পাখির মতো ছোট ছোট করে। শুনে মনে হয় কোনো যন্ত্র থেকে যেন মিষ্টি মিষ্টি কথা বেরিয়ে আসছে। কথার ফাঁকে মুচকি মুচকি হাসে।
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙা উপজেলার আঠারখাদা গ্রামে তাদের বাড়ি। বাবা আবদুর রশিদ একজন কৃষক ও মা ফাতেমা খাতুন গৃহিণী। রুপার বয়স ২৬ বছর, আর মিমের ১৭। তিন ভাই-বোনের মধ্যে একমাত্র ভাই নূর আলম জিকু মেজ। জিকু স্বাভাবিক। তিনি বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স শেষ বর্ষের ছাত্র।
রুপা খুব অভিমানী। কেউ কিছু বললে ওর সহ্য হয় না। রেগে গেলে ঘরের এটা ওটা আছাড় মারে। যা বায়না ধরে তাই দিতে হয়। বাবার পকেট থেকে টাকা নিয়ে একাই বাড়ির পাশের দোকানে চলে যায়। দিনভর খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকে। আর মোবাইলে শিল্পী মমতাজের গান শোনে। গানের তালে তালে নাচে।
অপরদিকে ছোট বোন মিমের রাগ-অভিমান অনেক কম। বাড়িতে এই আছে, এই নেই। খেলতে চলে যায় পাড়ায়। অন্য শিশুদের সঙ্গে চুটিয়ে খেলায় মাতে সে।
ওদের রয়েছে হরেক কিছিমের খেলনা। সেসব খেলনা সাজানো গোছানোতে তাদের সময় কাটে। খিদে পেলে দৌড়ে ছুটে যায় মায়ের কাছে।
গ্রামের সেলিম হোসেন জানান, আমরা মনে করি রুপা ও মিম বিশ্বের সবচেয়ে ছোট নারী। পত্রপত্রিকার খবর পড়ে যতটুকু জেনেছি তাদের মতো খাটো নারী বিশ্বে আর নেই।
বাবা আবদুর রশিদও একই দাবি করে বলেন, রুপার উচ্চতা ৩৪ ইঞ্চি, আর মিমের ৩৩ ইঞ্চি। আমি মনে করি আমার মেয়েদের মতো এত কম উচ্চতার নারী পৃথিবীর অন্য কোথাও নেই।
তাই গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ডে রুপা ও মিমের নাম লেখাতে চান তিনি। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন আবদুর রশিদ।
রুপা ও মিমের মা ফাতেমা খাতুন জানান, ওদের জন্মের সময় ওরা খুবই ছোট আকৃতির হয়েছিল। বেঁচে থাকবে এ বিশ্বাস কারোরই ছিল না। ছোট মেয়ে মিমের জন্মের পর বাংলাদেশসহ ভারতের অনেক নামি-দামি চিকিৎসক দেখানো হয়েছে। কিন্তু ওদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার ব্যাপারে সবাই নিরাশ করেছেন।
অন্য শিশুরা স্কুলে গেলেও রুপা আর মিমের ভাগ্যে তা জোটেনি। রুপাকে ১০-১৫ বছর আগে স্কুলে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তাকে ঘিরে স্কুলের অন্যান্য শিক্ষার্থীকে সামলাতে হিমশিম খেতেন শিক্ষকরা। সব ছাত্র-ছাত্রী রুপাকে দেখার জন্য হামলে পড়তো। তাই ওদের আর স্কুলে পাঠানো হয়নি। তাছাড়া ওরা বুদ্ধিতে ৪-৫ বছরের শিশুর মতো। পড়াশোনা ওদের ভালো লাগে না।
রুপা ও মিমের দাদা হাবিবুর রহমান বিশ্বাস জানান, আমার দুই নাতনিকে নিয়ে আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি বা বাজারে যাওয়া যায় না। কৌতূহলী হাজারো মানুষ ওদের দেখার জন্য ঘিরে ধরে।
স্থানীয় বাড়াদী ইউপি চেয়ারম্যান তবারক হোসেন বলেন, ওরা পৃথিবীর সবচেয়ে খাটো ও খর্বকায় নারী।
এদিকে একটি গণমাধ্যমে রুপা আর মিমকে নিয়ে সংবাদ প্রচারের পর জেলা ও উপজেলা প্রশাসন তাদের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন। সোমবার দুপুরে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি প্রতিনিধি দল রুপা ও মিমের বাড়িতে যায়।
এসময় জেলা প্রশাসক সায়মা ইউনুস, সিভিল সার্জন ডা. সিদ্দিকুর রহমান, আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আজাদ জাহান, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাইফুল ইসলাম ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান তবারক হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আজাদ জাহান বলেন, রুপা ও মিমের ব্যাপারে জেলা প্রশাসন বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে রুপার নামে প্রতিবন্ধী ভাতা চালু করে দেয়া হয়েছে। মিমের নামেও দেয়ার চেষ্টা চলছে। তাছাড়া তারা শারীরিকভাবে স্বাভাবিক নারী হতে পারে কি-না সে ব্যাপারে সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে।
এ ছাড়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রুপা ও মিমের উচ্চতা মেপে তাদের সরকারিভাবে বিশ্বের খাটো নারী বা সবচেয়ে খর্বকায় সহোদরের স্বীকৃতি দেয়ার ব্যাপারে আলোচনা চলছে। শিগগিরই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করা হবে।
এফএ/আরআইপি