দখল ও নাব্যতা হারিয়ে বিপর্যস্ত গোমতী


প্রকাশিত: ০৭:৩২ এএম, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬

কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী গোমতী নদী। এটি কুমিল্লার প্রধান নদী। স্রোতস্বিনী এ নদী এক সময় দক্ষিণ অঞ্চলের কৃষকদের আশির্বাদ ছিল। কিন্তু দিনে দিনে ঐতিহ্য হারিয়ে প্রায় বিপর্যস্ত গোমতী।

কুমিল্লাবাসীর গৌরব গোমতী নদী এখন যৌবন হারিয়েছে, তবে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এ নদীর বালু ও মাটি অবৈধভাবে বিক্রি করে শূন্য থেকে বিলাসবহুল বাড়ি-গাড়ি ও অঢেল ধন-সম্পদের মালিক হয়েছে অনেকেই। সদা একমুখি বয়ে যাওয়া এ নদীর পানির কল-কল ধ্বনি এখন আর নেই।

বিগত সময়ে বর্ষাকালে ধারণ ক্ষমতার বাইরে পানি থাকলেও এবং এ বছর দেশের অন্যান্য নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেলেও গোমতী নদীতে দেখা যায় এর ভিন্ন চিত্র। বর্তমানে এ নদী হয়ে পড়েছে পানিহীন, সরু খালের মতো। দখল আর দূষণে নাব্যতা হারিয়ে শ্রীহীন হয়ে পড়েছে এ নদী। বিলুপ্ত হয়ে পড়েছে জলজ প্রাণি ও মাছ। নদী কেন্দ্রীক জেলেদের জীবন-জীবিকাও হয়ে পড়েছে বিপর্যস্ত।

জানা যায়, গোমতী নদীর পানি প্রবাহের উৎপত্তি স্থল ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ি বিভিন্ন এলাকা। এর দৈর্ঘ্য ১৩০ দশমিক ১২২ কিলোমিটার। এটি জেলার আদর্শ সদর, বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া, দেবিদ্বার, মুরাদনগর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে দাউদকান্দি হয়ে মেঘনা নদীতে মিলেছে।

গোমতীর ডান তীরে ৪১ কিলোমিটার ও বাম তীরে ৩৪ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার বন্যা ব্যবস্থাপনা বাঁধ রয়েছে। বাঁধের নদী অংশের ভূমিতে বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ-বনজ গাছ-গাছালি ছাড়াও গড়ে উঠেছে অনেক ঘর-বাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনা। শাক-সবজি ও বিভিন্ন ফসলের আবাদ হচ্ছে নদী তীরে। এক সময় এ নদীর পানি জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষি জমিতে সেচ কাজে ব্যবহৃত হতো।

সূত্র জানায়, নদীর পানি বয়ে যায় আদর্শ উপজেলার ভারত সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের কটকবাজার সোনাইছড়ি খালে। সেই খালের পানি কৃষকরা কৃষি জমিতে ব্যবহার করে। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে গোমতী নদীতে পানি না থাকায় ওই খাল পানিশূন্য হয়ে পড়ে। এতে কুমিল্লা সদর উপজেলার ও পাশ্ববর্তী সদর দক্ষিণ উপজেলার প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর এলাকার কৃষিনির্ভর লোকজন সেচকাজ করতে পারছে না। এছাড়া নদী সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকার হাজার হাজার একর জমির সেচ কাজ বিঘ্নিত হচ্ছে।

নদীর ভারতীয় অংশে একাধিক স্থানে বাঁধ দেয়ার কারণে সংশ্লিষ্ট এলাকার কৃষকরা ফসলী জমিতে পানি দিতে পারছে না বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে, গোমতী নদী ঘিরে বেপরোয়া হয়ে ওঠেছে বালু ও মাটিদস্যু চক্র। নদী তীর থেকে সংঘবদ্ধ বেশ কয়েকটি সিন্ডিকেট অব্যাহতভাবে কেটে নিচ্ছে বালু ও মাটি। এতে হুমকির মুখে পড়েছে নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ। নদীর দুই পাশের লাখো মানুষ এ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পক্ষ থেকে গোমতী এলাকা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা এবং জিডি করেও ঠেকানো যাচ্ছে না মাটি কাটা। উল্টো বিভিন্ন সময়ে সংঘবদ্ধ এসব মাটিকাটা চক্রের দ্বারা প্রাণনাশের হুমকির শিকার হয়ে পাউবোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা থানায় জিডি করেছেন।

Comilla

গোমতী এলাকায় সরেজমিন ঘুরে এবং পাউবোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা গেছে। এসব বালু ও মাটি বিক্রি/ব্যবসা করে শূন্য থেকে রাতারাতি কোটি কোটি টাকা, অঢেল সম্পদ, বিলাসবহুল বাড়ি-গাড়ির মালিক হয়েছে অনেকে। সরকার বদলের পাশাপাশি রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এ চক্রেরও বদল হয় এবং সৃষ্টি হয় নাম না জানা অনেক কোটিপতির।

নদীর চাঁন্দপুর ব্রিজ এলাকা, কাপ্তানবাজার, পালপাড়া, আলেখারচর, বাবুর বাজার, শিমাইলখাড়া, বালিখাড়া, রামনগর, পূর্বহুড়া, নানুয়ার বাজার, মিথিলাপুর, বাহেরচর, শ্রীপুর, গোবিন্দপুর, শ্যামপুর, মালাপাড়া, মনোহরপুর, হাসনাবাদ, কংশনগর বাজার, রামচন্দ্রপুর, এদবারপুর, কাঁঠালিয়া, কিং-বাজেহুড়া, বাজেহুড়া, দেবিদ্বার ও মুরাদনগরের বিভিন্ন এলাকা দিয়ে মাটি কাটা চক্র বেশ সক্রিয়।

অসাধু মাটি ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন ড্রেজার লাগিয়ে মাটি উত্তোলন ছাড়াও শ্রমিক দিয়ে মাটি কেটে ট্রাক্টরযোগে বহন করে বাসা-বাড়ি, পুকুর ভরাট, ইটের ভাটাসহ নানা স্থানে মাটি সরবরাহ করছে। এতে নদীর পাড়সহ ওই সব এলাকার রাস্তাঘাটগুলো বেহাল দশায় পরিণত হয়েছে। এসব ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা দিয়ে এলাকার হাজার হাজার জনসাধারণ, স্কুল-কলেজগামী ছাত্র-ছাত্রী, অফিস-আদালতগামী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অসহনীয় দুর্ভোগ শিকার হয়েও চলাচল করছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করা শর্তে জানান, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ি বিভিন্ন এলাকা থেকে গোমতী নদীতে পানি প্রবাহিত হয়ে আসছে। সেই এলাকাগুলোকে বলা হয় ক্যাসম্যান এরিয়া, যার মাধ্যমে ত্রিপুরা সরকার পানি নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে গোমতী নদীতে পানি আসে না। এছাড়া ওইখানে বাঁধ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভারতের সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো চুক্তি না থাকায় আমরা এর অনুসন্ধানও করতে পারি না। ফলে গোমতী নদীকে ঘিরে হাজার হাজার কৃষি নির্ভর ফসলী জমিতে পানির অভাবে সেচকাজ করা যাচ্ছে না। এছাড়া নদী থেকে বালু উত্তোলন ও মাটি কাটা বন্ধে বিভিন্ন সময় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে দণ্ড প্রদান করা হয়েছে এবং এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

এআরএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।