ট্যানারি মালিকের কাছে জিম্মি নওগাঁর ব্যবসায়ীরা


প্রকাশিত: ০১:৪৮ পিএম, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৬

ট্যানারি মালিকদের কাছ গত বছরের চামড়ার টাকা না পাওয়ায় নওগাঁর চামড়া ব্যবসায়ীরা এবার চামড়া কেনা-বেচা নিয়ে শঙ্কায় আছেন। পাশাপাশি চামড়ার বাজার দর কম হওয়ায় ভারতে চামড়া পাচার হওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। চামড়া ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন ৮-১০টি ট্যানারি মালিকের কাছে জেলার ব্যবসায়ীরা প্রায় ১০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। তাদের কাছে এক প্রকার জিম্মি আছেন চামড়া ব্যবসায়ীরা।

অনেক টালবাহানার পর ট্যানারি ব্যবসায়ীরা অবশেষে গত বৃহস্পতিবার ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছেন।

জানা গেছে, এবার কুরবানি দেয়া লবণযুক্ত খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ২০ টাকা, ছাগল ১৫ টাকা, গরু ঢাকায় ৫০ টাকা, ঢাকার বাইরে ৪০ টাকা ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যা গত বছর ছিল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা এবং ৪০ থেকে ৪৫ টাকা।

জানা যায়, সরকারের কাছ ট্যানারি মালিকরা টাকা পেলেও চামড়া গুদাম ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কোন টাকা দেয়া হয় না। আবার চামড়া ব্যবসায়ীরা ট্যানারি মালিকদের পাওনা টাকা না দিয়ে মূল টাকার ৫-১০ শতাংশ হারে টাকা দেন।

ঈদে চামড়া কেনার জন্য ট্যানারি মালিকরা ব্যবসায়ীদের টাকা দেয়ার কথা থাকলেও এবারের ঈদে কোন টাকা দেয়া হয়নি ব্যবসায়ীদের। মূলত কুরবানি ঈদে ব্যবসায়ীদের চামড়া সংগ্রহের সময়। এ সময়ে নওগাঁ থেকে প্রায় ৫৫ হাজার গরু ও মহিষ এবং ছাগল ও ভেড়া মিলে প্রায় ৭০ হাজার চামড়া সংগ্রহ করা হয়। কাঁচা চামড়াকে লবণ দিয়ে প্রাথমিক প্রক্রিয়া জাত করতে হয় গুদাম ব্যবসায়ীদের।

ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে চামড়ার ভালো দাম না পাওয়ায় এবং পাওনা টাকা না পাওয়ায় অনেক পুরনো চামড়া ব্যবসায়ী আজ হারিয়ে গেছে। যারা টিকে আছেন তারা চামড়া ব্যবসার পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকায় এখনো বেঁচে আছেন।

ফলে ব্যবসায়ীরা এবার ঈদে চামড়া কেনা নিয়ে শঙ্কায় আছেন। আবার লবণের দাম তিনগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় চামড়ার দাম তুলনামূলক কম হবে এমনটাই আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। এক বছরের ব্যবধানে ৫০ কেজি ওজনের প্রতি বস্তা ৭০০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।

কওমি মাদরাসাগুলো প্রতি বছর নওগাঁয় ঈদুল আজহায় প্রায় ৫০ শতাংশ পরিমাণ চামড়া সংগ্রহ করে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে। কিন্তু তারা কোথায় বিক্রি করেন তা চামড়া ব্যবসায়ীরা জানেন না। এ বিষয়ে কোন খোঁজ রাখতে পারেন না তারা।

চামড়া ব্যবসায়ী শফিজুর রহমান বলেন, গত বছর ২০ লাখ টাকার চামড়া ট্যানারিতে দিয়েছি। এ পর্যন্ত একটি টাকাও দেয়নি ট্যানারি মালিকরা। কোন টাকা না পাওয়ায় এবছর কিভাবে চামড়া কিনবো তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। এছাড়া লবণের দাম বেশি হওয়ায় চামড়া কেনার আগ্রহও কমে গেছে। লবণের দাম বেশি হলে চামড়ার দাম তুলনামূলক কমে যায়। একটি ছাগলের চামড়ায় প্রায় ৫০০ গ্রাম লবণ ব্যবহার করা হয়। আর ছাগলের চামড়ার দাম যদি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা হয় সেখানে লাভ থাকে না।

একই কথা জানালেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হেলাল খান, রবীন্দ্রনাথ ও জিসনোসহ অনেকে। তারা জানান, কুরবানির চামড়া কেনার জন্য ট্যানারি মালিক টাকা দেয়ার কথা থাকলে তারা কোনো টাকা দেয়নি। সরকার ট্যানারি মালিকদের টাকা দিলেও আমাদের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কোন টাকা দেয়া হয় না। ৮-১০টি ট্যানারি মালিকের সিন্ডিকেটের কারণে চামড়া ব্যবসায়ীরা তাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। এখন পথে বসার উপক্রম প্রায়।

জেলা চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সভাপতি মমতাজ হোসেন বলেন, দেশে চামড়ার কোনো সুনির্দিষ্ট মূল্য নেই। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার ভালো দাম রয়েছে। ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে প্রায় দশ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে ব্যবসায়ীরা। চামড়ার ভালো দাম না পাওয়ায় এবং পাওনা টাকা না পাওয়ায় অনেক পুরনো ব্যবসায়ী আজ হারিয়ে গেছে।

তিনি আরো বলেন, ওয়েট ব্লু করা হলে চামড়া দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা যায়। ওয়েট ব্লু স্থাপনে প্রায় ৩০ লাখ টাকার মতো খরচ হবে। অনেক ব্যবসায়ীর পক্ষে ওয়েট ব্লু স্থাপন করা সম্ভব। কিন্তু সরকার ওয়েট ব্লুর অনুমোদন করে না। ওয়েট ব্লু স্থাপন করা হলে এবং সরাসরি চামড়া এক্সপোট করা হলে আন্তর্জাাতিক বাজারে ভালো দাম পাওয়া যাবে। এতে ব্যবসায়ীরা লাভবান হবে। ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেট থেকে রক্ষা পাবে চামড়া ব্যবসায়ীরা।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি-৪৩) ব্যাটালিয়নের কমান্ডার লে. কর্নেল জাহিদ হাসান বলেন, সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে চামড়া পাচারসহ কোন রকম চোরাচালান করতে দেয়া হবে না। যে কোন ধরনের চোরাচালান বন্ধে বিজিবির অবস্থান সব সময় জিরো টলারেন্স। সীমান্ত এলাকায় কেউ যাতে চামড়া মজুদ করতে না পারে সে বিষয়টি নজরদারিতে রাখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

জেলা প্রশাসক ড. আমিনুর রহমান জানান, চামড়ার দাম কম হলেও ভারতে পাচার হওয়ার আশঙ্কা সঠিক নয়। তবে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।

আব্বাস আলী/এএম/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।